একদিন হলো কী, হাত মকশো করতে নব তার ছেলেকে সুদখোর অক্ষয় হাজরার বাড়ি চুরি করতে পাঠাল। পটাশ গেল বটে, কিন্তু চোরের যা যা করতে নেই তার সবকিছুই করতে লাগল। হাজরার চারটে কুকুরই তাকে চেনে, সুতরাং তেড়ে এল না। দু’একবার ভুক-ভুক করে চুপ মেরে গেল। পটাশের সেটা পছন্দ হলো না। ঢিল মেরে মেরে সেগুলোকে খেপিয়ে দিয়ে শোরগোল তুলে ফেলল সে। তারপর দরজা ভাঙতে এমন সব বিকট শব্দ তুলল, যাতে মড়া অবধি উঠে বসে। তাতেও খুশি না হয়ে গুনগুন করে গান গাইতে লাগল।
অক্ষয় হাজরা সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকে। ঘরে নগদ টাকা, সোনাদানা তো কম নেই। জেগে গিয়ে সে হেঁকে উঠল, “কে, কে রে?”
“আমি পটাশ।”
“পটাশ? তা কী মনে করে? এই রাত-বিরেতে আমি দোর খুলতে পারব না। বাধা দিতে এসেছিস তো! জানালা দিয়ে দে। এই হাত বাড়াচ্ছি।”
“হাত বাড়াতে হবে না। আমি দরজা ভেঙে ফেলেছি।”
“ভেঙে ফেলেছিস মানে? করছিসটা কী বল তো?”
“আজ্ঞে চুরি করছি!”
“চুরি করছিস! ইয়ার্কি হচ্ছে, আঁ? এভাবে কেউ চুরি করে? বেরো, বেরো বলছি।”
পরদিন অক্ষয় হাজরা এসে নবকে সব বৃত্তান্ত জানিয়ে বলল, “ও কেমনধারা ছেলে তোর? চুরি তো তুইও করতিস, কখনও তো সাড়াশব্দ করিসনি, আস্পদ্দাও দেখাসনি। আর তোর ছেলের আস্পদ্দা দ্যাখ। গেরস্থ জিজ্ঞেস করছে কি করছিস, আর বুক ফুলিয়ে চোর বলছে, চুরি করছি। তার ওপর আবার গুনগুন করে গানও গাইছিল। দিনটি কী পড়ল বল তো নব!”
নব সেদিন পটাশকে জুতোপেটা করল খুব। কিন্তু পেটাতে পেটাতেই নব বুঝতে পারছিল, পটাশকে দিয়ে হবে না। বাপ-দাদার বিদ্যে এর হাতেই নষ্ট হবে।
পটাশ নির্বিকার। খায়-দায়, ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে বাপের সঙ্গে শাগরেদি করতে বেরোয় বটে কিন্তু কাজের চেয়ে অকাজই করে বেশি। কখনো দুম করে হাত থেকে তার সিঁদকাঠি পড়ে যায়। একদিন সাপ সাপ’ বলে চেঁচিয়ে উঠে কেলেঙ্কারি করল। আর একদিন একজনের ঘরে ঢুকে নব যখন সিন্দুক বাক্স আলমারি খুলে ফেলছে; তখন পটাশ এক ফাঁকা বিছানা দেখতে পেয়ে সোজা গিয়ে তার ওপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমন্ত মানুষজনের মধ্যে যে পটাশও থাকতে পারে, তা নব আন্দাজ করতে পারেনি। তাই ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে একাই ফিরে এসে ভাবতে বসল। সকালবেলা হাই তুলতে তুলতে পটাশ ফিরে এলে তাকে একখানা চড় কষিয়ে বলল, “কোথায় ছিলি?”
“ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”
“পাজি নচ্ছার, ঘুমিয়ে পড়লি চোরের ছেলে হয়ে?”
“তা কী করব? ঘুম পেয়ে গেল যে বেজায়।”
“তোকে ওরা ঠেঙায়নি?” ‘না। সব বলে দিলাম যে।”
“বললি! কী বললি?”
“বললাম বাবার সঙ্গে চুরি করতে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বাবার নাম নব চোর। তখন বসিয়ে দুধ চিড়ে ফলার করাল।”
“ফলার করাল?”
“করাবে না? অত বড় চুরির হদিস দিয়ে দিলাম। তারা সব দল বেঁধে লাঠিসোটা নিয়ে আসছে।”
নব মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।
সেইদিনই নব তার বাড়ি থেকে পটাশকে তাড়িয়ে দিল। সবাইকে জানিয়ে দিল, “ওকে ত্যাজ্যপুত্তর করলাম।”
পটাশ কোথায় গেল তার খোঁজ আর কেউ রাখল না।
এদিকে নব ধীরে ধীরে বুড়ো হতে লাগল। দাঁত পড়ল, চুল পাকল, শরীরের জোর বল চোখের দৃষ্টি সবই কমতে লাগল, বুদ্ধি একটু ঘোলাটে হলো। বেপরোয়া ভাবখানাও তেমন রইল না। পৈতৃক বৃত্তি বজায় রাখা ভারী শক্ত হয়ে উঠল। আগে প্রতি রাতে চুরি করতে বেরোত, আজকাল আর তা পেরে ওঠে না। ফলে সে সঞ্চয়ে মন দিল। একটু-আধটু সুদের কারবার করতে শুরু করল। তাতে আয় মন্দ হলো না। স্বভাবটা ভারী কৃপণের মতো হয়ে গেল তার।
ওদিকে বাপের তাড়া খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পটাশ পড়ল অথৈ জলে! চুরি ছাড়া তার বাবা তাকে আর কিছুই শেখাইনি বলে কাজ কর্মেরও যোগাড় হলো না। না খেয়ে চেহারা পাকিয়ে যেতে লাগল। এক বাড়িতে চাকরের কাজ পেয়েছিল কিছু দিন। বাসন মাজত, জল তুলত, ঝটপাট দিত। বেশ ছিল। একদিন হঠাৎ মাঝরাত্রে যেন নিশির ডাক শুনে উঠে পড়ল। তারপর ভারী অবাক হয়ে দেখল তার দুটো হাত আপনা থেকেই বাক্স প্যাটরা হাতড়াচ্ছে।
এই কাণ্ড দেখে পটাশ এমন আতঙ্কিত হয়ে পড়ল যে, তার “চোর! চোর!” বলে চেঁচিয়ে উঠতে ইচ্ছে হয়েছিল। ভাগ্যিস চেঁচায়নি। তবে সে অবাক হয়ে দেখল, বিনা আয়াসেই সে তালাচাবি খুলে ফেলছে এবং নিঃশব্দে জিনিসপত্র বের করছে। বাপ-দাদার স্বভাব যাবে কোথায়? রক্তেই বিজবিজ করছে যে!
পটাশ পালাল। আবার আর-এক বাড়িতে কাজ নিল। কিছুদিন পর সেখানেও সেই কাণ্ড। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পটাশ বুঝল, এটা থেকে তার আর নিস্তার নেই। বাপ নব তাকে চুরিতে নামাতে পারেনি বটে, কিন্তু তার ভিতরে একটা চোরকে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এতকাল সেটা ঘুমিয়ে ছিল, এখন তার ঘুম ভেঙেছে।
তা পটাশ সেয়ানা চোর। এক জায়গায় বেশি দিন থাকে না। ঘন ঘন এলাকা বদলায়। চুরির ধরনও সে পালটে ফেলে। পয়সাকড়ি সোনাদানা যা পায় উড়িয়ে দেয়। চুরি তো শুধু তার রোজগার নয়, একটা নেশাও।
একদিন রাত্রিবেলা একটা গাঁয়ে ঢুকল পটাশ। বেশ সম্পন্ন গ্রাম। অনেক বাড়িঘর। ঘরবাড়ির চেহারা দেখেই তার অভ্যস্ত চোখ বুঝতে পারে, কোন্ বাড়িতে জিনিসপত্র আছে।
বেছে বেছে একাট বাড়ি তার পছন্দ হলো। বাড়ি তো নয়, যেন দুর্গ। মোটা গরাদ, পুরু মজবুত একপাটা কাঠের পাল্লা দেওয়া জানালা কপাট, চারধারে উঁচু পাঁচিল। পাহারাদার কুকুর। দেখে খুশিই হলো পটাশ। যেখানে চুরি করা শক্ত, সেখানেই চুরির আনন্দ।
