তিনশ!
অস্ফুট বিস্ময়ে উচ্চারণ করে ফেলে সীতু। এতটা ধারণা করে নি সে কোনদিন।
কিন্তু থাকত থাকত শিশুমনের বিস্ময়। নাই বা বুঝত সে মৃগাঙ্ক ডাক্তারের মহিমা, কি এসে যেত অতসীর? আবার কেন কথা বলল সে? কোর মত, ওজন না বোঝা কথা!
তবে না তো কি? প্রত্যেক মাসে মাসে দিতে হবে। খুব তো বাজে বাজে লোকের কাছে যা তা কি একটা শুনে চেঁচাচ্ছিলি, ও আমার বাবা নয় কেউ নয়–নিজের বাবা না হলে কে করে এত?
মুহূর্তে কোথা থেকে কি হয়ে গেল, ছিটকে উঠল সীতু। ছিটকে দাঁড়িয়ে উঠে বলল, আমি চাই না, চাই না বোর্ডিঙে যেতে, দিতে হবে না কাউকে টাকা। সবসময় মিথ্যে কথা বল তুমি। আমি জানি অন্য বাবা ছিল আমার, মরে গেছে সে। আবার বিয়ে করেছ তুমি ওকে।
না, এ কথার আর উত্তর দেওয়া হল না অতসীর, সীতু ঘর থেকে চলে গেছে।
কিন্তু থাকলেই কি উত্তর দিতে পারত অতসী? দেবার কিছু ছিল? শুধু বার বার ধিক্কার দিল নিজেকে। কি জন্যে বলা শক্ত। হয়তো মাত্র একটাই কারণে নয়।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল এল।
.
মৃগাঙ্ক সাড়া দিয়েছেন তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে নিতে।
কাঁটা হয়ে আছে অতসী, কি জানি শেষ মুহূর্তে কি না কি হয়। নিজে বলতে পারে না, মাধবকে দিয়ে বলায় খোকাবাবুকে পোশাক টোশাক পরে নিতে। আসন্ন বিচ্ছেদবেদনাখানিও বুঝি শুকিয়ে গেছে আতঙ্কের আশঙ্কায়।
কিন্তু না, অতসীর আশঙ্কা অমূলক।
কোন গোলমাল করল না সীতু, প্রস্তুত হয়ে নিল নির্দেশমত।
মায়ের পিছু পিছু গাড়িতে গিয়ে উঠল।
শহর ছাড়িয়ে শহরতলির পথে গাড়ি ছুটছে দুরন্ত বেগে। অতসীর মনও ছুটছে সেই বেগের সঙ্গে তাল দিয়ে। অন্য পরিবেশে অন্য শিক্ষায় মানুষ হয়ে উঠবে সীতু-সভ্য হবে, মার্জিত হবে, বড় হবে। তখন হয়তো মায়ের প্রতি যা কিছু অবিচার করেছে, তার জন্য লজ্জিত হবে। হয়তো মার প্রতি দয়া আসবে ওর, আসবে মমতা।
পৃথিবীর হালচাল আর দুঃখ-দুর্দশা দেখে দেখে নিশ্চয়ই বুঝবে, মা তার কত হিতাকাঙ্কিণী, মা তার কত উপকার করেছে! তখন হয়তো যাকে আজ বাপ বলে স্বীকার করতে পারছে না, তাকেই শ্রদ্ধা করবে, ভালবাসবে।
কিন্তু অতসী কি অতদিন বাঁচবে? সেই সুখের দৃশ্য দেখা পর্যন্ত?
.
এসে গেলাম। বললেন মৃগাঙ্ক।
সুন্দর কম্পাউন্ড দেওয়া আবাসিক আশ্রমের গেটের সামনে গাড়ি থামল।
নতুন করে কৃতজ্ঞতায় মন ভরে ওঠে অতসীর। কত ভাল মৃগাঙ্ক, কত মহৎ! নইলে অতসীর ছেলের জন্যে, যে ছেলে মৃগাঙ্ককে বিষ নজরে দেখে, সেই ছেলের জন্যে, নির্বাচন করেছেন এমন সুন্দর সেরা স্থান।
অধ্যক্ষ এদের অভ্যর্থনা জানালেন। সব কিছু দেখে অতসী সন্তোষ প্রকাশ করছে জেনে ধন্যবাদ জানালেন, কোন ঘরে সীতুর থাকার ব্যবস্থা হয়েছে তা জানালেন। তারপর অফিসঘরে এসে মৃগাঙ্কর সঙ্গে এটা ওটা লেখালিখি করিয়ে একখানা ছাপানো ফরম এগিয়ে দিলেন সীতুর দিকে, আচ্ছা এবার তুমি নিজে এই ফরমটা ফি আপ করো তো মাস্টার! এইখানে তোমার নামটা লেখো ইংরেজিতে!
কলমটা টেনে নিয়ে খসখস করে লিখল সীতু নিজের নাম।
বাঃ, বেশ হাতের লেখাটি তো তোমার! অধ্যক্ষ ফরমের আর একটা জায়গায় আঙুল বসালেন, এবার এখানটায় বাবার নাম লেখ।
বাবার!
সহসা পেনের মুখটা বন্ধ করে টেবিলে রেখে দিয়ে সীতু পরিষ্কার গলায় বলে উঠল, বাবার নাম জানি না।
অধ্যক্ষ প্রথমটা একটু ধাক্কা খেলেন, তারপর কি বুঝে যেন মৃদু হেসে বললেন, ওঃ, আচ্ছা। আমি বলে যাচ্ছি, তুমি লেখো–এম আর আই
ও বানান বললে কি হবে? ও তো আমার কেউ নয়। আমার বাবা নেই। মরে গেছে।
অতসী স্তব্ধ। মৃগাঙ্ক পাথর।
আশ্চর্য! ঘরের স্তব্ধতা ভঙ্গ করেন অধ্যক্ষ, তাহলে ইনি তোমার কে হন?
বললাম তো কেউ না।
সীতু! অতসী চাপা আর্তনাদের মত তীক্ষ্ণ গলায় বলে, কী অসভ্যতা হচ্ছে? এ রকম করছ কেন? বল সব ঠিক করে, নাম লেখো।
কতবার বলব, আমার বাবার নাম আমি জানি না।
অধ্যক্ষ ভারি থমথমে মুখে বলেন, ডক্টর ব্যানাজি
ডক্টর ব্যানার্জি তাকিয়ে আছেন বাইরের আকাশে দুর্নিরীক্ষ দৃষ্টি মেলে।
অতসী উত্তর দেয় ব্যাকুলভাবে, দেখুন, কিছু মনে করবেন না, থেকে থেকে ওর এ রকম একটা খেয়াল চাপে, তখন—
থাক। অধ্যক্ষ প্রায় ভীষণ গলায় বলে ওঠেন, বুঝতে পেরেছি আপনি কি বলতে চাইছেন। কিন্তু এ ধরনের খেয়ালি ছেলেকে আমার এখানে রাখা সম্ভব নয়।
কিন্তু আপনি বুঝছেন না, মৃগাঙ্ক নিঃশব্দ–কথা চালাচ্ছে অতসী, ব্যাপার হচ্ছে–
দেখুন আমি হয়তো বুঝি কম। সবরকম ব্যাপার বোঝবার মত হয়তো বুদ্ধি আমার নেই, কিন্তু বললাম তো আপনাকে, কোনরকম অ্যাবনর্মাল ছেলেকে আমরা রাখতে পারি না। পরীক্ষায় রেজাল্ট ভাল করেছিল, চান্স দিয়েছিলাম। কিন্তু চোখে দেখে…না! মাপ করবেন আমাকে।
তবু হাল ছাড়তে চায় না অতসী, তবু ধরে রাখতে চায়, তাই বলে, সীতু, এ কী দুষ্টুমি করলে তুমি? দেখো তো ইনি কত বিরক্ত হচ্ছেন? কেন ঠিক ঠিক উত্তর দিলে না সব কথার?
ঠিকই তো দিয়েছি। বুক টানটান করে বলে সীতু।
অধ্যক্ষ মৃদুহাসির সঙ্গে বলেন, এরা তাহলে তোমার কে হন খোকা?
ইনি আমার মা, আর উনি কেউ না।
.
মাথা হেঁট করে ফিরে এসেছেন মৃগাঙ্ক ডাক্তার, নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে ফেলতে এসেছে অতসী। সীতুকে শাসন করবে, এ শক্তিও আর তার কোথাও অবশিষ্ট নেই। একটা কাতর আর্তনাদে যন্ত্রণা প্রকাশেরও শক্তি নেই বুঝি।
