কিন্তু বলাই বাহুল্য আসল বরদাচরণকে কোথাও পাওয়া গেল না।
দারোগাবাবু হতাশ হয়ে বললেন, তাই তো ভাবছি, ভেবে ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না। বরদাচরণকে ধরতে না পারা অবধি আমার ভাল করে ঘুম হবে না, পেট ভরে খাওয়া হবে না। তা মুক্তোটা আপনার ইনসিওর করা ছিল তো?
গদাধরবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তা ছিল। কিন্তু টাকাটাই তো বড় কথা নয়। এমন রেয়ার জিনিস কি আর যোগাড় করা যাবে?
দারোগাবাবু নিজের অক্ষমতায় কেবল দাঁত কিড়মিড় করতে লাগলেন।
রামবাবুও পুলিশের কাছে অভিযোগ করলেন যে, তার মেয়ের গয়নাও বরদাচরণই চুরি করেছে বলে তার সন্দেহ হচ্ছে।
কিন্তু বরদাচরণের কোনো হদিশ পাওয়া গেল না। গয়না বা মুক্তো চুরিরও কোনো হিল্লে হল না।
একদিন নিশুত রাত্রি। গদাধরবাবু তাঁর দোতলার ঘরে শুয়ে ঘুমোচ্ছন। হঠাৎ একটা খুটখাট শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল। প্রথমে ভাবলেন, ইঁদুর, তারপর মনে হল, শব্দটা আসছে জানালা থেকে।
টর্চটা নিয়ে গদাধরবাবু উঠলেন, জানালায় কাউকে দেখা গেল না। তবে ঘরের মেঝেয় একটা চিঠি পড়ে ছিল। গদাধরবাবু চিঠি খুলে পড়লেন। তাতে লেখা আপনার মুক্তোটা আমরা ফেরত দিতে চাই। তার জন্য মাত্র পাঁচ লাখ টাকা দক্ষিণা লাগবে। মুক্তোটা আমাদের কাছেই আছে, নিশ্চিন্ত থাকবেন।
চিঠিটা পড়ে গদাধরবাবুর কপালে একটু দুশ্চিন্তার রেখা পড়ল। তিনি চটপট জামা কাপড় পরে চাকরদের ডাকলেন, ড্রাইভারকে ঘুম থেকে তুলে গাড়ি বার করা হল, নিশুত রাত্রেই গদাধরবাবু রওনা হলেন।
মাইল দশেক দূরে একটা গঞ্জে এক বাড়ির সামনে তাঁর গাড়ি থামল। বাড়িটা গদাধরবাবুর এক বিধবা দিদির।
ডাকাডাকি করতে একজন যুবক ছেলে ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে বলল, এ কি, মামা যে এত রাত্রে? কী হয়েছে? গদাধরবাবু চিঠিখানা বের করে ভাগ্নের হাতে দিয়ে বললেন, এর মানে কী?
ছেলেটা চিঠিটা পড়ে অবাক হয়ে মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলল, মুক্তোটা তো…
গদাধরবাবু চাপা গলায় খেঁকিয়ে উঠে বললেন, হ্যাঁ, মুক্তো তোমার কাছে, তবে এই চিঠি দিল কে?
বোধহয় কেউ চালাকি করার চেষ্টা করছে।
গদাধরবাবু মাথা নেড়ে বললেন, তবু মুক্তোটা আমি নিজের চোখে দেখে যেতে চাই।
তাহলে এসো। দেখাচ্ছি।
ভাগ্নের সঙ্গে গদাধরবাবু বাড়ির মধ্যে ঢুকলেন, সিঁড়ি বেয়ে চিলে কোঠায় উঠলেন। চিলে কোঠায় রেনপাইপের মধ্যে ঝোলানো একটা সুতো টেনে তুলল তার ভাগ্নে, সুতোর মাথায় একটা কাগজের মোড়ক বাঁধা, মোড়ক খুলে দেখা গেল, মুক্তোটা যথাস্থানেই আছে।
গদাধরবাবু নিশ্চিন্তের শ্বাস ছেড়ে বললেন, যাক বাবা, যা ভয় হয়েছিল, ইনসিওরেনসের টাকাটা পেলেই ঠক্করলালকে মুক্তোটা বেচে দেব। কথা হয়ে আছে।
মুক্তো আবার সুতোয় ঝুলিয়ে দিয়ে দুজনে তাকিয়ে দেখে দরজায় ড্রাইভারটি দাঁড়িয়ে আছে।
গদাধরবাবু ভারী অসন্তুষ্ট হয়ে বলে উঠলেন, এ কি? তুমি এখানে কেন? কে তোমাকে ডেকেছে?
কেউ ডাকেনি। নিজের গরজেই আসতে হল গদাধরবাবু। থাক থাক পিস্তল বের করতে হবে না। আমার হাতেও পিস্তল আছে।
গদাধরবাবুর হাত অবশ হয়ে গেল। বললেন, তুই কে?
কে বলে আপনার মনে হয়?
গদাধরবাবুর সন্দেহটা খুঁচিয়ে উঠল, বললেন, বরদা নাকি?
আজ্ঞে আপনার সেবায় আমি বরদাচরণই হাজির বটে। চালাকিটা খুবই ভাল ছিল আপনার। রামবাবুর মেয়ের বিয়ের গয়নার মধ্যে একটা মস্ত হীরে ছিল। সেটা হাতানোর জন্য নিজের ভাগ্নেকে সাধু সাজিয়ে কাজে লাগিয়েছিলেন। তারপর নিজের মুক্তোটা নিজেই সরালেন চমৎকার প্ল্যান করে। ফকির সেজে আপনার ভাগ্নে আমার দু ঘণ্টা আগে গিয়ে হাজির হয়েছিল। বাড়ির লোক, চাকর, দারোয়ান সবাই সাক্ষী থাকল যে ফকিরবেশী সেই লোকটা আমিই, আপনারও কাজ হাসিল হয়ে গেল। তবে শেষ রক্ষাটা হল না এই যা। উঁহু উঁহু ভাগ্নেবাবাজী, মাথার খুলি উড়িয়ে দেবো। সিঁড়িতে বুটের শব্দ পাচ্ছো না? পুলিশ।
বাস্তবিকই পুলিশ। সামনে স্বয়ং দারোগাবাবু।
বাজারদর
একশো বছর পর ঘুম ভাঙতেই রামবাবু ভারী অস্বস্তি বোধ করলেন। যে কাঁচের বাক্সে তিনি শুয়ে আছেন, সেটার ভিতরটা ভীষণ ঠাণ্ডা। তার ওপর চোখে তিনি সবকিছু ধোঁয়াটে দেখছেন, কান দুটো ভোঁ ভোঁ করছে, হাত-পা খিল ধরা, মাথাটা খুব ফাঁকা।
কিছুক্ষণ একেবারে ডোম্বলের মতো শুয়ে রইলেন রামবাবু। তারপর আস্তে আস্তে শরীর গরম হল, কানের ভো ভো কমে গেল, হাত পায়ের খিল ছাড়ল। সবকিছু মনে পড়তে লাগল। মনে পড়তেই তিনি ভীষণ আঁতকে উঠে বসলেন এবং চারদিকে প্যাট-প্যাট করে তাকাতে লাগলেন। ১৯৭৯ সালে তাকে গভীরভাবে ঘুম পাড়িয়ে একটা ঠাণ্ডা বাক্সে ভরে মাটির নীচে একটা স্টোর রুমে রেখে দেওয়া হয়েছিল। কথা ছিল একশো বছর পর পরবর্তী সমাজের মানুষ তার ঘুম ভাঙাবে।
একশো বছর কি কেটে গেল এর মধ্যেই? চোখের দৃষ্টি কিছু স্বচ্ছ হতেই তিনি দেখলেন, কাঁচের বাক্সটা একটা টেবিলের ওপর রাখা, টেবিলের চারধারে দাঁড়িয়ে সাদা পোশাক পরা কয়েকজন লোক তাকে গম্ভীরভাবে দেখছে।
রামবাবু প্রথমে একটা হাঁচি দিলেন, একটু কাশলেন, একটা হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙলেনভারী লজ্জা-লজ্জা করছিল তাঁর। স্বাভাবিক নিয়মে এতদিন তার বেঁচে থাকার কথা নয়। হিসেব করলে, এখন তার বয়স ঠিক একশো চল্লিশ বছর। তাছাড়া এই একশো বছর পরেকার দুনিয়ায় কত কী পাল্টে গেছে। কেমন লাগবে কে জানে বাবা! তিনি প্রথমেই দেখে নিলেন মানুষগুলোর এই একশো বছরের বিবর্তনে লেজ বা শিং গজিয়েছে কি না। গজায়নি। লোকগুলো খুব লম্বা বা বেঁটে হয়ে যায়নি তো? না। লোকগুলো ভাল, না খারাপ? বোঝা যাচ্ছে না। তবে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা তার জানতে ইচ্ছে করছিল, সেটা হল বাজারদর। এখন চাল কত করে কিলো? আলু কত? মাছ কত? পালং, কপি, কড়াইশুটিই বা কী রকম?
