ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে গোরস্থানের কাছ-বরাবর এসে এক গাছতলায় বসে জিরিয়ে নিচ্ছিল সিধু। খুব ঠাহর করে সমুখপানে দেখে বলল,”ঐ মস্ত বাড়ি, ওটা কার রে?”
চাকর উত্তর দিল, “ও হালুম মিঞার বাড়ি।”
“বটে বটে!” বলে খুব খুশির ভাব দেখাল সিধু, “তা হালিম দু-পয়সা করেছে বটে। এতকাল তো খেয়াল হয়নি।”
এই বলে সিধু সিঁদকাঠি বের করল।
পরদিন গঞ্জে হৈ-চৈ পড়ে গেল। হালুম মিঞার বাড়িতে মস্ত চুরি হয়ে গেছে। সকালে হালিমের বউ পা ছড়িয়ে পড়া জানান দিয়ে কাঁদতে বসেছে–”ওগো, আমার কী হলো গো? আমার সব চেঁছে পুঁছে নিয়ে গেছে গো। বলি ও বুড়ো হালিম, তোর শরম নেই? যার দাপে বাঘে গরুতে একঘাটে জল খেত তার বাড়িতে চুরি? বলি ও মুখপোড়া হালিমবুড়ো, সাতসকালে গাঁজা টানতে বসেছিস। কচু গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ফাঁসি দে, থুথু ফেলে তাতে ডুবে মর…”
দাওয়ায় বসে গাঁজা খেতে খেতে হালিম কেবল রক্তচক্ষু মেলে তাকিয়ে তার বিবিকে ধমক দিয়ে বলে, “চুপ র, চুপ র বাঁদী। যে ব্যাটা চুরি করেছে তার গর্দানের জিম্মা আমার। দেখিস।”
তা শুনে বিবি আরো ডুকরে কেঁদে ওঠে।
হালিম দুটো কাজ করল। সিধুর নামে তিন ক্রোশ দূরের থানায় গিয়ে একটা নালিশ ঠুকে দিয়ে এল, আর সিধুর মেয়ের বিয়ের ঠিক সাত দিন আগে একটা চিঠি পাঠাল তার কাছে “তোমার কন্যার বিবাহের রাত্রে আমি সদলবলে উপস্থিত হইতেছি। আমাকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য প্রস্তুত থাকিও…” ইত্যাদি।
চিঠি পেয়ে সিধু বলল, “ফুঃ।”
তারপর সেও গিয়ে তিন ক্রোশ দূরের থানায় দারোগাবাবুকে মুরগি আর মাছ ভেট দিয়ে মেয়ের বিয়েতে নেমন্তন্ন করে এসে দাওয়ায় বসে ফিক ফিক করে হাসতে আর তামাক খেতে লাগল।
সিধুর মেয়ের বিয়েতে আমাদেরও নেমন্তন্ন ছিল, ছোটোকাকা সমেত আমরা সব ঝেটিয়ে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি, হালুম মিঞা ডাকাতি করতে আসবে শুনে যাদের নেমন্তন্ন হয়নি তারাও সব এসেছে গঞ্জ সাফ করে। বিয়েবাড়ি গিসগিস করছে লোকে। দারোগাবাবুও এসে গেছেন। সিধু তাঁকে বিবাহ বাসরের মাঝখানে বরাসনে বসিয়ে দিয়েছে। আর বর তার পাশে একটা মোড়ায় বসে নিজের হাতে হাতপাখার বাতাস খেতে খেতে ঘামছে।
তখনকার নিমন্ত্রণে চার পাঁচ রকমের ডাল খাওয়ান হতো, তারপর মাছ মাংস, দৈ মিষ্টি বা পায়েস দেওয়া হতো। আমরা সবে তিন নম্বর ডাল খেয়ে চার নম্বর ডালের জন্য তৈরি হচ্ছি এমন সময়ে উত্তরের মাঠ থেকে “রে রে” চিৎকার উঠল আর মশাল দেখা গেল। পাত ছেড়ে আমরা সব ডাকাতি দেখতে দৌড়ে গেলাম।
কী করুণ দৃশ্য! ষাট সত্তরজন সাকরেদ নিয়ে হালিম এসে গেছে। সকলের হাতেই বিশাল লাঠি, বল্লম, দা, টাঙ্গি। কপালে সিঁদুরের টিপ। খালি গা, মালকোচা করে ধুতি পরা। কিন্তু সব কজনই বুড়োসড়ো মানুষ। এতদূর জোর পায়ে এসে আর হাল্লাচিল্লা করে সকলেরই দম ফুরিয়ে গেছে। হালিমের হাঁপের টান উঠেছে, তাই সিধু তাকে ধরাধরি করে নিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসাল। কয়েকজন ডাকাত উবু হয়ে বসে কাশতে কাশতে বুকের শ্লেষ্ম তুলছে। একজনকে দেখলাম, হাতের ভারী কুড়ুলটা আর বইতে না পেরে একজন বরযাত্রীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজের ভেরে যাওয়া হাতটাকে ঝেড়েঝুড়ে ঠিকঠাক করে নিচ্ছে।
সিধু অনেকক্ষণ হালিমের বুক মালিশ করে দেওয়ার পর হালিমের হাঁপের টানটা কমল। তখন হাতের খাঁড়াটা তুলে নিয়ে বলল, “এবার কাজের কথা হোক।”
সিধু হাতজোড় করে বলল, “তোমার মান মর্যাদা ভুলে যাইনি হে। এই নাও সিন্দুকের চাবি, দরজা টরজা সব খোলা আছে। চলে যাও ভিতর বাড়িতে।”
তো তাই হলো। হুঙ্কার দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল হালিম, সঙ্গে সঙ্গে তার দলবলও হুঙ্কার দিল। অবশ্য হুঙ্কারের সঙ্গে-সঙ্গেই খক্ খক্ করে কাশিও শুরু হয়ে গেল। কিন্তু বেশ দাপটের সঙ্গেই হালিম ভিতরে ঢুকে লুটপাট করতে লাগল। নিজের বাড়ির যে সব জিনিস চুরি গিয়েছিল সে সবই উদ্ধার করল হালিম। সিধু আগাগোড়া সঙ্গে রইল হাতজোড় করে। হালিম কোনো জিনিস নিতে ভুল করলে সিধু আবার সেটা দেখিয়ে দেয়, “ঐ কাঁসার বাটিটা নিলে না। বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে নাকি, এ দেয়ালঘড়িটা যে তোমার, চিনতে পারছো না?”
এইভাবে ডাকাতি নির্বিঘ্নে এবং সাফল্যের সঙ্গে শেষ হলো। সারাক্ষণ দারোগাবাবু পা ছড়িয়ে বসে তামাক টানলেন। সবাই তার হাফপ্যান্টের নীচে বিশাল মোটা পা, মোটা বেল্ট আর ক্রসবেল্টে বেঁধে-রাখা প্রকাণ্ড উঁড়ি এবং চোমড়ানো গোঁফের খুব তারিফ করতে লাগল। তিনি কাউকে গ্রাহ্য করলেন না। বর বেচারা নিজেকে বাতাস করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বসে ঢুলছে। বরযাত্রী সমেত সবাই ডাকাতি দেখছে ঘুরে ঘুরে।
ব্যাপারটা শেষ হলে হালিম আর সিধু এসে দারোগাবাবুর সামনে করজোড়ে দাঁড়াল। দারোগাবাবু হুঙ্কার দিলেন, “ঘটনাটা কি হলো বুঝিয়ে বলো। এই বুড়ো বয়সে চুরি ডাকাতি করতে যাস, একদিন মরবি।”
সিধু কাঁচুমাচু হয়ে বলে, “বড়বাবু, চুরি কি আর নিজের ইচ্ছায় করতে গেলাম! বৌয়ের কাছে ইজ্জৎ থাকে না, সে-ই ঠেলেঠুলে পাঠায়।”
হালিমও বলল, “আমারও ঐ কথা।”
দারোগাবাবু হাতের নল ফেলে খুব হাসলেন। তার হাসিরও সবাই প্রশংসা করল। তারপর বারান্দায় ঠাই করে হালিমের দলকে খেতে বসানো হলো। হালিমের অবস্থা ভালো, কিন্তু তার সাকরেদরা সবাই হাঘরে। ডাল আর বেগুনভাজা দিয়েই তারা পাত লোপাট করতে লাগল।
