ধানুরাম ভয়ে উদ্বেগে ঘামতে লাগলেন। ধীরে ধীরে অগত্যা নিজের যানটিকে নীচে নামিয়ে আনলেন। নামাতে খুবই ক্লেশ পেতে হলো। নিচ্ছিদ্র গাছপালা, লতাগুল্মে তলাটা দুর্ভেদ্য হয়ে আছে। যানটা ভূমিস্পর্শ করতে পারল না। লতাপাতায় আটকে ঝুলে রইল। ধানুরাম লাফ দিয়ে নীচে নেমে নাতির নাম ধরে ডাকাডাকি করে খুঁজতে লাগলেন। চারিদিকে নানারকম জীবজন্তুর পায়ের শব্দ হচ্ছে। একটা হাতি ডেকে উঠল কাছেপিঠে। হায়না হাসল। ধানুরামের বুক কাঁপতে লাগল ভয়ে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সী নাতি। এ জঙ্গলে তার নিরাপত্তা কোথায়?
খুঁজতে খুঁজতেই ধানুরাম বুঝতে পারলেন আশা নেই। গাছপালায় চারদিক এত অন্ধকার যে এই দিন দুপুরেও কিছু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। তবু প্রাণপণে ডাকতে লাগলেন। যদি সাড়া দেয়। তারপরেই ঘটল অত্যাশ্চর্য ঘটনা। ধানুরাম নাতিকে খুঁজতে খুঁজতে বেশ খানিকটা এগোতেই হঠাৎ দেখতে পেলেন সেই গরিলাটা তার নাতির হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে একটা ফাঁকা জায়গায়। আর সাতটা বাঘ তার নাতিকে ঘিরে পা আর গা চেটে আদর করছে।
ধানুরাম একটা শ্বাস ছাড়লেন। না, জীবজন্তুরা আর আগের মতো নেই। নব্য প্রজন্মের এরা বেশ সভ্য ভব্যই বলতে হবে।
ভালোমানুষ হরবাবু
বাড়িতে চোর ঢুকেছে টের পেয়ে হরবাবু বিছানায় উঠে বসে আপনমনে বললেন–এসব কী অসভ্যতা?
ভারী বিরক্ত হয়ে তিনি বিছানা ছেড়ে উঠলেন। দরজা খুলে বাইরের বারান্দায় এসে চুপ করে বসে জ্যোৎস্না দেখতে লাগলেন। চুরিটুরি খুব অপছন্দ করেন হরবাবু। তাঁর চোখের সামনেই চুরি হোক–এটা তার সহ্য হবে না।
চোরটা বড়ই নির্লজ্জ। পাপ কাজ গোপন করার কোনো চেষ্টাই নেই। বারান্দায় বসেই তিনি শুনতে পেলেন, ঘরে বাক্স প্যাটরা নাড়ার, বাসনকোসন পড়ার, আলমারি ভাঙার বিকট সব শব্দ হচ্ছে।
রেগে গিয়ে মুখ ফিরিয়ে হরবাবু ধমক মারলেন–আস্তে! বেহায়া কোথাকার!
চোরটা বা চোরেরা তাতে খানিকটা সাড়াশব্দ কম করতে লাগল। কিন্তু ব্যাটাদের কাজ আর শেষ হয় না। ভারী আনাড়ি চোর সব হয়েছে আজকাল। কিছু শিখবে না, জানবে না, দুদিন একটু ট্রেনিং নিয়েই কাজে নেমে পড়ে।
হরবাবু জ্যোৎস্না দেখতেই লাগলেন। ঘণ্টাখানেক বাদে ঘর থেকে একটা কর্কশ গলা যতদূর সম্ভব মোলায়েম হয়ে বলল–কাম সারা হয়ে গেছে বড়বাবু। এখন আরাম করে শুয়ে পড়ুন।
হাই তুলে হরবাবু উঠলেন এবং ঘরে গিয়ে বিছানায় শুলেন। ভারী লোভী আর অভদ্র চোর সব আজকালকার। বিছানার চাদর, বালিশের পাশে টর্চ–সব নিয়ে গেছে। কসার গ্লাসে জল ঢেকে রেখেছিলেন রাতে খাবেন বলে, সেটা শুন্ধু নেই।
চোরে সব নিয়ে গেছে। তবু তো বাজার করতে হবে, রাঁধতে হবে, খেতেও হবে। হরবাবু তাই ধার কর্জ করে বাজারে চললেন সকালবেলায়।
আলুওলা, পটলওলা, মাছওলা সবাই ভালমানুষ হরবাবুকে ভালভাবে চেনে। হরবাবুর যেদিন আলুর দরকার নেই সেদিনও আলুওলা তাকে পাকড়াও করে ব্যাগের মধ্যে জোর করে দু কেজি আলু ঢুকিয়ে দেয়। হরবাবু ঝিঙে বা করলা খান না, কিন্তু তা বলে ঝিঙে বা করলাওয়ালারা তাকে ছাড়ে না। প্রায় দিনই তাঁকে সের খানেক ঝিঙে আর করলা কিনে আনতে হয়। সেগুলো ঘরে পড়ে থেকে পচে যায়। হরবাবু আপন মনে রাগারাগি করেন-তরকারিওয়ালারা হয়েছে যত সব গুণ্ডা বদমাস।
ধার করা পয়সায় বাজার করতে বেরিয়েছেন, রাস্তায় খলিফা হালদারের সঙ্গে দেখা।
–এই যে হর, তুমি যে মাস তিনেক আগে একশো টাকা ধার নিয়েছিলে, তার কী করলে?
হরবাবু খুব ব্যথিত হয়ে তাকিয়ে থাকেন। কথাটা ঠিকই যে মাস তিনেক আগে হরবাবু খলিফা হালদারের কাছ থেকে একশো টাকা ধার নিয়েছিলেন। কিন্তু হরবাবুর খুবই স্পষ্ট মনে আছে যে, একমাস বাদেই টাকাটা শোধ করেছিলেন। কিন্তু সেটি খলিফাবাবুর মনে ছিল না বলে পরের মাসেই আবার নতুন করে টাকাটা তাকে শোধ করতে হয়। সেটাও হরবাবু হাসি মুখেই মেনে নেন। ভুল তো মানুষের হয়ই। কিন্তু ফের গত মাসেও খলিফা সেই একশো টাকার তাগাদা দেওয়াতে খানিকটা বিরক্ত হয়েই হরবাবু আবার টাকাটা শোধ করেন। সে যা যাওয়ার গেছে। কিন্তু খলিফা আজ আবার চাইছে।
হরবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব সংকোচের সঙ্গে বললেন–টাকাটা কি আপনাকে দিইনি?
–দিয়েছো? কবে দিলে? কৈ, আমার তো মনে পড়ছে না। হরবাবু মাটির দিকে তাকিয়ে লজ্জার সঙ্গে বলেন–তাহলে তো দিতেই হয়। তা নেবেন। দুচার দিনের মধ্যেই দিয়ে দেবো।
মুদির দোকান থেকে ধারে জিনিস কেনেন হরবাবু। মুদি হরবাবুকে জক দিয়ে বলে–আপনার হিসেবটা দেখে নেন হরবাবু। গত মাসে আপনি একশো বাহাত্তর টাকা বিরাশি পয়সার জিনিস নিয়েছেন।
হরবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, মুদির দোকানের হিসেব তিনিও নোট বইতে লিখে রাখেন। তার হিসেব মতো মোটে বাষট্টি টাকা পনের পয়সা হয়েছে। কিন্তু কারো মুখের ওপর স্পষ্ট কথা বলতে তাঁর বড় কষ্ট হয়।
তাই বললেন–আচ্ছা, দেবোখন। কয়েক দিনের মধ্যেই দেবো। বাজার থেকে ফিরে রান্নাবান্না করে খেতে গিয়ে ভারী অসুবিধে হল আজ। বাসনপত্র নেই, বাজার থেকে মেটে হাঁড়ি আর কলাপাতা এনেছেন। মেটে হাঁড়িতে কোনোক্রমে সেদ্ধ ভাত করে কলাপাতায় খেয়ে ইস্কুলে চললেন। তিনি অঙ্কের মাস্টারমশাই।
বাজার-হাটে পথে-ঘাটে রাজ্যের ভিখিরি। আজকালকার ভিখিরিরাও ভারী তাঁদড়। বেশির ভাগ লোকই ভিক্ষে টিক্ষে দেয় না একটা, যারা যা-ও দেয় সে-ও দু-এক পয়সার বেশি নয়। কিন্তু হরবাবুর কথা আলাদা। ভিখিরিরা তাকে দেখলেই সব নেচে ওঠে। পাঁচ দশ পয়সা দিলে ভারী চটে যায় ভিখিরিরা। একবার একটা বুড়ো ভিখিরিকে মোটে দশ পয়সা দিয়েছিলেন তিনি। তাতে সে চটে উঠে পয়সাটা ফেরত দিয়ে বলেছিল–এঃ দশ পয়সা দিয়েছ! কেন, আমরা কি ভিখিরি নাকি?
