কনিষ্ক বলে—আর একটু হাঁটি চলো। পোস্ট অফিস ছাড়িয়ে একটু এগোলে বোধহয় গাছতলায় একটা দেশওয়ালি চায়ের দোকান পাওয়া যাবে।
তাই হল। গাছতলার দোকানদার দু-ভাঁড় চা বড় যত্নে এগিয়ে দেয়। শম্পা আর কনিষ্ক দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ভাঁড়ে চুমুক দেয়।
কনিষ্ক বলে—কেমন?
–বেশ গো।
কনিষ্ক খুশি হয়ে পয়সা মিটিয়ে দেয়। বলেখিদে পেয়েছে নাকি? কিছু খাবে?
—কে খাওয়াবে? আমার তো পোড়া কপাল, কেউ পছন্দ করে না।
কনিষ্ক হেসে বলে–কটকটি, এবার কিন্তু কথা ফেইল করলে।
-কেন?
—যে চা খাওয়াল সেই খাবার খাওয়াতে পারে। আর কে খাওয়াবে?
—মলির সঙ্গে তোমার ঝগড়া হল কেন? হঠাৎ শম্পা প্রশ্ন করে।
–ঝগড়া! না, ঝগড়া হয়নি তো। ও একটা ছেলের খুব প্রশংসা করত। সেটা আমার সহ্য হত না।
—ওমা! তাই নাকি? এসব তো মা আমাকে বলেনি!
—মা জানবে কী করে? কনিষ্ক গুপ্ত বলে—মা শুধু জানত, মলির সঙ্গে আমার ভাব।
—এখন তুমি মলির কথা খুব ভাবো না? ভাববা, আমার মতো একটা বিচ্ছিরি মেয়ের সঙ্গে কেমন হট করে বিয়ে হয়ে গেল। সারাটা জীবন কেমন ব্যর্থতায় কাটবে।
কনিষ্ক খুব হতাশার ভাব করে বলে, কতগুলো ভাবনা আছে যা তাড়ানো যায় না। বিরহ ভোলা যায়, কিন্তু অপমান কি সহজে ভোলে মানুষ? কিংবা ঈর্ষা? হীনমন্যতা?
শম্পা মুখখানা করুণ করে বলে, আমাকে একটা কথা বলতে দেবে? ধরো আজ তোমার কাছে আমার খুব একটা দাম নেই। তুমি ভালোবাসতে পারছ না আমাকে। অথচ আমি তোমার কাছে কত সহজলভ্য। কিন্তু দ্যাখো, সুজন নামে একটা ছেলে আছে। তার কাছে শম্পাই হল আকাশ-পাতাল জোড়া চিন্তা। শম্পার জন্য কী জানি সে হয়তো আত্মহত্যার কথা ভাবে। পৃথিবীতে শম্পা ছাড়া বেঁচে থাকা কত কষ্টের সে জানে একমাত্র সুজন। তুমি তো কখনও জানবে না, বুঝবে না। পৃথিবীটা ঠিক এরকম নিষ্ঠুর।
চোয়াল কঠিন করে কনিষ্ক বলে, সুজন কে?
—সে একটা ছেলে। আমাকে ভালোবাসত। কোনওদিন তাকে পাত্তা দিইনি। কিন্তু আজ অনাদরের মাঝখানে থেকে তার কথা খুব মনে হয়।
কনিষ্ক স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে থাকে।
. সেই রাতে শম্পা আর কনিষ্কর ভালোবাসার মাঝখানে অনেকবার মলি এসে হানা দিল, এল সুজনও। দুজনে এসে এক অদৃশ্য প্রজাপতির দুটি ডানার মতো কাঁপতে লাগল। তাতে বড় সুন্দর হল কনিষ্ক ও শম্পার ভালোবাসার নিরালা ঘরটি।
তোমার উদ্দেশে
“In search of you, in search of you…”
ওইখানে তুমি থাকো। ওই সাদা বাড়িটায়, যার চূড়ায় শ্বেতপাথরের পরিটাকে বহু দূর থেকে দেখা যায়। নির্জন তোমাদের ব্যালকনি, বড়-বড় জানালায় ভারী পরদা ঝুলছে, দেয়ালে লাগানো এয়ারকুলার। মসৃণ সবুজ লনে বুড়ো একটা স্প্যানিয়াল কুকুর ঘুমিয়ে আছে।
পরিস্কার বোঝা যায়, এসব এক পুরুষের ব্যাপার নয়। জন্মের পর থেকেই তুমি দেখেছ খিলান–গম্বুজ, বড় ঘর, ছাদের ওপর ডানা মেলে-দেওয়া পরিযা কেবলই উড়ে যেতে চায়। যায় না।
বিকেলের রাস্তায় চিৎ চোখে পড়ে কালোযুবতী আয়া মন্থর পায়ে প্র্যাম ঠেলে নিয়ে চলেছে। কদাচিৎ দু-একজন ভবঘুরে লক্ষহীন চোখ চেয়ে হেঁটে যায়। বড় সুন্দর অভিজাত নিস্তব্ধতা তোমাদের। তাই যদিও আমার পথে পড়ে না, তবু আমি মাঝে-মাঝে তোমাদের এই নির্জন পাড়ার রাস্তা দিয়ে ঘুরপথে যাই।
আজ দেখলুম তোমাকে। তুমি একা হেঁটে যাচ্ছিলে।
যখন চিৎ কখনও তুমি এরকম হেঁটে যাও, তখনই বলতে কি তোমার সঙ্গে এক সমতলে আমার দেখা হয়। আজ যেমন। নইলে মাঝে-মাঝে তোমাকে দেখি তোমাদের মত রঙের মোটরগাড়িতে। হু-হু করে চলে যাও।
তোমাদের পুরোনো মোটর গাড়িটার কোনও গোলমাল ছিল কি আজ! কিংবা নিকেলের চশমা চোখে তোমাদের সেই বুড়ো ড্রাইভারটার!
অনেকদিন দেখা হয়নি। দেখলুম এই শীতকালে তুমি বেশ কৃশ হয়ে গেছ। সাদা শাড়ি পরেছিলে, তবু কচি সন্ন্যাসিনীর মতো দেখাচ্ছিল তোমাকে। সুন্দর অভ্যাস তোমার শাড়ির আঁচল ডান ধার দিয়ে ঘুরিয়ে এনে সমস্ত শরীর ঢেকে দাও, মুখ নীচু করে হাঁটো–যেন কিছু খুঁজতে-খুঁজতে চলেছ। নাকি পাছে কারও চোখে চোখ পড়ে যায় সেই ভয়েই তোমার ওই সতর্কতা। ওরকম মুখ নীচু করে যাও বলেই বোধহয় তুমি কোনওদিন লক্ষ করোনি আমায়। আজকেও না।
মোড়ের মাথায় রঙ্গন গাছের ছায়ার যে লাল ডাকবাক্সটা আছে তুমি সেটা পেরিয়ে গিয়ে বাঁক নিলে। তোমাকে আর দেখা গেল না। এত কাছ দিয়ে গেলে আজ যে, বোধহয় তোমার আঁচলের বাতাস আমার গায়ে লেগেছিল। ইচ্ছে হয়েছিল একটুক্ষণের জন্য তোমার পিছু নিই। নিলুম না। কেননা ফাঁকা রাস্তার মোড় থেকে বেঁটে, মোটাসোটা কালো টুপি পরা লাল ডাকবাক্সটা স্থির গম্ভীরভাবে আমার দিকে চেয়েছিল। মনে হচ্ছিল তোমার পিছু নিতে গেলেই সে গটগট করে হেঁটে এসে আমার পথ আটকাবে।
একটু আগে আমি ওই মোড় পেরিয়ে এলুম। বাঁক ছাড়িয়ে কিছুদূরে এক গাড়িবারান্দার তলায় দেখলুম জটলা করছে পাড়ার বখাটে ছেলেরা। বড় রাস্তাতেও রয়েছে নির্বোধ পুরুষের ভিড়। একা ওইভাবে কোথায় যাচ্ছিলে তুমি? আমার কাছ থেকে তুমি যত দূরে আছ, সুরক্ষিত আছ, অনেকের কাছ থেকে কিন্তু তুমি তত দূর নও। আমি তাই অনেকক্ষণ ভাবলুম তুমি ঠিকঠাক চলে যেতে পেরেছিলে কি না।
তোমাদের পাড়া ছাড়িয়ে বড় রাস্তায় পা দিতেই কয়েকটা ভিখিরির ছেলেমেয়ে আমাকে ঘিরে ধরল। রুক্ষ চুল করুণ চোখ কৃশ চেহারা। লক্ষ করলুম একটি ছেলের মাথায় ঠোঙার মুকুট। একটি মেয়ের গলায় শুকনো গাঁদা ফুলের মালা। কাছেই ফুটপাতের কোথাও বসে এতক্ষণ বর বউ খেলছিল বোধহয়। কিছু সময় তারা আমার পিছু নিল। ‘দাও না, দাও না।’ উলটো দিক থেকে ধীর গতিতে হেঁটে আসছিল একজন পুলিশ। কাছাকাছি হতে হঠাৎ কি ভেবে সে তার হাতের ব্যাটনটা দুলিয়ে বলে, ‘ভাগ।’ বাচ্চাগুলো পালিয়ে গেলে সে একবার আমার দিকে চেয়ে একটু তৃপ্তির হাসি হাসল। আমিও হাসলুম। বাচ্চাগুলো দূর থেকে চেঁচিয়ে বোধহয় আমাকেই বলছিল ‘ভাগ! ভাগ!’
