ধর্মতলার মোড়ে অফিসভাঙা ভিড়ে দাঁড়িয়ে মদন তার সিগারেটের প্যাকেট বের করল এবং শচীকে অফার না করেই নিজে একটা ধরাল। অভ্যাসবশে শচী হাত বাড়িয়েছিল। মাঝপথে হাতটা ফেরত নিয়ে বলল, আপনাদের ক্যাডাররাই কি মেজরিটি?
জানি না।
শচী ভিড়ের মধ্যে কানের কাছে মুখ এনে বলল, একটা কথা বলি দাদা। নিত্য ঘোষ যতই লাফাঁক, আপনি যেদিকে থাকবেন সেদিকেই পাল্লা ঝুঁকবে। আমরা আপনার দিকেই তাকিয়ে আছি।
কত কথাই যে জানো তোমরা!
দেখে নেবেন। বলে দিলাম।বলে শচী আবার হাতটা বাড়ায়।
মদন পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে ওর হাতে দিয়ে দেয়। বলে, কত কায়দাই যে জানো শচী। কিন্তু এবার নিজের পয়সায় সিগারেটটা খেতে শেখো, তাতে খানিকটা সেলফ-রেসপেক্ট আসবে।
কথাটা গায়ে না মেখে শচী বলে, আপনি যে ফোরফ্রন্টে চলে এসেছেন তা সবাই টের পাচ্ছে। নইলে আপনি আসার পর এই গণ্ডগোলটা হল কেন? নিত্য ঘোষ যেটা করছে সেটা পাওয়ার পলিটিক্স। কিন্তু আলটিমেটলি
কার্জন পার্কের ট্রাম গুমটি ছাড়িয়ে, রাজভবনের গাছপালার ডগার ওপর দিয়ে, রঞ্জি স্টেডিয়ামের পিছনে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। এসপ্লানেড ইস্টে আজও নিত্যকার মতো কারা ধর্না দিয়ে বসে আছে, সামনে পুলিশ ব্যারিকেড। একটা ফেরেব্বাজ কলমওয়ালা চোরাই কলম বেচার ভাবভঙ্গি কবে কানের কাছে এসে বলে গেল, চাইনি-ই-জ।
মদন ভুলে গেল যে, সে এম পি বা পলিটিক্সওয়ালা। হঠাৎ বলল, ফুচকা খাবে শচী? ওই লেনিন স্ট্যাচুর নীচে একটা ফুচকাওয়ালাকে দেখা যাচ্ছে। চলো।
বলতে বলতেই শচীর হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে রাস্তা পেরোয় মদন।
একজন ভি আই পি হয়ে কী যে করেন মদনদা!—হাত ছাড়িয়ে শচী হাসল, আর একটু হলে নীল বঙের অ্যামবাসাডারটার মুখে পড়ে যেতাম দুজনে।
পলিটিশিয়ান আর রিপোর্টাররা কখনও টাইমলি মরে না হে শচী। মরলে দেশটা সোনার দেশ হত। ওহে ফুচকাওলা, শুরু করো, শুরু করো! জলদি!
.
১৩.
দক্ষিণগামী বাসের দোতলায় এক ছোকরা হঠাৎ বলে উঠল, এই যে দাদারা! এত তাড়াতাড়ি সব বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন? শুনেছেন কি, কাল রাতে লাশকাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে? বধূ শুয়ে ছিল পাশে, শিশুটিও ছিল, তবু মরিবার হল তার সাধ। অথচ দেখুন কবি গেয়ে গেছেন, মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে। আজ নিজের জীবনের একটা গল্প বলব বলে আপনাদের কাছে এসেছি। গল্প নয়, ঘটনা, বুঝলেন দাদা, বেঁচে থাকার কোনও পথ না পেয়ে আমরা দুই ভাই ব্যাবসা করতে গিয়েছিলাম। বাঙালি ব্যাবসা করতে জানে না এই বদনাম ঘোচাতে দাদা, শ্যামবাজারের মোড়ে আমি আর আমার দাদা একটা দোকানঘর ভাড়া নিতে গেলাম। পেয়েও গেলাম একটা। কিন্তু দাদা, বাড়িওলা পঞ্চাশ হাজার টাকা সেলামি চায়। সেই শুনে আমরা পালিয়ে আসি। কিন্তু বাঁচতে তো হবে! মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে। তাই দাদা বাঁচার শেষ চেষ্টা করতে গিয়ে আমরা দুই ভাই অল্প পুঁজি নিয়ে একটা ব্যাবসা শুরু করলাম। এ লড়াই বাঁচার লড়াই, এ লড়াই করতে গিয়ে আমরা তৈরি করেছি একটি ধূপকাঠি। এই বাসে আমাকে প্রায়ই দেখতে পান আপনারা। রেগুলার অনেকেই এই ধূপ ব্যবহার করেছেন। যারা করেছেন তাদের কাছে নতুন করে বলার কিছু নেই। যারা জানেন না তারা জেনে রাখুন, একটি স্টিক জ্বলে পঁয়তাল্লিশ মিনিট, কাঠি শেষ হয়ে যাওয়ার পরও এক ঘণ্টা ঘরে তার গন্ধ ছড়িয়ে থাকে। আমার হাতে যে স্টিক জ্বলছে সেই একই স্টিক সব প্যাকেটে পাবেন। দোকানে বাজারে কিনতে যান, একটি প্যাকেটের দাম পড়বে পঁয়ত্রিশ পয়সা। কিন্তু বাসে কনসেশন রেটে এক প্যাকেট চার আনা, দু’প্যাকেট আট আনা, চার প্যাকেট এক টাকা।এক টাকা! এক টাকা! এক টাকা।…
মদনের নাকের ডগায় চারটে প্যাকেট ধরে বার কয়েক নাড়ে ছোকরা, এক টাকা! এক টাকা!
মদন অলস চোখে চেয়ে বলে, গল্পটা পালটাও। এ পর্যন্ত দশজনের মুখে শুনেছি একই গল্প।
ছোকরা প্যাকেটগুলো ঝট করে টেনে নিয়ে পরের সিটের এক যাত্রীর নাকের ডগায় ধবল, এক টাকা! এক টাকা!
মদনের পাশের লোকটা খিক খিক করে হেসে বলল, বেশ বলেছেন। এরপর লজেন্সওয়ালা উঠেও একই গল্প ঝাড়বে। শুধু কি তাই? গুপিযন্ত্র নিয়ে এক বাচ্চা ছোকরা উঠে ধরবে, তোমার সঙ্গে দেখা হবে বাবুর বাগানে। রোজ ওই বাবুর বাগানে’ কঁহাতক শোনা যায় বলুন দেখি! কিছু বলাও যায় না, দেশে বেকার সমস্যা। ভাবি, দুটো করে খাচ্ছে খাক। নেতারা তো আৰ এদের জন্য কিছু করবে না…
তা ঠিক, তা ঠিক।–মদন তাড়াতাড়ি বলল এবং পলিটিক্স এড়াতে দু’ স্টপেজ আগে নেমে পড়ল। হাজরার কাছাকাছি একটা ওষুধের দোকান থেকে ফোন করল মাধবকে, একটু দেরি হবেরে!
সে বুঝতেই পারছি।
তুই একা একা স্কচ চালাচ্ছিস নাকি?
না মাইরি।—একটা হেঁচকি তুলে মাধব বলে, ঝিনুক কেটে পড়েছে, জানিস!
চিরতরে নাকি?
বোঝা যাচ্ছে না। একেবারে আনপ্রেডিকটেবল মহিলা। সঙ্গে বৈশম্পায়ন।
বলিস কী?
দে আর হেড অ্যান্ড ইয়ারস ইন লাভ।
দুস শালা! তুই খাচ্ছিস।
একটুখানি। এই মোটে খুললাম।
কত নম্বর বোতল?
এক নম্বর মাইরি বিশ্বাস কর।
তোকে বিশ্বাসের কী? গিয়ে যদি দেখি সব ফাঁক করেছ তা হলে
আরে না না। অনেক আছে। চলে আয়।
অনেক নেই রে মাধব, অনেক নেই। তুই অন্তত হাফ পাইট সাফ করেছিস।
