কদম্ববাবু চোখ পিটপিট করতে লাগলেন।
লোকটা একটু ফিচকে হেসে বলল, হল কী শ্যামবাবুর অ্যাঁ। এ বাড়ি আপনার অচেনা? রুপোমহলে দাঁড়িয়ে থাকলেই কি চলবে? কর্তাবাবু যে সোনামহল্লায় আপনার জন্য বসে থেকে থেকে হেদিয়ে পড়লেন। আসুন তাড়াতাড়ি।
‘সোনামহল্লা’! কদম্ববাবুর বেশ ঘাম হতে লাগল শুনে। রুপোমহলেই যে লাখো লাখো টাকা ছড়িয়ে আছে চারধারে।
কিংখাবের একটা পরদা সরিয়ে লোকটা বলল, যান, ঢুকে পড়ুন।
কদম্ববাবু কাঁপতে কাঁপতে সোনামহল্লায় ঢুকলেন। কিন্তু ঢুকেই যে কেন মূর্ছা গেলেন না সেটাই অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন তিনি।
সোনামহল্লার সব কিছুই সোনার। এমনকি পায়ের তলার কার্পেটটায় অবধি সোনার সুতোর কাজ। সোনার পায়াওয়ালা টেবিল, সোনার পাতে মোড়া চেয়ার, সোনার ফুলদানি, সোনার ঝাড়লণ্ঠন। এত সোনা যে পৃথিবীতে আছে তা-ই জানা ছিল না কদম্ববাবুর।
তিনি এমন হাঁ হয়ে গেলেন যে, ঘরের মাঝে একটা বিরাট সোনার টেবিলের ওপাশে যে গৌরবর্ণ পুরুষটি একটা সোনায় বাঁধানো আরাম কেদারায় বসে ছিলেন তাঁকে নজরেই পড়েনি তার।
হঠাৎ একটা গমগমে গলা কানে এল, এই যে শ্যামকান্ত এসো।
কদম্ববাবু ভীষণ চমকে উঠলেন।
চমকানোর আরও ছিল। কর্তাবাবুর সামনে যে দাবার ছকটি পাতা রয়েছে সেটা যে শুধু সোনা দিয়ে তৈরি তা-ই নয়, প্রত্যেকটি খোপে আবার হিরে, মুক্তো, চুনী আর পান্না বসানো। একধারে সোনার খুঁটি, অন্যধারে রুপোর।
প্রত্যেকটি খুঁটির মাথায় আবার এক কুচি করে হিরে বসানো।
বোসো, বোসো হে শ্যামকান্ত। আর সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। মনে আছে তো আজ আমাদের বাজি রেখে খেলা। এই হল আমার বাজি।
এই বলে কর্তাবাবু একটা নীল ভেলভেটে মোড়া বাক্সর ঢাকনা খুলে টেবিলের একপাশে রাখলেন।
কদম্ববাবু দেখলেন, বাক্সের মধ্যে মস্ত একটা মুক্তো। মুক্তো যে এত বড় হয় তা জানা ছিল না তার।
তুমি কি বাজি রাখবে শ্যামবাবু?
কদম্ববাবু আমতা-আমতা করে বললেন, আমি গরিব মানুষ, কী আর বাজি রাখব বলুন।
কর্তাবাবু ঘর ঝাঁপিয়ে হাঃহাঃ অট্টহাসি হেসে বললেন, গরিবই বটে। বছরে যার কুড়ি লাখ টাকা আয় সে আবার কেমন গরিব?
আজ্ঞে আপনার তুলনায় আমি আর কী বলুন!
কর্তাবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, সে কথাটা সত্যি শ্যামবাবু। আমার মেলা টাকা। এত টাকা যে আজকাল আমার টাকার ওপর ঘেন্না হয়। খুব ঘেন্না হয়।
টাকার ওপর ঘেন্না! কদম্ববাবুর মুখটা হাঁ-হাঁ করে উঠল।
কর্তাবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, আজ সকালে মনটা খারাপ ছিল। কিছুতেই ভালো হচ্ছিল না। কী করলুম জানো? দশ লক্ষ টাকার নোট
আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে দিলুম।
অ্যাঁ!
শুধু কি তাই? ছাদে উঠে মোহর ছুঁড়ে কাক তাড়ালুম। তাতে একটু মনটা ভালো হল। তারপর জুড়িগাড়ি করে হাওয়া খেতে বেরিয়ে এক হাজারটা হিরে আর মুক্তো রাস্তায় ছড়িয়ে দিয়ে এলুম।
কদম্ববাবু দাঁতে দাঁত চেপে কোনওরকমে নিজেকে সামাল দিলেন। লোকটা বলে কী!
কর্তাবাবু বললেন, এসো, চাল দাও। তুমি কী বাজি রাখবে বললে?
কদম্ববাবু মুখটা কঁচুমাচু করে ভাবতে লাগলেন। কর্তাবাবু নিজেই বললেন, টাকা-পয়সা হিরে-জহরত তো আমার দরকার নেই। তুমি বরং তোমার পকেটের ওই কলমটা বাজি ধরো।
কলম! কদম্ববাবু শিউরে উঠলেন! মাত্র আট আনায় ফুটপাথ থেকে কেনা। তবু কদম্ববাবু উপায়ান্তর না পেয়ে কলমটাই রাখলেন মুক্তোর উলটোদিকে।
কিন্তু চাল? দাবার যে কিছুই জানেন না কদম্ববাবু।
চোখ বুজে একটা খুঁটি এগিয়ে দিলেন কদম্ববাবু।
কর্তাবাবু বললেন, সাবাস!
কদম্ববাবু চোখ মেলে একটা শ্বাস ছাড়লেন। তারপর বুদ্ধি করে কদম্ববাবুর দেখাদেখি কয়েকটা চাল দিয়ে ফেললেন।
হঠাৎ কর্তাবাবু সবিস্ময়ে বলে উঠলেন, এ কী! তুমি যে কিস্তি দিয়ে বসেছ আমাকে। অ্যাঁ! এ কী কাণ্ড! আমি যে মাত!
তারপরেই কর্তাবাবু হঠাৎ ঘর কাঁপয়ে হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ করে অট্টহাসি হাসতে লাগলেন। সে এমন হাসি যে কদম্ববাবুর মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলেন। ভয়ে চোখও বুজে ফেললেন।
যখন চোখ মেললেন তখন কদম্ববাবু হাঁ।
কোথায় সোনার ঘর? কোথায় রুপোর ঘর? কোথায় সেই ঝাড়বাতি আর দেয়ালগিরি? কোথায় আসবাবপত্র? এ যে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার ভাঙা সোঁদা একটা পোড়ো বাড়ির মধ্যে বসে আছেন তিনি। চারদিকে চুন-বালি খসে ভঁই হয়ে আছে। চতুর্দিকে মাকড়সার জাল। ইঁদুর দৌড়চ্ছে।
কদম্ববাবু আতঙ্কে একটা চিৎকার দিলেন। তারপর ছুটতে লাগলেন।
সেই বাড়িরই এমন দশা কে বিশ্বাস করবে? মেঝেয় পাথর সব উঠে গেছে, সিঁড়ি ভেঙে ঝুলে আছে, দরদালানের দেওয়াল ভেঙে পড়েছে।
কদম্ববাবু পড়ি কি মরি করে ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে কোনওরকমে বাইরের দরজায় পৌঁছলেন। দরজাটা অক্ষত আছে। কদম্ববাবু দরজাটার কড়া ধরে হ্যাঁচকা টান মারতে সেটি খুলে গেল।
কদম্ববাবু রাস্তায় নেমে ছুটতে লাগলেন। বৃষ্টি পড়ছে, তার ছাতা নেই, পায়ে জুতোও নেই। ভাঙা পোড়ো বাড়ির মধ্যে কোথায় পড়ে আছে।
কদম্ববাবু হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর ভাবতে লাগলেন সত্যিই তো টাকা বাঁচিয়ে হবেটা কী? শেষে তো ওই ভূতের বাড়ি।
বুক ফুলিয়ে কদম্ববাবু একটা দোকানে ঢুকে একটা বাহারি ছাতা কিনে ফেললেন। জুতোর দোকানে ঢুকে কিনলেন নতুন একজোড়া জুতো।
