তখনকার মফস্বল শহরের নিয়ম ছিল বাইরে থেকে কেউ এরকম খেলাটেলা দেখাতে এলে তাকে কিংবা তাঁর দলকে বিভিন্ন বাসায় সবাই আশ্রয় দিতেন। প্রফেসর ভট্টাচার্য আমার মামারবাড়িতে উঠেছিলেন। রাতে খেতে বসে দাদামশাই তাকে বললেন, “আপনার খেলা গণপতির চেয়েও ভাল। অতি আশ্চর্য খেলা।”
ভট্টাচার্যও বললেন, “হ্যাঁ, অতি আশ্চর্য খেলা। আমিও এরকম আর দেখিনি!”
দাদামশাই অবাক হয়ে বলেন, “সে কী! এ তো আপনিই দেখালেন!”
ভট্টাচার্য আমতা আমতা করে বললেন, “তা বটে। আমিই তো দেখালাম! আশ্চর্য!”
তাকে খুবই বিস্মিত মনে হচ্ছিল।
দাদামশাইয়ের বাবা সেবার বেড়াতে এলেন দোমোহানীতে। বাসায় পা দিয়েই বললেন, “তোদের ঘরদোরে একটা আঁশটে গন্ধ কেন রে?”
সবাই বলল, “আঁশটে গন্ধ! কৈ, আমরা তো পাচ্ছি না।”
দাদামশাইয়ের বাবা ধার্মিক মানুষ, খুব পণ্ডিত লোক, মাথা নেড়ে বললেন, “আলবাৎ আঁশটে গন্ধ। শুধু তোদের বাসাতেই নয়, স্টেশনে নেমেও গন্ধটা পেয়েছিলাম। পুরো এলাকাতেই যেন আঁশটে-আঁশটে গন্ধ একটা।”
কমলা দাদামশাইয়ের বাবাকে দেখেই গা ঢাকা দিয়েছিল, অনেক ডাকাডাকিতেও সামনে এলো না। দিদিমার তখন ভারী মুশকিল। একা হাতে সব করতে কম্মাতে হচ্ছে। দাদামশাইয়ের বাবা সব দেখে শুনে খুব গম্ভীর হয়ে বললেন, “এসব ভাল কথা নয়। গন্ধটা খুব সন্দেহজনক।”
সেদিনই বিকেলে স্টেশনমাস্টার হরেন সমাদ্দারের মা এসে দিদিমাকে আড়ালে ডেকে বললেন, “কমলা আমাদের বাড়িতে গিয়ে বসে আছে। তা বলি বাছা, তোমার শ্বশুর ধার্মিক লোক, সে ভাল। কিন্তু উনি যদি জপতপ বেশি করেন, ঠাকুরদেবতার নাম ধরে ডাকাডাকি করেন, তাহলে কমলা এ-বাড়িতে থাকে কী করে?”
দিদিমা অবাক হয়ে বলেন, “এসব কী কথা বলছেন মাসীমা? আমার শশুর জপতপ করলে কমলার অসুবিধে কী?”
সমাদ্দারের মা তখন দিদিমার থুতনি নেড়ে দিয়ে বললেন, “ও হরি, তুমি বুঝি জানো না? তাই বলি বাছা, দোমোহানীর সবাই জানে যে, এ হচ্ছে ঐ দলের রাজত্ব। ঘরে ঘরে ওরাই সব ঝি-চাকর খাটছে। বাইরে থেকে চেহারা দেখে কিছু বুঝবে না, তবে ওরা হচ্ছে সেই তারা।”
“কারা?” দিদিমা তবু অবাক।
“বুঝবে বাপু, রোসো।” বলে সমাদ্দারের মা চলে গেলেন।
তা কথাটা মিথ্যে নয়। দোমোহানীতে তখন ঝি-চাকর কিংবা কাজের লোকের বড় অভাব। ডুয়ার্সের ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, মশা আর বাঘের ভয়ে কোনো লোক সেখানে যেতে চায় না। যাদের না গিয়ে উপায় নেই তারাই যায়। আর গিয়েই পালাই-পালাই করে। তবু ঠিক দেখা যেত, কারো বাসায় ঝি-চাকর বা কাজের লোকের অভাব হলেই ঠিক লোক জুটে যেত। স্টেশনমাস্টার সমাদ্দারের ঘরে একবার দাদামশাই বসে গল্প করছিলেন। সমাদ্দার একটা চিঠি লিখছিলেন, সেটা শেষ করেই ডাকলেন, “ওরে, কে আছিস?” বলামাত্র একটা ছোকরামতো লোক এসে হাজির। সমাদ্দার তার হাতে চিঠিটা দিয়ে বললেন, “যা, এটা ডাকে দিয়ে আয়।” দাদামশাই তখন জিজ্ঞেস করলেন, “লোকটাকে নতুন রেখেছেন নাকি? সমাদ্দার মাথা নেড়ে বলেন, “না না, ফাঁইফরমাশ খেটে দিয়ে যায় আর কি। খুব ভাল ওরা ডাকলেই আসে। লোকটোক নয় ওরা ওরাই।”
তো তাই। মামাদের বাড়িতে প্রাইভেট পড়াতেন ধর্মদাস নামে একজন বেঁটে আর ফর্সা ভদ্রলোক। তিনি থিয়েটারে মেয়ে সেজে এমন মিনি গলায় মেয়েলী পার্ট করতেন যে, বোঝাই যেত না তিনি মেয়ে না ছেলে। সেবার সিরাজদ্দৌলা নাটকে তিনি লুঙ্কা। গিরীশ ঘোষের নাটক। কিন্তু নাটকের দিনই তার ম্যালেরিয়া চাগিয়ে উঠল। লেপচাপ হয়ে কোঁ-কোঁ করছেন। নাটক প্রায় শিকেয় ওঠে। কিন্তু ঠিক দেখা গেল, নাটকের সময়ে লুফার অভাব হয়নি। একেবারে ধর্মদাস মাস্টারমশাই যেন গোঁফ কামিয়ে আগাগোড়া নিখুঁত অভিনয় করে গেলেন। কেউ কিছু টের পেল না। কিন্তু ভিতরকার কয়েকজন ঠিকই জানত, যে, সেদিন ধর্মদাস মাস্টারমশাই স্টেজে নামেননি। নাটকের শেষে সমাদ্দার দাদামশাইয়ের সঙ্গে ফিরে আসছিলেন, বললেন, “দেখলেন, কেমন কার্যোদ্ধার হয়ে গেল, একটু খোনাসুরও কেউ টের পায়নি।
দাদামশাই তখন চেপে ধরলেন সমাদ্দারকে “মশাই, রহস্যটা কী একটু খুলে বলবেন?”
সমাদ্দার হেসে শতখান হয়ে বললেন, “সবই তো বোঝেন মশাই। একটা নীতিকথা বলে রাখি, সদ্ভাব রাখলে সকলের কাছ থেকেই কাজ পাওয়া যায়। কথাটা খেয়াল রাখবেন।”
মামাদের মধ্যে যারা একটু বড়, তারা বাইরে খেলে বেড়াত। মা আর বড়মাসী তখন কিছু বড় হয়েছে। অন্য মামা-মাসীরা নাবালক নাবালিকা। মার বড় লুডো খেলার নেশা ছিল। তো মা আর মাসী রোজ দুপুরে লুডো পেড়ে বসত, তারপর ডাক দিত, “আয় রে। অমনি টুক করে কোথা থেকে মায়ের বয়সীই দুটো মেয়ে হাসিমুখে লুডো খেলতে বসে যেত। মামাদের মধ্যে যারা বড় হয়েছে সেই বড় আর মেজো মামা যেত বল খেলতে। দুটো পার্টিতে প্রায়ই ছেলে কম পড়ত। ছোটো জায়গা তো, বেশি লোকজন ছিল না। কিন্তু কম পড়লেই মামারা ডাক দিত, “কে খেলবি আয়”। অমনি চার-পাঁচজন এসে হাজির হতো, মামাদের বয়সীই সব ছেলে। খুব খেলা জমিয়ে দিত।
এই খেলা নিয়েই আর একটা কাণ্ড হলো একবার। দোমোহানীর ফুটবল টিমের সঙ্গে এক চা-বাগানের টিমের ম্যাচ। চা-বাগান থেকে সাঁওতাল আর আদিবাসী দুর্দান্ত চেহারার খেলোয়াড় সব এসেছে। দোমোহানীর বাঙালী টিম জুত করতে পারছে না, হঠাৎ দোমোহানীর টিম খুব ভাল খেলা শুরু করল, দুটো গোল শোধ দিয়ে আরো একখানা দিয়েছে। এমন সময়ে চা-বাগান টিমের ক্যাপ্টেন খেলা থামিয়ে রেফারীকে বলল, “ওরা বারোজন খেলছে।” রেফারী গুনে দেখলেন, না, এগারোজনই। ফের খেলা শুরু হতে একটু পরে রেফারীই খেলা থামিয়ে দোমোহানীর ক্যাপ্টেনকে ডেকে বললেন, “তোমাদের টিমে চার পাঁচজন একস্ট্রা লোক খেলছে!”
