মহাকাশচারীর পোশাকে গয়েশ সামন্ত তার রকেট থেকে বেরিয়ে এসে চাঁদের নির্জন এক মস্ত পাহাড়ের তলায় পায়চারি করতে লাগলেন। তাপহীন আগুনের চিন্তায় তার মাথা গরম।
পায়চারি করছেন, এমন সময় সামনে টুক করে একটা ঢিল পড়ল। পৃথিবীতে এরকম ঘটনা হামেশাই ঘটে। দুষ্টু ছেলের অভাব নেই সেখানে। কিন্তু চাঁদের এই নির্জন পাহাড়তলীতে ঢিল মারে কে! গয়েশ অবাক হয়ে চারদিকে দেখতে থাকেন। হঠাৎ নজরে পড়ল মাটি থেকে হাত বিশেক ওপরে একটা গামলার মতো বিচ্ছিরি চেহারার শূন্যযান থেকে বৈজ্ঞানিক হারাধন খাড়া উঁকি মেরে তাকে দেখছে এবং ফিক করে হাসছে। হারাধনকে দু চোখে দেখতে পারেন না গয়েশ।
হারাধন জলগ্রহ নেপচুনে হাইড্রোইলেকট্রিক প্ল্যান্ট বানিয়ে সেখান থেকে প্রজেকটারের সাহায্যে পৃথিবীতে অঢেল বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে। খুব রবরবা তার।
গয়েশ বিরক্ত হলেও ভদ্রতার খাতিরে হারাধনের দিকে চেয়ে একটু হাসলেন।
হারাধন তার গামলাটা নামিয়ে আনল। মহাকাশচারীর বর্মের মতো পোশাক পরা অবস্থাতেও হারাধন তার ঘাড় চুলকোবার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে গামলা থেকে মাটিতে নেমে এসে স্পিকিং টিউবের ভিতর দিয়ে বলল–কখন থেকে পোশাকের মধ্যে একটা ছারপোকা ঢুকে রয়েছে, জ্বালিয়ে খেলে।
গয়েশ তার কথা বলার যন্ত্রের ভিতর দিয়ে বললেন–স্পেশসুটে আজকাল বড্ড ছারপোকা হচ্ছে। আমাকেও প্রায়ই কামড়ায়। একজন মার্কিন সায়েন্টিস্ট সেদিন দুঃখ করে বলছিলেন তার একটা শখের স্পেশসুট নাকি উই পোকায় খেয়ে ফুটো করেছে, আর একটায় কঁকড়া বিছে বাসা বেঁধেছে, বোঝো কাণ্ড!
হারাধন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে–শুধু তাই নয়, পোকাগুলোকে কিছুতেই মারাও যাচ্ছে না। সবচেয়ে কড়া পোকা মারার ওষুধ দিয়েও কাজ হচ্ছে না। ভারী মুস্কিল।
পোকামাকড়ের কথা কিছুক্ষণ গম্ভীরভাবে আলোচনা করলেন দুজনে। তারপর হারাধন বলল–আজ বড় খাটুনি গেল গয়েশদা। নেপচুনে যন্ত্রপাতির কিছু গণ্ডগোল ছিল। সেই রাত বারোটা থেকে সারাদিন, এখনো হাতমুখ ধোয়ার সময় পাইনি।
গয়েশ আঁতকে উঠে বললেন–হাতমুখ কি চাঁদের জল দিয়ে ধোবে নাকি? সর্বনাশ, এখানকার জল কিন্তু ভীষণ ভারী, বিচ্ছিরি সব মিনারেল রয়েছে এই জলে।
হারাধন হেসে বলে–আরে না, আমি প্লটো থেকে হাতমুখ ধোয়ার বা স্নান করার জল আনি।
গয়েশ উদ্বিগ্ন হয়ে বলেন–খাও কোন জল?
–নেপচুন, ও ছাড়া অন্য জল সহ্যই হয় না। আমাশা হয়ে যায়।
গয়েশ ম্লান মুখে বলেন–আমারও। নেপচুনের জলে শুনেছি অনেক ট্রেস এলিমেন্ট আছে। আমার জন্য খানিকটা পাঠিয়ে দিও তো। পেটটা কয়েকদিন ধরেই বড় ভুটভাট করছে।
হারাধন ম্লান মুখে বলে, ভুটভাটের কথা আর বোলো না দাদা। আমিও ওই ভুটভাটের রুগী। তারা কিছুক্ষণ পেটের গোলমাল আর জলবায়ু নিয়ে কথা বললেন।
হারাধন হঠাৎ বললেন–আরে ভাল কথা, ইনজিনিয়ারদের সব মাইনে বাড়ল শুনেছো নাকি!
বিরস মুখে গয়েশ বলেন–শুনছি তো তাই।
–তো আমাদের সায়েন্টিস্টদের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা হল না। তাহলে এবারও?
–কৈ আর হল!
–এ ভারী অন্যায় গয়েশদা। তোমাকে এই বলে রাখছি, সরকার যদি সায়েন্টিস্টদের সঙ্গে সমার মতো ব্যবহার করে তবে কিন্তু তারা ধর্মঘট করতে বাধ্য হবে। এবার স্পেশ সায়েন্সের জন্য নোবেল প্রাইজ কাকে দিয়েছে জানো?
–না, গয়েশ খুব সতর্ক গলায় বলেন। আসলে তিনি শুনেছেন, ডিসেম্বর মাসের আগে যদি তিনি তাপহীন আগুন আবিষ্কার করতে পারেন তবে নোবেল প্রাইজ তাকেই দেওয়া হবে। মহাকাশযানে ব্যবহারের জন্য তাপহীন আগুনের বড়ই দরকার।
এবার তারা কিছুক্ষণ বেতন বৃদ্ধি এবং প্রাইজ নিয়ে কথাবার্তা চালালেন। তারপর হারাধন তাঁর গামলার মতো শূন্যযানে চড়ে চলে গেলেন হাত পা ধুয়ে বিশ্রাম নিতে।
চাঁদ থেকে আকাশের রঙ ঘোর কালো দেখায়। গয়েশ অন্যমনস্কভাবে আকাশের দিকে চেয়ে রইলেন। নিকশ কালো আকাশে প্রচণ্ড সেজে সূর্য জ্বলছে। আগুনকে তাপহীন করার পদ্ধতি যদি তিনি আবিষ্কার করতে পারেন তাহলে একদিন সূর্যের তাপকেও নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হবে না। ভ্র কুঁচকে এইসব ভাবতে ভাবতে আর অবিরল পায়চারী করতে করতে তার একটু খিদে পেল।
গয়েশের রকেটটা ঊর্ধ্বমুখ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রকেটের গায়ে চৌম্বক খিল দিয়ে একটা চমৎকার হালকা কাঁচতর শূন্যযান লাগানো। দেখতে অনেকটা পিরিচের মতো। গয়েশ পিরিচটা খুলে উঠে বসলেন। চোখের পলকে চাঁদের গবেষণাগারের কাছে লোকবসতির মধ্যে এসে নামলেন। ঢুকলেন মাটির তলার ক্যান্টিনে।
এখানে কৃত্রিম আবহমণ্ডল থাকায় স্পেশসুট খুলে ফেললেন গয়েশ। জল ছুঁলেন না, একটা রশ্মিযন্ত্রের কাছে গিয়ে সুইচ টিপে নানারকম রশ্মি দিয়ে হাত মুখ বীজাণুমুক্ত করলেন। তারপর মস্ত হলঘরে গিয়ে বসলেন। হলঘর একেবারে ফাঁকা। তবে প্রায় সিকি মাইল লম্বা হলের একেবারে শেষ প্রান্তে বুড়ো বৈজ্ঞানিক সাধন হাজরা বসে আপনমনে বিড়বিড় করছেন। ব্যর্থ ও উন্মাদ বৈজ্ঞানিকদের যে তালিকাটি গতবছর বেরিয়েছে। তাতে সাধনের নাম সবার ওপরে। লোকটা খুব সাংঘাতিক কিছু আবিষ্কার করার জন্য খুব গোপনে গবেষণা চালাচ্ছিল। আর সেই গবেষণা করতে করতেই কেমন যেন পাগলাটে আর একাচোরা স্বভাবের হয়ে গেল। পৃথিবীতে নিজের বাড়িতে আর যায় না। চাঁদের ক্যান্টিনেই সারাদিন বসে বসে সময় কাটিয়ে দেয়। তাকে কেউ ঘাঁটায় না।
