তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা
তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা,
এ সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা।
যেথা আমি যাই নাকো তুমি প্রকাশিত থাকো,
আকুল নয়নজলে ঢালো গো কিরণধারা ॥
তব মুখ সদা মনে জাগিতেছে সংগোপনে,
তিলেক অন্তর হলে না হেরি কূল-কিনারা।
কখনো বিপথে যদি ভ্রমিতে চাহে এ হৃদি
অমনি ও মুখ হেরি শরমে সে হয় সারা।
তোমায় গান শোনাব তাই
তোমায় গান শোনাব তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখ
ওগো ঘুম-ভাঙানিয়া
বুকে চমক দিয়ে তাই তো ডাক’
ওগো দুখজাগানিয়া ॥
এল আঁধার ঘিরে, পাখি এল নীড়ে,
তরী এল তীরে
শুধু আমার হিয়া বিরাম পায় নাকো
ওগো দুখজাগানিয়া ॥
আমার কাজের মাঝে মাঝে
কান্নাহাসির দোলা তুমি থামতে দিলে না যে।
আমার পরশ ক’রে প্রাণ সুধায় ভ’রে
তুমি যাও যে সরে–
বুঝি আমার ব্যথার আড়ালেতে দাঁড়িয়ে থাক
ওগো দুখজাগানিয়া ॥
তোর প্রাণের রস তো শুকিয়ে গেল ওরে
তোর প্রাণের রস তো শুকিয়ে গেল ওরে।
তবে মরণরসে নে পেয়ালা ভরে॥
সে যে চিতার আগুন গালিয়ে ঢালা, সব জ্বলনের মেটায় জ্বালা–
সব শূন্যকে সে অট্টহেসে দেয় যে রঙিন করে॥
তোর সূর্য ছিল গহন মেঘের মাঝে,
তোর দিন মরেছে অকাজেরই কাজে।
তবে আসুক-না সেই তিমিররাতি লুপ্তিনেশার চরম সাখি–
তোর ক্লান্ত আঁখি দিক সে ঢাকি দিক্-ভোলাবার ঘোরে॥
তোরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার হরিণ চাই
তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই।
মনোহরণ চপলচরণ সোনার হরিণ চাই॥
সে-যে চমকে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায়, যায় না তারে বাঁধা।
সে-যে নাগাল পেলে পালায় ঠেলে, লাগায় চোখে ধাঁদা।
আমি ছুটব পিছে মিছে মিছে পাই বা নাহি পাই–
আামি আপন-মনে মাঠে বনে উধাও হয়ে ধাই॥
তোরা পাবার জিনিস হাতে কিনিস, রাখিস ঘরে ভরে–
যারে যায় না পাওয়া তারি হাওয়া লাগল কেন মোরে।
আমার যা ছিল তা গেল ঘুচে যা নেই তার ঝোঁকে–
আমার ফুরোয় পুঁজি, ভাবিস, বুঝি মরি তারি শোকে?
আমি আছি সুখে হাস্যমুখে, দুঃখ আমার নাই।
আমি আপন-মনে মাঠে বনে উধাও হয়ে ধাই॥
দিন পরে যায় দিন
দিন পরে যায় দিন, বসি পথপাশে
গান পরে গাই গান বসন্তবাতাসে॥
ফুরাতে চায় না বেলা, তাই সুর গেঁথে খেলা—
রাগিণীর মরীচিকা স্বপ্নের আভাসে॥
দিন পরে যায় দিন, নাই তব দেখা।
গান পরে গাই গান, রই বসে একা।
সুর থেমে যায় পাছে তাই নাহি আস কাছে—
ভালোবাসা ব্যথা দেয় যারে ভালোবাসে॥
দিন পরে যায় দিন বসি পথপাশে
দিন পরে যায় দিন, বসি পথপাশে
গান পরে গাই গান বসন্তবাতাসে॥
ফুরাতে চায় না বেলা, তাই সুর গেঁথে খেলা–
রাগিণীর মরীচিকা স্বপ্নের আভাসে॥
দিন পরে যায় দিন, নাই তব দেখা।
গান পরে গাই গান, রই বসে একা।
সুর থেমে যায় পাছে তাই নাহি আস কাছে–
ভালোবাসা ব্যথা দেয় যারে ভালোবাসে॥
দিনশেষের রাঙা মুকুল জাগল চিতে
দিনশেষের রাঙা মুকুল জাগল চিতে।
সঙ্গোপনে ফুটবে প্রেমের মঞ্জরীতে॥
মন্দবায়ে অন্ধকারে দুলবে তোমার পথের ধারে,
গন্ধ তাহার লাগবে তোমার আগমনীতে–
ফুটবে যখন মুকুল প্রেমের মঞ্জরীতে–
রাত যেন না বৃথা কাটে প্রিয়তম হে–
এসো এসো প্রাণে মম, গানে মম হে।
এসো নিবিড় মিলনক্ষণে রজনীগন্ধার কাননে,
স্বপন হয়ে এসো আমার নিশীথিনীতে–
ফুটবে যখন মুকুল প্রেমের মঞ্জরীতে॥
দিনান্তবেলায় শেষের ফসল নিলেম তরী-‘পরে
দিনান্তবেলায় শেষের ফসল নিলেম তরী-‘পরে,
এ পারে কৃষি হল সারা,
যাব ও পারের ঘাটে॥
হংসবলাকা উড়ে যায়
দূরের তীরে, তারার আলোয়,
তারি ডানার ধ্বনি বাজে মোর অন্তরে॥
ভাঁটার নদী ধায় সাগর-পানে কলতানে,
ভাবনা মোর ভেসে যায় তারি টানে।
যা-কিছু নিয়ে চলি শেষ সঞ্চয়
সুখ নয় সে, দঃখ সে নয়, নয় সে কামনা–
শুনি শুধু মাঝির গান আর দাঁড়ের ধ্বনি তাহার স্বরে॥
দিনের পরে দিন-যে গেল আঁধার ঘরে
দিনের পরে দিন-যে গেল আঁধার ঘরে,
তোমার আসনখানি দেখে মন-যে কেমন করে।
ওগো বঁধু, ফুলের সাজি মঞ্জরীতে ভরল আজি–
ব্যথার হারে গাঁথব তারে, রাখব চরণ-‘পরে॥
পায়ের ধ্বনি গণি গণি রাতের তারা জাগে।
উত্তরীয়ের হাওয়া এসে ফুলের বনে লাগে।
ফাগুনবেলার বুকের মাঝে পথ-চাওয়া সুর কেঁদে বাজে–
প্রাণের কথা ভাষা হারায় চোখের জলে ঝরে॥
দিবস রজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি
দিবস রজনী, আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি।
তাই চমকিত মন, চকিত শ্রবণ, তৃষিত আকুল আঁখি॥
চঞ্চল হয়ে ঘুরিয়ে বেড়াই, সদা মনে হয় যদি দেখা পাই–
‘কে আসিছে’ বলে চমকিয়ে চাই কাননে ডাকিলে পাখি॥
জাগরণে তারে না দেখিতে পাই, থাকি স্বপনের আশে–
ঘুমের আড়ালে যদি ধরা দেয়, বাঁধিব স্বপনপাশে।
এত ভালোবাসি, এত যারে চাই, মনে হয় না তো সে যে কাছে নাই–
যেন এ বাসনা ব্যাকুল আবেগে, তাহারে আনিবে ডাকি॥
দিয়ে গেনু বসন্তের এই গানখানি
দিয়ে গেনু বসন্তের এই গানখানি–
বরষ ফুরায়ে যাবে, ভুলে যাবে জানি॥
তবু তো ফাল্গুনরাতে এ গানের বেদনাতে
আঁখি তব ছলোছলো, এই বহু মানি॥
চাহি না রহিতে বসে ফুরাইলে বেলা,
তখনি চলিয়া যাব শেষ হবে খেলা।
আসিবে ফাল্গুন পুন, তখন আবার শুনো
নব পথিকেরই গানে নূতনের বাণী।
দীপ নিবে গেছে মম নিশীথসমীরে
দীপ নিবে গেছে মম নিশীথসমীরে,
ধীরে ধীরে এসে তুমি যেয়ো না গো ফিরে॥
এ পথে যখন যাবে আঁধারে চিনিতে পাবে–
রজনীগন্ধার গন্ধ ভরেছে মন্দিরে॥
আমারে পড়িবে মনে কখন সে লাগি
প্রহরে প্রহরে আমি গান গেয়ে জাগি।
ভয় পাছে শেষ রাতে ঘুম আসে আঁখিপাতে,
ক্লান্ত কণ্ঠে মোর সুর ফুরায় যদি রে॥
