ভদ্রলোক ঠিক বিশ্বাস করতে পারেন না। দিগিনের দিকে সন্দেহের চোখে তাকান আবার অবিশ্বাসও করতে পারেন না। দিগিন শিলিগুড়ির নামজাদা লোকদের একজন। তার প্রভাব-প্রতিপত্তি ও কথার দাম আছে। কিন্তু এত লোভানি কেন, মেয়ের কোনও গুপ্ত খুঁত আছে কি না এই নিয়েই বোধহয় দ্বিধায় পড়েন ভদ্রলোক।
সেটা দিগিন আন্দাজ করে বলেন, আমাদের মেয়ে যা পাচ্ছেন তেমন স্বভাবের মেয়ে পাওয়া যায় না। আপনি পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে খোঁজ নিতে পারেন।
না, না, তার কী দরকার?
খোঁজ নেওয়া ভাল, সন্দেহের দরকার কী?
বড়দা ভ্রু কুঁচকে দিগিনের চুরুটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন মুখখানা দেখছিলেন। তিনি স্বভাবতই বিরক্ত। তার বড় দুই মেয়ের বিয়েতে দিগিন এত খরচ করেননি। মেজদাও খুশি নন। পুন্নির বাপ একটু ঘাবড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি দিগিনের একটা চুরুট ধরিয়ে নিয়ে বলে, তা হলে পাকা কথা আজই হয়ে যাকা–বলে সমর্থনের জন্য চার দিকে তাকাল। তার দুই সম্বন্ধী শ্বাস ফেলেন।
বড়দা বললেন, সব তো শুনলেন। সন্তুষ্ট তো?
ভদ্রলোক মাথা নেড়ে বলেন, মন্দ কী?
তা হলে? দিগেন জিজ্ঞেস করেন।
ভদ্রলোক একটু করুণ সুরে বলেন, ছেলে একবার নিজের চোখে দেখবে না?
কেউ কিছু বলার আগেই দিগিন দৃঢ়স্বরে বলেন, না। আমাদের পরিবারে পাত্রকে মেয়ে দেখানোর নিয়ম নেই।
কথাটা ডাহা মিথ্যে। সবাই দিগিনের দিকে চেয়ে থাকেন। এই ঘরে যে সব ঘটনা ঘটছে তার কর্তৃত্ব নিশ্চিতভাবে এখন দিগিনের হাতে। তাই কেউ কিছু বলতে সাহস পান না।
ভদ্রলোক অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে বললেন, মেয়েটিকে আর এক বার ডাকুন।
পুন্নি আবার আসে। তার চোখেমুখে একটা ভয়ার্ত ভাব। বহু টাকায় ছোটমামা তার জন্য ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট কিনছে, একথা ভিতরবাড়িতে ছড়িয়ে গেছে ইতিমধ্যে। সে এতটা কল্পনাও করেনি। তাই তার মুখে ভয়, লজ্জা, সংকোচ।
ভদ্রলোক পুন্নির দিকে চেয়ে বলেন, মা, এই বুড়ো ছেলেটার বায়না-টায়না একটু রাখতে পারবে তো? আমার বড় বউমা হবে তুমি, তা রান্নাটান্না কি বুড়োর একটু সেবা-টে, এ সব পারবে তো?
পুন্নি মৃদু হেসে মাথা নত করে নিয়মমাফিক। স্নেহভরে চেয়ে থাকেন দিগিন। এর আগে তিন বার পুন্নিকে নাকচ করে গেছে নিটি ছেলেপক্ষ। তাই ও আর পাত্রপক্ষের সামনে বেরোতে চায় না, সে ব্যাপারটা মিটিয়ে দিলেন দিগিন। বিয়েটা যে হবে, বোঝাই যাচ্ছে।
ভদ্রলোক দিগিনের দিকে চেয়ে একটু হেসে বলেন, মেয়ে তো অপছন্দের নয়। আমার পছন্দই হয়েছে।
কথা দিচ্ছেন তা হলে?
ভদ্রলোক একরকম হাপধরা হাসি হেসে বললেন, ওই দেওয়াই হল।
আমরা খুব বেশি দেরি করতে পারব না।
দেরি করে আমাদেরই বা লাভ কী?
তা হলে অগ্রহায়ণে দিন ঠিক করি?
করুন। আমি এ সপ্তাহেই আবার আসব। আমার স্ত্রীকে একটু খবর দেওয়া নিতান্ত দরকার। আমার একার কথায় কিছু হবে না।
স্ত্রীকে সব টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন জানিয়ে দিন। ছেলেরও মত দিন। কিন্তু সেগুলো সেকেন্ডারি ব্যাপার। আপনার মত থাকলে কেউই আপত্তি করবে না।
মানিসেন্ট্রিক লোকটি মাথা নাড়েন। সম্বন্ধটা হাতছাড়া যে তিনি নিজের স্বার্থেই করবেন না তা বোঝাই যাচ্ছিল। বললেন, তা হলে কথাটা ফাইনাল বলেই ধরে নিন।
দিগিন মাথা নেড়ে বললেন, ধরে নিচ্ছি। আমরা আর সেই ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটির গার্জিয়ানদের সঙ্গে কথা বলব না।
ভদ্রলোক হাঁপ ছাড়লেন।
মনে মনে হাঁপ ছাড়লেন দিগিনও। ‘নির একসময়ে বোধহয় ধারণা ছিল যে, যেহেতু তারা মামাবাড়িতে আশ্রিত সেই জন্যই তার ভাল বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা নেই। দেখতেও সে তেমন কিছু নয়, মামারাও খরচ করবেন না। হয়তো আদপে বিয়েই হবে না তার। সেই কারণেই বোধহয় পুন্নি শান্ত এবং ভাল মেয়ে হয়েও একদা একটি ছেলের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। ছেলেটা পাড়ার বখাটেদের একজন। লেখাপড়া করেনি, জতে নিচু, গুণের মধ্যে ভাল গোলকিপার ছিল। কবে কখন প্রেম হয়েছিল কে জানে। কিন্তু বাড়িতে কথাটা জানাজানি যখন হয় তখন ব্যাপারটা অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। সারা রাত্রি ধরে একটা ফাংশন হয়েছিল তিলক ময়দানে, সেখানে যাওয়ার নাম করে এক বার গিয়েছিল পুন্নি। সকালে ফিরেও এল। কিন্তু ওর বন্ধুদের মধ্যে কে যেন বাড়িতে বলে দিয়েছিল যে পুন্নি ফাংশানে একটুক্ষণ থেকেই শান্তনুর সঙ্গে কেটে পড়েছিল। শিলিগুড়ি কলকাতার মতো বড় জায়গা নয়, এখানে সবাই সকলের খোঁজখবর রাখে। পুন্নির ব্যাপারটাও অনেকেই জেনে গেল। কিন্তু পুন্নির মা বাবা মেয়েকে শাসন করেননি। বড়দার কানে যেতেই উনি মত দিলেন, ও সব জাত-ফাত, শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে কী হবে? বিয়ে দিয়ে দাও। মেজদারও তাই মত ছিল। এবং বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর উদ্যোগও চলছিল। ব্যাপারটা দিগিন জানতে পারেন সবার শেষে।
দিগিন জাত-টাত বড় একটা মানতেন না, তাঁর নিজের শিক্ষাও বেশি দুর নয়! বিয়েটাতে মতও তিনি হয়তো দিতেন। কিন্তু তার মনে হয়েছিল, পুন্নির ভালবাসাটা খাঁটি নয় এবং বাড়ির লোক বোঝা নামাতে চাইছে। প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপে সংসারটার নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। পুন্নিকে ডেকে নিভৃতে প্রশ্ন করতেই সে কেঁদে ফেলল। প্রথমে বলল যে সে সত্যিই ছেলেটাকে ভালবাসে। ওকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে না। তার পর দিগিন তার কাছ থেকে আস্তে আস্তে সব খবরই বের করে নেন। পুন্নি ছেলেটার সঙ্গে রাত কাটিয়েছে, পিকনিকে গেছে, চিঠি লিখেছে পরম্পরকে। পুন্নি যে ফাঁদে পড়ে গেছে সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না। রাত কাটানোর ব্যাপারটা ছেলেটাই রটায়। এবং এমনই তার সাহস যে পুন্নির লেখা কিছু চিঠি সে এসে বড়দা আর পুন্নির বাবাকে দেখিয়েও যায়। ও সব দেখে ভয় পেয়ে সবাই বিয়ের উদ্যোগ করে।
