শেষ পর্যন্ত আমি খিলগাঁও চৌধুরী পাড়ায় কমরেড এনামুল হকের গোপন আস্তানায় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। আমাকে সংবাদ জানানো হলো কমরেড অন্য কমরেডদের সঙ্গে জরুরি বিষয়ে আলাপ করছেন। আমাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে। আমি বাইরের ঘরে হাতল ভাঙা চেয়ারের ওপর বসে পড়লাম। ঘণ্টাখানেক পর আমাকে ভেতরে ডাকা হলো। কমরেড এনামুল হকের ঘরে দেখলাম আধোয়া প্লেটের স্তূপ। মাংসের হাড়গোড় সরিয়ে নেয়া হয়নি। সারা ঘরে ছড়ানো স্টার সিগারেটের বটি। দেয়ালে মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, স্টালিন এবং মাও সে তুংয়ের ছবি। আমরা যারা কমরেড এনামুল হকের চ্যালা, সঙ্গত কারণেই বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে যদি সর্বহারার সফল বিপ্লব হয়, মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্টালিন, মাসে তুং-এর পাশে কমরেড এনামুল হকও একটা স্থান দখল করে নেবেন। আমি তিনমাস আসি নি। এই সময়ের মধ্যে কমরেড এনামুল হকের দাড়ি-গোঁফ আরো লম্বা হয়েছে। তার সুদূরপ্রসারী দৃষ্টির রহস্যময়তা আরো গাঢ় হয়েছে। যে হাতের বজ্রমুষ্টিতে তিনি সমাজের সমস্ত বন্ধন চূর্ণ করবেন বলে আমরা মনে করি, সেই হাত দিয়ে কমরেড এনামুল হক আমার হাত চেপে ধরলেন। পুরুষের হাত। এই হাতের স্পর্শ একবার যে পেয়েছে, কমরেড হকের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে পারে নি। কমরেড হক তার তেজোব্যঞ্জক রহস্যময় দৃষ্টি এমনভাবে আমার ওপর প্রয়োগ করলেন, আমার মনে হলো, শরীরের নাড়িভুঁড়ি পর্যন্ত দেখে ফেলতে পারেন। তার সেই দিব্য দৃষ্টি থেকে কোনো কিছুই আমরা লুকোতে পারি নে। এবার কমরেড হক কথা বললেন, আমরা মনে করলাম, কমরেড জাহিদ বিপ্লবী দায়িত্ব ভুলে গিয়েছেন এবং আমাদের ছেড়ে দিয়েছেন। আমি ভীষণ লজ্জিত হয়ে পড়লাম। আমতা-আমতা করে একটা কৈফিয়ত দাঁড় করাতে চেষ্টা করলাম, শরীর ভাল ছিল না, তাছাড়া গবেষণার কাজে মনোযোগ দিতে হয়েছিল। আমার খোঁড়া কৈফিয়ত শুনে বললেন, কমরেড জাহিদ, আপনাকে আর বানিয়ে বানিয়ে কৈফিয়ৎ দিতে হবে না। আমরা জানি একজন সুন্দরী মহিলাকে নিয়ে আপনাকে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল না, সেজন্য আপনাকে দোষারোপ করব না বরং আপনার তারিফ করব। মনে আছে কমরেড, প্লেটো বলেছিলেন, সুন্দরী মহিলারা সমাজের এজমালি সম্পত্তি। আপনার বান্ধবীকেও পার্টিতে নিয়ে আসুন। ভয় পাবেন না, বান্ধবী আপনার ঠিকই থাকবে, কিন্তু কাজ করবে পার্টির।
আমার মনে হলো, কমরেড এনামুল হকের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলা ভাল। আমি বললাম, কমরেড, এই ভদ্রমহিলা তো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজ চাইছেন। কমরেড এনামুল হক আবার ঠা-ঠা করে হেসে উঠলেন। তারপর বললেন, কমরেড, রাগ করবেন না, আপনার চিন্তা-চেতনা এখনো বুর্জোয়া ধ্যান-ধারণায় আচ্ছন্ন। এই সুন্দরী মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে কি করবে? আপনি কি চান ওই বস্তাপচা জিনিস পড়িয়ে মহিলা তার জীবন অপচয় করবেন? বিপ্লবের তাজা কাজে লাগিয়ে দিন। আমি বললাম, তার থাকার অসুবিধা আছে, চলার কোন সঙ্গতি নেই। কমরেড এনামুল হক বললেন, সেই দুশ্চিন্তা আপনার নয়। পার্টি সব ভার বহন করবে। তারপর তিনি আমার কাঁধে হাত দিয়ে গোপন কিছু ফাঁস করছেন, এমনভাবে বললেন, কমরেড, জানেন, একজন সুশিক্ষিত সুন্দর মহিলা আমাদের পার্টিতে থাকলে আমাদের কত সুবিধে হয়। আমাদের শত্রুদের খবরাখবর সংগ্রহ করতে হয়, চাঁদা ওঠাতে হয়। ভয় পাবেন না কমরেড, আপনার বান্ধবী আপনারই থাকবে, লাগিয়ে দিন পার্টির কাজে। একটু অবসর সময়ে আসবেন, আমি লেনিনের রচনাবলি খুলে আপনাকে দেখাবো, মহামতি লেনিন পরিষ্কার বলেছেন, বিপ্লব সফল করতে হলে সৌন্দর্য, শক্তি, অর্থ, মেধা, কৌশল সবকিছু একযোগে কাজে লাগাতে হবে। নিয়ে আসুন আপনার বান্ধবীকে। আমি নিস্পৃহভাবে বললাম, কমরেড, ওই মহিলার মাথার মধ্যে একটা দুটো নয়, অনেকগুলো ছিট আছে। এ ধরনের মহিলা বিপ্লবী কাজ-কর্মের মোটেই উপযুক্ত হবে না। কমরেড হক একটা চুরুট জ্বালালেন এবং টান দিয়ে বললেন, কমরেড জাহিদ, বললে আপনি অসন্তুষ্ট হবেন, বুর্জোয়া ধ্যান ধারণা আপনার মনে এমনভাবে শেকড় গেড়েছে যে, বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি আপনার মধ্যে এখন পর্যন্ত জন্মাতে পারে নি । মানুষের যত রকম ব্যাধি আছে তার অর্ধেক সামাজিক ব্যাধি। বিপ্লবী কর্মকাণ্ড হলো এ ধরনের রোগ-ব্যাধি নিরাময়ের মোক্ষম ওষুধ। পার্টিতে নিয়ে আসেন, দেখবেন, এক সপ্তাহের মধ্যে আপনার বান্ধবী সুস্থ হয়ে উঠবেন।
বুঝলাম, শামারোখের অবস্থা হয়েছে গোল আলুর মতো। গোল আলু যেমন মাছ, মাংস, সুটকি সব কিছুর জন্য প্রয়োজন, তেমনি শামায়োখকেও সবার প্রয়োজন। বিপ্লবের জন্য, কবিতার জন্য, রাজনীতির জন্য, এমনকি লুচ্চামি তাঁদরামোর জন্যও শামারোখের প্রয়োজন। দিনে দিনে নানা স্তরের মানুষের মধ্যে তার চাহিদা বাড়তে থাকবে। ভার বইবার দায়িত্বটুকু কেন একা আমার! যদি পারতাম কেঁদে মনের বোঝা হাল্কা করতাম।
.
১৭.
একদিন দুপুরবেলা শামারোখ এসে বলল, আপনি আজ আমাকে খাওয়াবেন। আমি বিব্রতকর একটা অবস্থার মধ্যে পড়ে গেলাম। এই মহিলা দিনে দিনে আমার সমস্ত দীনতার কথা জেনে যাচ্ছে। আমি এই ভেবে শঙ্কিত হলাম যে, বজলুর মেসে যে খাবার খাই দেখলে ভদ্রমহিলা নিশ্চিতই তার নাক কুঁচকাবে। অথচ সে আজ নিজের থেকে কিছু খেতে চাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এটাকে আমার সৌভাগ্য বলে ধরে নিলাম। আমি জামা-কাপড় পরতে আরম্ভ করলাম। ভদ্রমহিলা আমার দিকে বড় বড় চোখ মেলে মন্তব্য করে বলল, আপনি এরকম উদ্ভট জামা-কাপড় পরেন কেন? শুনে আমার ভীষণ রাগ হলো। কিন্তু সামলে নিলাম। বললাম, জামা-কাপড় আমি নিজে কিনি নে। বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে যখন যেটা পাওয়া যায় পরে ফেলি। আমি আলনার দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম, এখানে যে শার্ট-প্যান্ট দেখছেন, তার কোনোটাই আমার কেনা নয়। সবগুলোই কারো না কারো কাছ থেকে পাওয়া। তাই আমার জামা-কাপড়ের কোনোটাই আমার গায়ের সঙ্গে খাপ খায় না। কোনোটা শরীরের মাপে ছোট, কোনোটা বড়। কিন্তু আমি দিব্যি পরে বেড়াচ্ছি। গায়ের মাপের চাইতে ছোটবড় জামা-কাপড় পরা যেন মস্ত একটা মজার ব্যাপার, এরকম একটা ভঙ্গি করে উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠলাম।
