ঘাবড়ে গেলেও দোলগোবিন্দ ঘাড় কাৎ করে বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ।
এখন শোনো। যে ছাতাটা তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছে তা আমরাই পাঠিয়েছিলাম। আমাদের এই মহাকাশযানে একটা যন্ত্রের মধ্যে একটা ফুটো দেখা দিয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও সেই ফুটো আমরা বন্ধ করতে পারিনি। বাধ্য হয়ে আমরা আমাদের সবজান্তা যন্ত্রমগজের সাহায্য নিই। যন্ত্রমগজ আমাদের তোমার নাম জানিয়ে বলে, এক মাত্র এই লোকটাই সেই কেমিক্যাল তোমাদের দিতে পারে যার সাহায্যে ফুটো সারানো সম্ভব। তাই তোমাকে একটু কষ্ট দিয়ে এখানে টেনে এনেছি।
দোলগোবিন্দ প্রায় আকাশ থেকে পড়ে বললেন, কিন্তু আমি তো বৈজ্ঞানিক নই, সামান্য ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট। আমি কেমিক্যালের কী জানি? জীবটা বলল, ভাল করে ভেবে দেখ। আমাদের যন্ত্রমগজ কখনও মিথ্যে কথা বলে না। ভুলও করে না। পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের মধ্যে ও শুধু একটা লোকেরই নাম বলেছে। দোলগোবিন্দ মিত্র। সুতরাং নিশ্চয়ই তুমি আমাদের সাহায্য করতে পারবে।
দোলগোবিন্দ আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলেন। কিছুই তার মনে পড়ল না। তবে মাঝে মাঝে উনি কিছু আজগুবি মিকশ্চার তৈরি করেছেন, করে সেগুলো বাতিল শিশি বা জারের মধ্যে ভরে নিজের আলমারিতে রেখে দিয়েছেন। তা দিয়ে কোনও কাজ হবে না জেনেও, আমতা আমতা করে বললেন, দেখুন এই ইয়ে, আমি ফুটো বন্ধ করার কোনও কৌশল জানি না। তবে আমার কাছে কয়েকটা আজগুবি মিকশ্চার আছে। কিন্তু তার মধ্যে কোন্টা কাজে লাগবে তা তো জানি না।
জীবটা বলল, আপনি এক্ষুনি আপনার ল্যাবরেটরিতে চলে যান। ওই ছাতাই আপনাকে নিয়ে যাবে এবং নিয়ে আসবে। যদি আমাদের ছিদ্র সারাতে পারেন, তবে আপনাকে আমরা পুরস্কার দেবো।
তাই হল। ফের প্রাণ হাতে করে ছাতার হাতল ধরে ঝুলে রইলেন দোলগোবিন্দ। ল্যাবরেটরির সামনে এসে দেখলেন, সর্বনাশ, দরজায় তালা দেওয়া।
কী করবেন ভাবছেন, এমন সময় হাতের ছাতাটা আপনা থেকেই উঠে তালাটায় গিয়ে একটা গুতো মারল। সঙ্গে সঙ্গে টক করে খুলে গেল তালা।
ভিতরের আলমারি খুলে মোট পাঁচটা শিশি আর জার হাতে বগলে নিয়ে বেরিয়ে এলেন দোলগোবিন্দ। ছাতাটা তালায় আর একটা গুতো দিতেই সেটা এঁটে গেল। দোলগোবিন্দর হাত আর বগল থেকে শিশি আর জারগুলোও পটাপট চুম্বকের আকর্ষণে ছাতার মধ্যে সেঁধিয়ে শিকগুলোর সঙ্গে লেগে রইল।
ঝুল খেতে খেতে দোলগোবিন্দ এসে সেই মহা পটলের মতো মহাকাশযানে উঠলেন।
সেই জীবটা এগিয়ে এসে দোলগোবিন্দবাবুকে খুব খাতির করে নিয়ে গেল।
পটলটার তলার দিকে একটা ধাতব বাক্সের মতো জিনিস আছে। ফুটোটা সেখানেই।
দোলগোবিন্দবাবুর মনে পড়ল যে শিশিটায় সবুজ রঙের ঘন পদার্থ রয়েছে তা থেকে দু ফোঁটা একবার তার টেবিলের ওপর পড়ে যায়। পরে সেটা এমন শক্ত হয়ে জমে গিয়েছিল যে তিনি সেটা উকো দিয়ে ঘষেও তুলতে পারেননি। সুতরাং দোলগোবিন্দ আর দেরি না করে সবুজ শিশি থেকে দু ফোঁটা ফুটোয় ঢেলে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা শক্ত হয়ে জমে গেল।
জীবটা একটা যন্ত্র থেকে তাপ্পি দেওয়া জায়গাটায় অনেকক্ষণ ধরে তাপ দিল। আবার একটা পাইপ থেকে ভীষণ ঠাণ্ডা একটা পদার্থ ছড়াল ওর ওপর। কিন্তু ফুটোর তাপ্লি টিকে রইল।
লেজ ও শুড়ওলা জীবটা দোলগোবিন্দর দিকে চেয়ে খুব বিনীতভাবে বলল, চমৎকার! আপনি যে আমাদের কী উপকার করলেন তা আর বলার নয়। এর জন্য আপনাকে আমরা আমাদের গ্রহের দুটি অতি মূল্যবান জিনিস দিয়ে যাচ্ছি। এ দুটো দিয়ে আপনি ভাগ্য ফেরাতে পারবেন।
জীব ভদ্রলোক দোলগোবিন্দকে দুটো ক্ষুদে বাক্স দিলেন। দোলগোবিন্দও ফের ছাতার বাঁট ধরে নেমে নিজের বাসার দোরগোড়ায় নামলেন।
পরদিন সকালে বাক্স দুটো খুলে হাঁ হয়ে গেলেন দোলগোবিন্দ, একটায় খানিকটা কচ লবণ, অন্যটায় একটুখানি চুন। রসিকতা নয় তো!
না। অনেকক্ষণ ভেবে দোলগোবিন্দ বুঝতে পারলেন, এ দুটো জিনিস সম্ভবত ওই গ্রহে পাওয়া যায় না, নিশ্চয়ই ভীষণ মুল্যবান। শুড় লেজওলা জীব বোধহয় জানে না যে পৃথিবীতে ওই দুই বস্তু অঢেল এবং সস্তা।
মনটা খারাপ হয়ে গেল বটে দোলগোবিন্দর, কিন্তু দমলেন না। সবুজ শিশিটা নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করলেন। যেখানে ফুটো পান সেখানেই প্রয়োগ করেন। ছাদের ফুটো, ছাতার ফুটো, বাসনের ফুটো।
ফুটো সারানোয় রীতিমত নাম ডাক হতে লাগল তার। ক্রমে নৌকো জাহাজ এরোপ্লেনের ফুটো পর্যন্ত সারাতে তাঁর ডাক পড়তে লাগল।
বলা বাহুল্য, দোলগোবিন্দর নাম এখন ফুটোবাবু। কোটি কোটি টাকার মালিক। বিশাল বাড়ি, গাড়ি, কোনো কিছুরই অভাব নেই।
বহুরূপী বরদাচরণ
গোয়েন্দা বরদাচরণ যদিও খুবই বুদ্ধিমান লোক, তবু তার আচার আচরণ কিছুটা অস্বাভাবিক। সাধারণ মানুষ যা করে তিনি তা কখনো করেন না। কারো বাড়িতে ঢুকবার সময় তিনি সদর দরজা দিয়ে ঢেকেন খুবই কম। তিনি ঢোকেন পিছনের পাঁচিল ডিঙিয়ে, পাইপ বেয়ে ছাদে উঠে বা ওই রকম বিচিত্র পদ্ধতিতে। তিনি হয়তো মগরা যাবেন, কিন্তু উঠবেন মেল ট্রেনে। মেল ট্রেন মগরায় থামে না এটা তিনি ভালই জানেন। তবু ওঠেন এবং চলন্ত মেল ট্রেন থেকে লাফিয়ে মগরায় নেমে পড়েন। চড়চড়ে রোদের মধ্যেও তাকে গায়ে রেন কোট এবং পায়ে গামবুট পরে থাকতে দেখা যায়। গ্রীষ্মকালে কেন যে তিনি মাঝে মাঝে ওভারকোট পরেন তা বুঝেওঠা দায়। ছদ্মবেশ ধারণে তিনি খুবই পটু সন্দেহ নেই। কিন্তু সবসময়েই ছদ্মবেশ ধারণ করে থাকেন বলে তাঁর আসল চেহারাটা কিরকম তা লোকে ভুলেই গেছে। কখনো তাঁর পাকানো গোঁফ, কখনো ঝোলা গোঁফ কখনো ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি, কখনো রবীন্দ্রনাথের মতো ঝুল দাড়ি, কখনো বাবরি চুল, কখনো বা কঁকড়া চুল, চোখে কখনো লাল চশমা, কখনো কালো নীল চশমা, কখনো চশমা, কখনো দাঁতে কালি মাখিয়ে ফোকলা বুড়ো সেজে লাঠি হাতে ঠুকঠুক করে ঘুরে বেড়ান, কখনো পাগড়ি বেঁধে শিখ সেজে আবির্ভূত হন। তার এই বহুরূপের জন্য তার বাড়ির লোকও ভুলতে বসেছে বরদাচরণের প্রকৃত চেহারাটা কিরকম। সেদিন একজন ঘুঁটেউলিকে ডেকে বরদাচরণের মা ঘুঁটে রাখলেন, সেই সময় ঘুঁটেউলির নাকের বাঁ পাশে আঁচিলটা দেখে তার সন্দেহ হল, এ হয়তো বরদা। কারণ, বরদাচরণ ক দিন হল একটা তদন্তের কাজে বাইরে গেছেন, তার কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। তাই চেঁচিয়ে উঠলেন, আমোলো, বরদা নাকি রে? কিন্তু বাস্তবিক ঘুঁটেউলি কিন্তু বরদা ছিলেন না। তবে এ নিয়ে খুঁটেউলিকে বিস্তর ঝামেলা পোয়াতে হয়েছিল। আবার একদিন রাতে বরদাচরণের বাবা কালিঝুলি মাখা একজন লোককে বরদাচরণের ঘর থেকে চুপি চুপি বেরোতে দেখে জাপটে ধরে চোর চোর বলে চেঁচাতে লাগলেন। পাড়ার লোকজন এল, চোর পাকড়াও হল, কিন্তু চোর কেবলই বলে, আমি বরদা। নকল চুলদাড়ি খসিয়ে কালিঝুলি ধুয়ে যখন আসল চেহারাটা দেখা গেল তখনও বরদাচরণের বাবা বলতে লাগলেন, এ কখনোই বরদা নয়। বরদার মোটেই এরকম চেহারা নয়! কিন্তু বরদার মা কেবলই বলেন, ওগো এই তো আমার বরদা, কিন্তু তার কথা কে বিশ্বাস করবে। কদিন আগেই ঘুঁটেউলিকে অবধি বরদা ভেবেছিলেন। যাই হোক এ নিয়ে অনেক ঝামেলা হয় মাঝে মাঝে।
