সব ধর্মের নৈতিকতার ভিত্তি ভয়। বহু ধর্মে বিধাতা চরম ক্রুদ্ধ ও হিংস্র; ক্রুদ্ধ ও হিংস্র হয়ে থাকা ছাড়া তার আর কোনো কােজ নেই; অবিশ্বাসীকে শাস্তি দেয়ার জন্যে তিনি ব্যগ্র, এবং বিশ্বাসীকেও সব সময় রাখেন ভীতির মধ্যে। বিশ্বাসী কোনো উন্নত নৈতিকতাবোধ দিয়ে চালিত হয় না; সে ভয়েই করে পুণ্যকাজ, এবং থাকে সম্পূর্ণ অনুগত। ভয় আর লালসা দূষিত করে সব ধরনের নৈতিকতাকে। ধর্মীয় নৈতিকতা থেকে মানবিক নৈতিকতা অনেক উন্নত। অনেকে বলে ধর্ম আছে ব’লেই সমাজ চলছে; এটা বাজে কথা: ধর্ম না থাকলে সমাজ আরো ভালোভাবে চলতো। অনেকে বলে ধর্ম মিথ্যা হ’তে পারে, কিন্তু এর উপকারিতা আছে; কেননা ধর্ম ভালোমন্দ শেখায়, মানুষকে সৎপথে চালায়। এ-যুক্তি খুবই আপত্তিকর, কেননা এটা মানুষকে যুক্তিহীন করে, আর উৎসাহিত করে ভণ্ডামোকে; বর্জন করে সত্যকে। ধর্ম যে মানুষকে ভালোমন্দ শেখায় না, সৎপথে চালায় না; তার প্রমাণ চিরকালই দেখা গেছে, এবং আজকাল খুবই বেদনাদায়কভাবে দেখা যাচ্ছে। ধর্মের নৈতিকতার সাথে মানবিক নৈতিকতার তুলনা করলে ধরা পড়ে যে ধর্মীয় নৈতিকতার মূলে নৈতিকতা নেই, রয়েছে স্বেচ্ছাচারী নির্দেশ; আর মানবিক নৈতিকতার ভিত্তি হচ্ছে কল্যাণ। মুসলমানের শুয়োর খাওয়া আর হিন্দুর গরু খাওয়া পাপী; এর মূলে কোনো নীতিবোধ নেই, এটা স্বেচ্ছাচারী নির্দেশ। ইসলামে কবি ও চিত্রকর নিষিদ্ধ; তাই আধুনিক বিশ্বের প্রায় সব কিছুই নিষিদ্ধ। ইসলামে: এ-নিষিদ্ধকরণের পেছনে কোনো নীতিবোধ কাজ করে নি, কাজ করেছে কবিতা ও চিত্র সম্পর্কে ভুল ধারণা। চুরির অপরাধে হাত কেটে ফেলা বা অবিবাহিত সঙ্গমের জন্যে পাথর ছুড়ে হত্যা নীতির দিক থেকে অত্যন্ত শোচনীয়, কিন্তু ধর্মে একেই মনে করা হয় নৈতিকতা। ধর্ম গভীর মানবিক নৈতিকতা বোঝে না, বোঝে কতকগুলো মোটা দাগের আদেশ পালনের নৈতিকতা। দস্তয়ভস্কির এক নায়ক। বলেছে তাকে যদি বলা হয় একটি শিশুকে হত্যা করা হ’লে দেশের সবাই চিরসুখে থাকবে, তাহলেও সে ওই শিশুকে হত্যা করবে না, কেননা তা তার কাছে অনৈতিক কাজ। ধর্ম। এ-ধরনের নৈতিকতা বোঝে না; মনে করে যে কুলুপ লাগায় সে নৈতিক, যে লাগায় না সে অনৈতিক। ধর্মীয় নৈতিকতা কখনো কখনো খুবই হাস্যকর। ইসলামে পবিত্র পরিচ্ছন্ন থাকাকে নৈতিক কাজ ব’লে মনে করা হয় (কিন্তু প্রকাশ্যে কুলুপ ধ’রে হাঁটাহাঁট ক’রে পা ঝাকানো পেরিয়ে যায় শ্ৰীলতার সীমা), আর খ্রিস্টধর্মে নোংরা থাকাই নৈতিকতা। খ্রিস্টীয় গির্জা স্নানের ব্যাপারটিকে আক্রমণ করেছে এজন্যে যে যা-কিছু দেহকে আকর্ষণীয় করে, তাই মানুষকে ঠেলে দেয় পাপের পথে। সৌন্দর্য, সন্তদের বিশ্বাস, পাপের উৎস; সৌন্দর্য থেকেই জন্মে কাম, কাম থেকে জন্মে মানুষের আদি ও অন্তিম পাপ। খ্রিস্টীয় চার্চ প্রশংসা করে অপরিচ্ছন্নতার, কেননা নোংরা মানুষ কাম জগায় না, কাউকে পাপিষ্ঠ করে না। সন্ত পলা বলেছেন, ‘দেহ ও বস্ত্রের পবিত্রতা বোঝায় আত্মার অপবিত্ৰতা। সন্তরা উকুনকে বলতো বিধাতার মুক্তো; উকুনখচিত থাকা ছিলো সন্ততার শংসাপত্র। কোনো কোনো ধর্মে উপাসনার আগে বিশেষ পদ্ধতিতে দেহ পরিচ্ছন্ন করার রীতি রয়েছে; তবে ওটা দেহকে পরিচ্ছন্ন করার জন্যে নয়, শয়তান তাড়ানোর জন্যে, যে-শয়তান কোথাও নেই।
ধর্মের ইতিহাস পাচ হাজার বছরের, এর মধ্যে অজস্র ধর্ম প্রচারিত হয়েছে ও বাতিল হয়ে গেছে; কিন্তু মানুষ আছে কোটি বছর আগে থেকে, টিকে থাকবে বহু কোটি বছর। পৃথিবী ধ্বংসের আগে মানুষ হয়তো অন্য কোথাও পাড়ি জমাবে; —মানুষের সম্ভবনা অনন্ত, দেবতাদের থেকে মানুষ অনেক বেশি প্রতিভাবান। পাচ হাজার বছর, তিন হাজার, দেড় হাজার বছরকে চিরকাল মনে করার কারণ নেই। মানুষ দেবতার পর দেবতা তৈরি করেছে, এবং ছেড়েছে; তাতে দেবতাদের কিছু যায় আসে নি, তারা জানেই না তারা উৎপন্ন হয়েছে, কিন্তু অনেক এসে গেছে মানুষের। ভবিষ্যৎমুখি মানুষকে বিপুল লড়াই করতে হয়েছে ধর্মের সাথে; ধর্ম না। থাকলে মানুষ আরো অনেক এগোতো। দেবতারা কখনো দেখা দেয় নি, কখনো পীড়ন করে নি মানুষকে; কিন্তু ধর্মকে চিরকালই একগোত্ৰ মানুষ ব্যবহার করেছে। অস্ত্ররূপে। ধর্মের পক্ষে যারা, তারা বিশেষ স্বার্থেই ধর্মের পক্ষে; যারা বিপক্ষে, তাদের কোরো স্বাৰ্থ নেই; তাদের স্বাৰ্থ মানুষের বিক,। আগামী দু-এক শতকের মধ্যেই মানুষ মুক্ত হবে ধর্মের কবল থেকে। কোনো ধৰ্মই মানুষের শুরু থেকে ছিলো না ও শেষ পর্যন্ত থাকবে না। ধর্মের প্রধান ক্ষতিকর দিক হচ্ছে ধর্ম বিভেদ সৃষ্টি করে; মানষকে বিভিন্ন গোত্রে ভাগ ক’রে দেয়, সৃষ্টি করে পারস্পরিক ঘৃণা, বিদ্বেষ, শত্রুতা। কোনো সুষম ধর্মও নেই, প্রতিটি ধর্ম বিভক্ত নানা শাখা ও উপশাখায়; ওই শাখা-উপশাখাগুলো ঘৃণা করে পরস্পরকে। মানুষ ধর্ম দ্বারা আক্রান্ত; এবং বিশেষ ধর্মের মানুষ আক্রান্ত ওই ধর্মের মানুষদের দ্বারা; মুসলমান আক্রান্ত মুসলমান দ্বারা, হিন্দু হিন্দু দ্বারা; তাই মুসলমানের হাত থেকে মুসলমানকে, হিন্দুর হাত থেকে হিন্দুকে বাচানো দরকার। ধর্মের অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে মানুষকে হয়ে উঠতে হবে মানুষ।
আরণ্যিক নির্বোধের ভ্রান্ত দুঃস্বপন
বহুদেবতারা আজ পরাজিত, জয়ী আজ সর্বশক্তিধর একদেবতা; এখন চলছে একদেবতার কাল। এমনকি যারা পুজো করে বহুদেবতার, তারাও মনে করে বা যখন স্রষ্টা কে নিয়ে তর্ক দেখা দেয়, তারাও নিদ্বিধায় বলে স্রষ্টা বা বিধাতা একজনই। বহুদেবতায় বিশ্বাস করা আজকাল গৌরবজনক নয়; এটা অত্যন্ত অনাধুনিক ব্যাপার, আধুনিক হচ্ছে একদেবতায় বিশ্বাস। আমি বলেছি। একদেবতা, . এটা কোনো কোনো ধর্মের বিশ্বাসীদের কাছে মনে হ’তে পারে আপত্তিকর, কারণ তারা বিশ্বাস করে তারা দেবতায় বিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করে বিধাতায়, স্রষ্টায়, একেশ্বরে, পরমসত্তায়, বা অন্য কোনো নামের স্রষ্টায়। তাদের প্রত্যেক ধর্মের স্রষ্টার রয়েছে বিশেষ নাম ধর্মের প্রবর্তকের ভাষায়। তবে বিধাতা বা ঈশ্বর, বা যে-নামই হোক তাদের স্রষ্টার, তিনি দেবতাই। এসব বিশ্বাসে বহুদেবতা পরাজিত হয়ে জয়ী হয়েছেন। একজন দেবতা। দেবতারা কি করেছেন কোনো মহাজাগতিক মহাযুদ্ধ, আর ওই মহাযুদ্ধে কি জয়ী হয়েছেন একজন দেবতা, যার শক্তির কোনো সীমা নেই? তিনি কি জয়ী হয়ে মহাজগত জুড়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন তার রাজত্ব, এবং মহাজগত জুড়ে প্রচার করেছেন তার বিজয়ীসংবাদ? তিনি কি সবাইকে বাধ্য করেছেন তাঁর প্রতি আনুগত হ’তে? না, এতে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই, এতে সব ভূমিকা মানুষের; মানুষই অজস্র দেবতাদের বর্জন ক’রে সাম্রাজ্য স্থাপন করেছে। বিশেষ একটি দেবতার। ঘটনাটি অবশ্য আধুনিক নয়, ঘটনাটি অত্যন্ত অনাধুনিক, ঘটেছিলো তিন হাজার বছর আগে। অগ্নি-উপাসক জুরথুস্ত্রীয়রাই প্রথম কল্পনা করেছিলো একদেবতা, একদেবতা কল্পনা করেছিলো ব্যাবিলনীয়রাও, এমনও হতে পারে তারা একদেবতা ধার করেছিলো অগ্নিপূজারী পারস্য থেকেই; আর প্যালেস্টাইনের ইহুদিরা প্রথম আবিষ্কার করে এক প্রচণ্ড হিংস্র প্রতিহিংসাপরায়ণ একদেবতা। হিব্রুদের একদেবতা সম্পূর্ণ মৌলিক নয়, তারা পারস্য আর ব্যাবিলন থেকে একে ধার করে, এবং ক’রে তোলে প্রচণ্ড। আরো দুটি ধর্ম গ্রহণ করে একদেবতা; তারা প্রবর্তকের ভাষায় তার নাম দেয়।
