মহাকাশ থেকে নতুন কোনও খবর নেই। শুধু জানা গেল ওপর থেকে তারা পৃথিবীর দিকে অবিরল নজর রেখে চলেছে। দক্ষিণ মেরুর দিকে গত কয়েকদিন তুষারপাত খুবই কম হয়েছে।
সীমন্তক খোশ-মেজাজে উঠে বুড়ো লোকটির কাছাকাছি এসে বলল কী দেখছেন? বৃদ্ধ তাঁর বলিরেখাবহুল মুখখানা ফিরিয়ে তাকালেন। কিন্তু সীমন্তককে যেন চিনতে পারলেন। বিড়বিড় করে বললেন–সূর্য উঠেছে!
সীমন্তক হাসল। সূর্যের প্রতি তার নিজের কোনও দুর্বলতা নেই। বলল –মাঝে-মাঝে ওঠে। কিন্তু ওদিকে অত চেয়ে থাকবেন না। চোখের ক্ষতি হতে পারে।
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন–চোখের ক্ষতি আর কী হবে! আমার পুরোনো চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে সেই কবে! এটা হচ্ছে চতুর্থ চোখ। আবার না হয় পালটাব। একটু দেখতে দাও।
এরা কী দেখে, কী মজাই না পায় তা সীমন্তক ভেবেও পায় না। তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল –দেখুন না। তবে দেখার তো কিছু নেই। শুধু সাদা বরফ।
লোকটা আবার বাইরের দিক মুখ ফিরিয়ে বিড়বিড় করে বলল –সূর্য উঠেছে! বাইরে সূর্য উঠেছে। ওদের খবর দেবে না?
একটু ঝুঁকে সীমন্তক জিগ্যেস করে–কাকে খবর দেব?
ওই যারা নীচে রয়েছে। খবর দাও। তারপর চলো আমরা রোদ্দুরে যাই।
সীমন্তক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বুড়োটার মগজ বদলের সময় এসেছে। বাইরে গিয়ে স্বাভাবিক বাতাসের একটি শ্বাসও বুক ভরে নিলে সঙ্গে-সঙ্গে ফুসফুস জমে পাথর হয়ে যাবে। এক মুহূর্তের মধ্যে জমে কাঠ হয়ে যাবে শরীর। তাই বাইরে যাওয়ার দরকার হলে সম্পূর্ণ বায়ু-নিরোধক এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একরকমের পোশাক পরে যেতে হয়।
বুড়ো লোকটি উন্মুখ হয়ে সীমন্তকের দিকে চেয়ে বলল –আমি যখন খুব ছোট তখন মাটির ওপর সবুজ গাছপালা দেখেছি। তারপর হৈম হাওয়া আর তুষার আসতে লাগল। তখন পাতালে গর্ভনগর তৈরির কাজ করতেন আমার বাবা। যখন আমরা নীচে চলে গেলাম তখন খুব কেঁদেছিলাম আমি। বাবা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন–পৃথিবী আবার কয়েক বছরের মধ্যেই সবুজ হবে।
সীমন্তক এই বৃদ্ধের দুঃখকে সঠিক বোঝে না, তবু কিছু সমবেদনা বোধ করে সে বলে–পৃথিবী খুব শিগগির সবুজ হবে না।
–কেন?
সীমন্তক ম্লান হেসে বলে–যত বরফ জমে আছে পৃথিবীর ওপর তা গলতে বহু বছর লেগে যাবে। তারপর বরফ গলে নেমে আসবে মহা প্লাবন। ওপরের সমস্ত ভৌগোলিক সীমারেখা মুছে যাবে সেই প্লাবনে। জল সরতে লাগবে আরও বহু বহু বছর। সবুজ আসবে তারও বহু পরে।
–অরণ্য তৈরি হবে না, গাছে–গাছে পাখি ডাকবে না, ফুলে–ফুলে পতঙ্গের ওড়ার শব্দ শুনব কেউ কোনওদিন? আমাদের সকালের সূর্যোদয়, বিকেলের বিষণ্ণতা, রাত্রির নিস্তব্ধতা বলে কিছু থাকবে না ততদিন?
বুড়ো মানুষরা শিশুর মতোই। সীমন্তক তাই ছেলে–ভুলানো স্বরে বলে–চিন্তা কী? আমাদের গর্ভনগরের পক্ষী নিবাসে যথেষ্ট পাখি রয়েছে, আমরা রাসায়নিক পদ্ধতিতে মাটির নীচে অরণ্য না হোক যথেষ্ট গাছপালা তৈরি করেছি, পতঙ্গেরও অভাব নেই আমাদের কীট প্রজনন ক্ষেত্রে।
বিস্বাদে ভরে গেল বৃদ্ধের চাহনি। মাথা নত করে বলল –তোমরা কেন লেজার রশ্মি এবং বিস্ফোরণের সাহায্যে সব বরফ গলিয়ে ফেলছ না?
–লাভ কী? শূন্যের বহু নীচে নেমে গেছে তাপাঙ্ক। বরফ গলে যাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার তা জমাট বাঁধবে।
–কেন কৃত্রিম সূর্য সৃষ্টি করছ না?
সীমন্তক বৃদ্ধের পিঠে হাত রেখে বলে–আমরা সে চেষ্টাও করছি। কিন্তু কৃত্রিম সূর্যেরও সাধ্য নেই পৃথিবীর স্বাভাবিক তাপ ফিরিয়ে আনার।
বৃদ্ধ কথা বললেন না। বাইরের স্তিমিত সূর্যরশ্মির দিকে চেয়ে রইলেন। ঝোড়ো হাওয়ায় গুঁড়ো বরফ বালির মতো উড়ে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে বরফের স্তম্ভ, খিলান, গম্বুজ, আবার আপনা থেকেই ভেঙে যাচ্ছে সব।
বেতার যন্ত্র মহাকাশের বার্তা আসছে। সীমন্তক তার টেবিলে ফিরে গেল এবং বৃদ্ধের কথা তার আর মনে রইল না। বার্তা আসছে, মহাকাশ থেকে পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে দক্ষিণ মেরুতে একটি জায়গায় সামান্য কিছু বরফ গলে ছোট্ট একটু জলাশয় তৈরি হয়েছে। খবরটা অবিশ্বাস্য। সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। তবু সীমন্তক গর্ভনগরের বিশেষজ্ঞদের কাছে খবরটা পাঠিয়ে দিল। দীর্ঘ টানেলে যুক্ত পৃথিবীর গর্ভনগরের বিশেষজ্ঞরা কয়েক মিনিটেই দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছোতে পারবেন।
যখন সীমন্তক তার অত্যন্ত জরুরি বার্তাটি যথাস্থানে পৌঁছে দিতে ব্যস্ত তখন সেই বৃদ্ধ মানুষটি প্রাণপণে নিজেকে স্বচ্ছ কঠিন দেওয়ালে চেপে ধরে নিবিড় নিষ্পলক দৃষ্টিতে বাইরে চেয়েছিলেন। হঠাৎ তার দৃষ্টির বিভ্রম ঘটল।
তিনি দেখতে পেলেন অফুরান তুষার-স্তূপের একঘেয়ে সাদা রঙের ভিতর থেকে হঠাৎ ছোট্ট রামধনু রঙা গিরগিটির মতো একটি প্রাণী বরফের স্তর ভেদ করে মাথা তুলল। কী একটু দেখল চারদিকে। বিঘতখানেকের বেশি বড় নয়। তারপরই আবার টুক করে সরে গেল গর্তের মধ্যে। অবিশ্বাস্য! সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য! নিশ্চয়ই চোখের ভুল। বুড়ো লোকটি বিড়বিড় করে বলতে থাকেন –রোদ্দুর! গিরগিটি! রোদ্দুর! গিরগিটি! তবে কি অরণ্যও জেগেছে? সবুজ। পাখি?
বৃদ্ধ লোকটি চারদিকে চেয়ে দেখেন বুদ্বুদের ভিতরে কয়েকজন মানুষ তাদের যন্ত্রপাতির মধ্যে মগ্ন হয়ে রয়েছে, কেউ তাঁকে দেখছে না।
বৃদ্ধ চুপিসারে বুদ্বুদের দক্ষিণ প্রান্তে একটি সুড়ঙ্গের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। একদম শক্ত করে আঁটা ভারী এই ধাতব দরজা। কিন্তু বৃদ্ধ দরজা খোলার কৌশল জানেন। মাথার ওপরকার একটি হুইল ঘুরিয়ে তিনি দরজা ফাঁক করলেন এবং টুক করে নেমে পড়লেন সুড়ঙ্গে। পথ অল্পই। পথের শেষে আর-একটি ঢাকনি। সুড়ঙ্গের মধ্যে গরম হাওয়া বওয়ানো হচ্ছে তবু এখানে দুর্দান্ত শীতের আভাস পাওয়া যায়। কিন্তু বৃদ্ধ শীতকে গ্রাহ্য করেন না। বিড়বিড় করে বলতে থাকেন–ওরা জানে না বাইরে রোদ উঠেছে। বরফ গলছে। গিরগিটি দেখা দিয়েছে। ওরা জানে না বরফের নীচে ঘাস জন্মেছে…বলতে-বলতে তিনি বাইরের দরজা খুলে এক লাফে বেরিয়ে এলেন বাইরের সাদা মৃত হৈম পৃথিবীতে।
