বাংলা একাডেমীর গোড়ায় এসে বললাম, কোথায় যাবেন বলুন, আপনাকে রিকশা ডেকে দিই। সে বলল, এক কাজ করুন, আমাকে আপনার হোস্টেলে নিয়ে চলুন। গল্প করে একটা রাত কাটিয়ে দেয়া যাবে। আমার মনে হলো, শামারোখ আমার সঙ্গে রসিকতা করছে। তাই আমি জানতে চাইলাম, আমি হোস্টেলে নিয়ে গেলে আপনি থাকতে পারবেন? সে বলল, কেন নয়, আমাকে তার চাইতেও আরো অনেক খারাপ জায়গায় রাত কাটাতে হয়েছে। আমি বললাম, আমাদেরটা ছেলেদের হোস্টেল, মহিলারা সেখানে থাকতে পারে না । শামারোখ ফের জিজ্ঞেস করল, আপনাদের হোস্টেলে রাতে কোনো মহিলা থাকতে পারে না? আমি বললাম, কোনো কোনো মহিলা লুকিয়ে চুরিয়ে থাকে কিন্তু তারা ভাল মহিলা নয়। তার ঠোঁটে আবার সেই রহস্যময় হাসিটা খেলে গেল, আমাকে আপনি ভাল মহিলা মনে করেন তাহলে? তার কথা শুনে ক্ষেপে গেলাম। আমি বললাম, আপনি ভাল কিংবা খারাপ, সে আপনার ব্যাপার, কিন্তু এখন যাবেন কোথায় বলুন, রিকশা ঠিক করে দিই। এবার শামারোখের উত্তপ্ত কণ্ঠস্বর শুনলাম, আপনার কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই? একজন ভদ্রমহিলাকে শুধু রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে মনে করবেন মস্ত একটা দায়িত্ব পালন করেছি। ঢাকা শহরের রাস্তাঘাটের যা অবস্থা এই ভর সন্ধ্যেবেলা একেবারে একাকী কোথাও যাওয়ার জো আছে! রাস্তাঘাট চোর-ছ্যাচড় এবং হাইজাকারে ভর্তি। আমি তো মহা-মুশকিলে পড়ে গেলাম। ভদ্রমহিলাকে নিয়ে আমি কি করি! শেষ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হলাম, আপনি বলে দিন, আমাকে এখন কি করতে হবে? শামারোখ আমার চোখে চোখ রেখে সেই রহস্যময় হাসি হাসল। তার ওই হাসিটি দেখলে আমার বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়ে যায় । কি করব স্থির করতে না পেরে আচাভুয়োর মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।
শামারোখ হাতের ইশারায় একটা রিকশা ডেকে চড়ে বসল। আমাকে বলল, আপনিও উঠে আসুন। আমার তো ভাবনা-চিন্তা লোপ পাওয়ার যোগাড়। আমতা আমতা করে বললাম, আপনার সঙ্গে আমি আবার কোথায় যাব? শামারোখের ধৈর্যচ্যুতির লক্ষণ দেখা দিল, আপনি তো কম ঘাউরা লোক নন। বলছি উঠে আসুন । অগত্যা উঠে বসতে বাধ্য হলাম। নিজেকে যথাসম্ভব সংকুচিত করে রিকশার একপাশে আড়ষ্ট হয়ে বসলাম। শামারোখ বলল, আপনাকে নিয়ে আর পারা গেল না, অমন চোরের মতো হাত-পা গুটিয়ে আছেন কেন? আমরা যে রিকশায় উঠেছি, তার খোলের পরিসর নিতান্তই সংকীর্ণ । যদি আমি শরীরটা মেলে দিই, শামারোখের শরীরে আমার শরীর ঠেকে যাবে। তার স্তনের সঙ্গে আমার কনুইয়ের সংঘর্ষ লেগে যাবে। রিকশা যখন চলতে আরম্ভ করল আমি শামারোখের শরীরের ঘ্রাণ পেতে আরম্ভ করলাম। হাল্কা হাওয়ার টানে এক ধরনের মৃদু সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল । ফুরফুরে নরম এক ধরনের ইন্দ্রিয়-অবশ-করা সুগন্ধি মেখেছে শামারোখ । আমার খুবই ইচ্ছে করছিল, হাত দিয়ে তার অনাবৃত কাঁধ দুটো স্পর্শ করি, তার আন্দোলিত স্তন দুটো ছুঁয়ে দেখি। কিন্তু বাস্তবে ভিন্নরকম কাজ করে বসলাম । রিকশাঅলাকে বললাম, ভাই, একপাশে নিয়ে রিকশা দুমিনিট রাখবে? শামারোখ জিজ্ঞেস করল, কেন রাখবে রিকশা? আমি বললাম, সিগারেট জ্বালাবো। শামারোখ ঝংকার দিয়ে উঠল, এই আপনার সিগারেট খাওয়ার সময়? আমি বললাম, সিগারেট খেলে আপনার অসুবিধে হবে? সে তেমনি ঝঙ্কৃত গলায় বলল, আমার সুবিধে-অসুবিধের কথা আপনি কি বুঝবেন? ঠিক আছে জ্বালিয়ে নিন আপনার সিগারেট।
রিকশাঅলাকে কোথায় যেতে হবে সে কথা আমরা দুজনের কেউ বলিনি। শাহবাগের কাছাকাছি এসে সে জানতে চাইল, কোথায় যেতে হবে? আমি বললাম, মেম সাহেবের কাছে জেনে নাও। শামারোখ ধমকের স্বরে বলে বসল, মেম সাহেব ডাকলেন কেন? বললাম, কি ডাকতে হবে আপনি বলে দিন। সে বলল, আপনার সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই। আপনি একটা গ্রামীণ কুষ্মাণ্ড, বোধশক্তি কিছুই জন্মায়নি। আমি হেসে উঠতে চাইলাম, এতক্ষণে ঠিক করে ফেলেছেন, আমি একটা গ্রামীণ কুণ্ডই বটে। শামারোখ বলল, ঢের হয়েছে, আর পাকামো করবেন না। রিকশাঅলাকে বলল, ভাই গ্রিন রোড চলল।
রিকশা যখন এলিফেন্ট রোড ছাড়িয়ে যাচ্ছে শামারোখ আমার গায়ে আঙুলের গুতো দিয়ে বলল, সব ব্যাপারে তো আপনার হে হে করার অভ্যেস। মহিলার কথা শুনে আমার পিত্তি জ্বলে গেল। বললাম, আপনার সঙ্গে এক রিকশায় যাওয়া আমার সম্ভব হবে না। রিকশাঅলাকে বললাম, ভাই আমাকে এখানে নামিয়ে দিয়ে যাও। শামারোখ আমার হাত দুটো ধরে ফেলে বলল, নামতে চাইলেই কি নামা যায়? আপনি তো অদ্ভুত মানুষ। একজন ভদ্রমহিলাকে রাস্তার মাঝখানে ছেড়ে দিয়ে বললেই হলো, আমি চলোম। আশ্চর্য বীরপুরুষ। আমি বললাম, আপনার সঙ্গে আমার বনছে না, সুতরাং আমার নেমে যাওয়াই উচিত। ভদ্রমহিলা বললেন, আমার কথা শুনুন, তবেই বনবে। আমি বললাম, বলুন আপনার কথা। সে বলল, যে বাড়িতে যাচ্ছি ওরা হচ্ছে এমন মানুষ, যাদেরকে বলা যায় ফিলথিলি রিচ। টাকা ছাড়া কিছু বোঝে না। সুতরাং আপনার পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় বলব আপনার বাবার তিন কোটি টাকার সম্পত্তি আছে, সাহিত্যচর্চা করেন বলেই এমন ভাদাইমার মতো থাকেন। আমি চিন্তাও করতে পারছিনে, মহিলা আমাকে কোন্ ফাঁদে জড়াচ্ছেন! আমি বললাম, আমার বাবাও নেই, টাকাও নেই। আপনি আমাকে তিন কোটি টাকার মালিকের পুত্র এই পরিচয় দেবেন কেন? শামারোখ জবাব দিল, আপনি আমার সঙ্গে এক রিকশায় যাচ্ছেন, আমার একটা ইজ্জত আছে না? সুন্দরী মহিলার সঙ্গে এক রিকশায় চড়ে এই এতদূর এসেছি, তার শরীরের ঘ্রাণে বুকের বাতাস পর্যন্ত আলোড়িত হয়ে উঠেছে, শরীরের স্পর্শে সুপ্ত সব বাসনা জেগে উঠেছে। এই মহিলা আমাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে জল্লাদের হাতে তুলে দিতে চাইলেও আমি অমত করার মতো কিছু পেলাম না। যা আছে কপালে ঘটবে।
