আজ প্রথম নয়, শামারোখ বারবার আমাকে এমন সব পরিবেশে নিয়ে আসে, আমি কিছুতেই তার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারি নে। আমার ইচ্ছে করছিল, পালিয়ে চলে আসি। সেটা আরো খারাপ দেখাবে বলে চলে আসতে পারছিলাম না। এই ভদ্রলোকেরা বাংলাভাষাতেই কথাবার্তা বলছিলেন, কিন্তু আমার মনে হলো, সে ভাষা আমি বুঝিনে। সোফার কোণার দিকে লম্বাপনা ভদ্রলোকটি আমার গায়ের জামার দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করলেন, শামারোখ, এখন বুঝতে পারলাম বায়তুল মোকাররমে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কেন আমাকে দিয়ে শার্ট এবং সোয়েটার কিনিয়েছিলে। কবি সাহেবকে জামা-কাপড় গিফ্ট করার জন্যই আমার কাছ থেকে টাকা ধার করেছিলে। ভদ্রলোক কাটাকাটা কথায় বললেন, শার্ট এবং সোয়েটার দুটো কবি সাহেবের গায়ে মানিয়েছে চমৎকার। কবি সাহেব ভাগ্যবান। আজ থেকে আমরাও সবাই কবিতা লিখতে লেগে যাব । ভদ্রলোক কেমন করে হাসলেন।
ভদ্রলোকের কথাগুলো শুনে আমার সারা গায়ে যেন আগুন লেগে গেল । শামারোখ এই মানুষটার কাছ থেকে টাকা ধার করে আমার শার্ট এবং সোয়েটার কিনেছে। তারপর সেগুলো দেখাবার উদ্দেশ্যে সেই ভদ্রলোকের কাছেই আমাকে ধরে এনে হাজির করেছে। জামা-কাপড়গুলো শরীর থেকে খুলে ফেলে শামারোধের মুখের ওপর ছুঁড়ে দিতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু তার তো আর উপায় নেই। সুতরাং বসে বসে অপমানটা হজম করছিলাম।
নাদুসনুদুস টাক মাথার ভদ্রলোক এবার সিগারেট টেবিলে ঠুককে ঠুকতে বললেন, শামারোখ হোয়াই শুড ঝু ইনডাজ ইন পোয়েমস? ত্যু আর মোর দ্যান এ পোয়েট্রি। তুমি কেন কবিতা লেখার মতো অকাজে সময় নষ্ট করবে। তোমাকে নিয়েই মানুষ কবিতা লিখবে। অ্যাণ্ড মাইন্ড ইট, একবার যদি লাই দাও দলে দলে কবিরা এসে মাছির মতো তোমার চারপাশে ভ্যান ভ্যান করবে। ঢাকা শহরে কবির সংখ্যা কাকের সংখ্যার চাইতে কম নয়। শামারোখ চটে গিয়ে বলল, আবেদ য়ু আর এ ফিলথি নইসেন্স। তুমি একটা হামবাগ এবং ফিলিস্টিন। মানুষের প্রতি মিনিমাম রেসপেক্টও তোমার নেই। আবেদ নামের ভদ্রলোকটি হাসতে হাসতে বললেন, মানুষের প্রতি সব রেসপেক্ট তো তুমিই দেখিয়ে যাচ্ছ। অন্যদের আর রেসপেক্ট করার অবকাশ কোথায়? পথেঘাটে যাকে যেখানেই পাচ্ছ ধরে ধরে স্ট্রিট আৰ্চিনদের হাজির করছ। তোমার টেস্টের তারিফ না করে পারি নে। শামারোখ বলল, তুমি একটা আস্ত ব্রুট। তারপর একটা বিয়ারের খালি টিন তুলে নিয়ে ভদ্রলোকের মুখের ওপর ছুঁড়ে মারল এবং আমার হাত ধরে টানতে টানতে আমাকে ঘরের বাইরে নিয়ে এল । গোটা ব্যাপারটা আমার চোখের সামনে ছায়াবাজির মতো ঘটে গেল । গেটের কাছে যখন এসেছি, শামারোখ বলল, জাহিদ আপনি আস্ত একটা কাওয়ার্ড। এই আবেদ হারামজাদা আমাকে এবং আপনাকে এত অপমানজনক কথা বলল, আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবকিছু হজম করলেন? আপনি তার মুখে একটা ঘুষি পর্যন্ত বসিয়ে দিতে পারলেন না? আমি শামারোখের কথার কি উত্তর দেব ভেবে ঠিক করতে না পেরে তার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম।
.
১৮.
শামারোখ আমার মনে একটা ঝংকার সৃষ্টি করে দিয়েছে। তাকে আমি মনের ভেতর থেকে তাড়াতে পারছি নে। শামারোখ শুধু সুন্দরী নয়, তার মনে দয়ামায়াও আছে। আমার প্রতি এই সময়ের মধ্যে তার একটা অনুরাগ জন্মানোও বিচিত্র নয়। শামায়োখ যখন হাসে, সাদা বেজির দাঁতের মতো তার ছোট ছোট দাঁতগুলো ঝিলিক দিয়ে ওঠে। সে যখন ফুঁসে ওঠে, তার মধ্যে একটা সুন্দর অগ্নিশিখা জ্বলে উঠতে দেখি। সে যখন গান করে অথবা কবিতা পাঠ করে, পৃথিবীর সমস্ত কষ্ট, সমস্ত যন্ত্রণা আমি মূর্ত হয়ে উঠতে দেখি। বড় বড় দুটি চোখ মেলে যখন দৃষ্টিপাত করে, তার অসহায়তার ভাবটি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখন তাকে অনেক বেশি সুন্দরী দেখায়।
শামায়োখ আমার খাওয়া-দাওয়ার প্রতিও দৃষ্টি দিতে আরম্ভ করেছে। আমার দারিদ্র্য, আমার অক্ষমতা, আমার অস্তিত্বের দীনতা সবকিছু এমনভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে, তার কাছে আমি কোনো রকমের দ্বিধা এবং সংকোচ ছাড়াই নিজেকে মেলে ধরতে পারি।
আমার অনেক কিছু নেই, আমি জানি। কিন্তু শামায়োখের সঙ্গে যখন আলাপ করি, আমার নিজেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ মানুষ মনে হয়। মনে হয়, আমার মধ্যে কোনো অক্ষমতা, কোনো অপূর্ণতা নেই। তাছাড়া আরো একটা ব্যাপার আছে। এই মাস তিন-চার শামায়োখের সঙ্গে চলাফেরা করতে গিয়ে আমার ভেতরে একটা রূপান্তর ঘটে গেছে।
সেটা আমি এখন অনুভব করি। আমি ছিলাম নিতান্ত তুচ্ছ একজন আদনা মানুষ। এই রকম একজন সুন্দর মহিলা, সমাজে যার সম্পর্কে সত্য-মিথ্যে বিচিত্র ধরনের কাহিনী চালু আছে, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশার কারণে আমি চারপাশের সবার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছি। আমি টের পেতে আরম্ভ করেছি, মানুষের কাছে একরকম ঈর্ষার পাত্র বনে গেছি। যদিও আমি বুঝতে পারি, তার মধ্যে কিছু পরিমাণে হলেও করুণা মিশে রয়েছে। যে মহিলা অঙ্গুলি হেলনে ঢাকা শহরের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিটিকে পেছনে ছুটিয়ে নিতে পারে, ক্ষমতাবান মানুষটিকে পাগল করে তুলতে পারে, আমার মতো তুচ্ছ একজন মানুষকে নিয়ে প্রায় প্রতিদিন এই যে ঘোরাঘুরি করে বেড়াচ্ছে, এটা তার একটা খেয়াল ছাড়া আর কিছু নয়। এ-কথা আমার হিতৈষী বন্ধু-বান্ধবেরা আমাকে বারবার বলেছে, আমি এক ঘড়েল মহিলার পাল্লায় পড়েছি এবং মহিলা আমাকে লেজে খেলাচ্ছে। এক সময় আমাকে এমন উলঙ্গ করে ছেড়ে দেবে যে, তখন মানুষের কাছে আমার মুখ দেখাবার উপায় থাকবে না। এগুলো আমি অস্বীকার করিনে। এ পর্যন্ত শামারোখ সম্বন্ধে যেটুকু ধারণা আমার হয়েছে, তাতে করে আমি ভালভাবে বুঝে গেছি, সে যে-কোনো সময় যে কোনো কিছু করে ফেলতে পারে। এ রকম একটি মাদকতাময়ী সুন্দরীর সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো কি জিনিস, তার শরীরের স্পর্শ, তার কণ্ঠস্বরের উত্তাপ, চুলের সুঘ্রাণ এগুলোর সম্মিলিত নেশা রক্তে কেমন আগুন ধরিয়ে দিতে পারে, সেই অপূর্ব অভিজ্ঞতা বন্ধুদের কোনোদিন হয় নি। তাই তারা এমন অভাবনীয় ভয়াবহ পরিণতির কথাটা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। অনেক সময় মানুষ সত্য প্রকাশের ছলে, নিজের মনের প্রচ্ছন্ন ঈর্ষাটাই প্রকাশ করে থাকে।
