বলেন কি?
হ্যাঁ, সে আমার সহকর্মী।
এ তো দারুণ গল্প! এবার নিশ্চয়ই–
না। আপনি যা ভাবছেন তা নয়। মেয়েটা ঠিক আগের মতোই কঠিন ও অবিচল। লক্ষ করলাম, অফিসের কেউই তাকে ঘাঁটায় না। সবাই প্রবল সমীহ করে এবং দূরত্ব বজায় রাখে।
মেয়েটা কি আপনাকে চিনতে পারল?
না পারার কথা নয়। কিন্তু সেটা একেবারেই প্রকাশ করল না। এমনকী কোনও সূত্রেই আমার সঙ্গে পরিচয় বা বাক্য বিনিময়ও করল না।
এরকমও হয় নাকি?
খুব প্রয়োজন হলে সে বেয়ারা দিয়ে আমার কাছে নোট পাঠায়। কখনও নিজে যেচে কথা বলে না।
আর সকলের সঙ্গে বলে?
হ্যাঁ। প্রয়োজনে সকলের সঙ্গেই কথা বলে। বাদ শুধু আমি।
লক্ষণটা ভালো না খারাপ?
জানি না। এসব ব্যাপারে আমি খুবই অনভিজ্ঞ।
আপনি নিজে কথা বলার চেষ্টা করেননি?
পাগল নাকি? মেয়েটিকে দেখেই আমি এমন নার্ভাস হয়ে পড়ি যে ভালো করে তাকাতেও পারি না।
আপনার অফিসে ক’টা মেয়ে কাজ করে?
অনেক। অধিকাংশ স্টাফই তো মহিলা। তাদের মধ্যে কয়েকজন বেশ সুন্দর দেখতে। আমাদের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার তো কোনও একটি বিউটি কন্টেস্টে মিস কী যেন হয়েছিল।
তাদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কীরকম?
অত্যন্ত ফ্রেন্ডলি। জড়তাহীন সম্পর্ক।
আপনি কি ওই মেয়েটির কারণেই চাকরি ছাড়ার জন্য ব্যস্ত হয়েছেন?
বোধহয় ওই মেয়েটিই প্রধান কারণ।
সে কি আপনার অধস্তন? আমাদের অফিসে ঠিক ওরকম কিছু হায়ারার্কি নেই। সবাই নিজের নিজের কাজ করে। প্রত্যেকেই প্রফেশনাল। প্রাইভেট অফিসে কেউ কোনও সুবিধে পায় না। সবাইকেই প্রচণ্ড কাজ করতে হয়। বসিং ব্যাপারটা দরকার হয় না। অফিসের মোটো হচ্ছে, ইট ইজ এ ফ্যামিলি।
হ্যাঁ। আজকাল এরকম একটা স্লোগান শোনা যাচ্ছে বটে। তাতে নাকি কাজ ভালো হয়।
হ্যাঁ।
আপনার কোম্পানির অন্য কোনও ব্রাঞ্চ নেই?
আছে। বোম্বে, দিল্লি, ব্যাঙ্গালোর। হেড অফিস দিল্লি।
আপনি বদলি হয়ে যেতে পারেন না?
পারি। কিন্তু কলকাতার অফিসটা নতুন। এখানে কনসেনট্রেট করা বেশি প্রয়োজন বলেই আমাকে এখানে কাজ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য আমাকে অন্যান্য অফিসেও ট্যুর করতে হয়।
একটা কথা বলব?
বলুন। মেয়েটির কোনও বয়ফ্রেন্ড আছে কিনা খোঁজ নিন।
দিগন্তে সেরকম কোনও মেঘ এখনও দেখা যায়নি।
যা দেখা যায় না তা কি নেই? হয়তো বয়ফ্রেন্ড এখন বিলেত বা আমেরিকায়। কিংবা অন্য কোথাও চাকরি করছে। মেয়েটি তার জন্যই অপেক্ষায় আছে।
সর্বনাশ!
কী হল?
একথাটা ভাবিনি তো!
এটাও তো সম্ভব!
হ্যাঁ। খুবই সম্ভব।
লক্ষণ দেখে আমার সে কথাই মনে হচ্ছে।
হাঁ। আমারও তাই মনে হচ্ছে।
তাহলে?
সেক্ষেত্রে আমার কিছু করার নেই। বয়ফ্রেন্ড না থাকলেও কিছু করার ছিল না অবশ্য।
আমি কি আপনার জন্য কিছু করতে পারি?
কী করবেন?
আমি মেয়েটিকে অ্যাপ্রোচ করতে পারি।
করে?
আমি একজন বয়স্ক মানুষ, কাজেই সে আমাকে হয়তো অসম্মান করবে না। আমি তার অবস্থানটা জানবার চেষ্টা করতে পারি।
সেটা কি খুব খারাপ দেখাবে না?
হুঁ। আপনি তো বেশ পাকিয়ে তুললেন দেখছি।
সমস্যা আছে বটে। সমাধানও আছে।
কী সেটা?
আমার ফের ভ্যাগাবন্ড হয়ে যাওয়া। মাকে আমি বলেছি যে, চাকরি করতে আমার ভালো লাগছে না। আমাদের গ্রাসাচ্ছদন কোনওরকমে চলে যাবে। আমার মা তাতে খুব একটা আপত্তি করেনি। মা বরাবরই আমার সাপোর্টার।
ভ্যাগাবন্ড হলেই কি সমস্যা মিটবে?
হ্যাঁ। ছুটি পেলে আমি ফের আগের মতো রাস্তায়–রাস্তায় ঘুরব। গাঁয়ে–গঞ্জে চলে যাব। আপনার জানার কথা নয়, যে, আমি গান লিখি, সুর দিই এবং গাই।
তাই নাকি?
আমি ছবি–টবিও আঁকতে পারি। এক সময়ে সেসবই আমার প্রিয় বিষয় ছিল। অফিসে বন্দি হওয়ার জন্য আমার জন্ম নয়। মুক্ত, চিন্তাশীল, দায়িত্বহীন জীবনে ফিরে যেতে পারলে আমি এসব ছোটখাটো ব্যাপার ভুলে যেতে পারব।
আপনি যে একজন কালচারগেঁড়ে তা আপনাকে দেখেই আমি বুঝেছি। সত্যি কথা বলতে কি আপনি একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন, বাস্তববোধবিবর্জিত, ইমপ্র্যাকটিক্যাল, ভাবালু এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন মানুষ।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক তাই। আমি ঠিক ওইরকম।
এইসব ভৎর্সনা শুনেও আপনি যে বিন্দুমাত্র অপমান বোধ করলেন না এবং আপনার চোখ যে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তাতেই বুঝতে পেরেছি যে, আপনার জীবনে উন্নতির কোনও আশা নেই। এ যুগের মেয়েরা আপনার মতো পুরুষকে পছন্দ করার মতো আহাম্মক নয়। তবে একথাও আমাকে কবুল করতে হবে যে, আপনার মতো দু-একটা পাগল ধারে কাছে না থাকলে পৃথিবীটা। সহনীয় হত না। আপনার সম্পূর্ণ অপদার্থতা সত্বেও আপনাকে আমার বেশ ভালোই লাগছে।
ধন্যবাদ, অজস্র ধন্যবাদ।
যদিও আপনার মতো ভাবালু লোক কোনও মহিলাকে বিয়ে করলে তার জীবনটাই বরবাদ হবে, তবু আপনার মতো লোকেরই বিয়ে করাটা জরুরি। তেমন মেয়ে হলে সে আপনার মাথা থেকে ভাবের ভূত ঝেড়ে তাড়াবে। বিয়ের পর পুরুষদের নানারকম পরিবর্তন হয়ে থাকে।
আপনি বেশ বিজ্ঞ মানুষ।
বিজ্ঞ নই, অভিজ্ঞ।
সঞ্চিত অভিজ্ঞতাই তো বিজ্ঞতা!
তাহলে এই বিজ্ঞ লোকটির একটা কথা শুনুন। এইবেলা চোখ বুঝে চট করে একটা বিয়ে করে ফেলুন। তাতে প্রেমজ্বর সেরে যাবে। যে মেয়েটা আপনাকে পাত্তা বা মূল্য দিচ্ছে না, ফিরেও তাকাচ্ছে না, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে তার জন্য বিবাগি হওয়াটা কি পুরুষ মানুষের কাজ? সুন্দরী, শিক্ষিতা মেয়ের তো অভাব নেই।
