বললাম, লোকাল বয়েজ।
বহু বর্ষ আগের সেই লোকাল বয়েজ যারা লোয়েলিন কোম্পানিতে খবর দিয়ে এসেছিল, তাদের যেন আজও উইলিয়ামস লেনে দেখতে পেলাম। তাদের যেন বয়েস বাড়েনি। আজও যেন গলির মোড়ে তারা দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু কোথায় গেল সেই পুরনো দিনের চিহ্ন? এই লেনের কোন বাড়িটাতে যে সেদিন জীবনের বিচিত্র নাটক অভিনীত হয়েছিল, তাও বুঝতে পারলাম না। ডাক্তার সাদারল্যান্ড বললেন, হয়তো সে বাড়িটা উইলিয়ামস লেনের বুক থেকে কবে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে; সেই পুরনো জায়গায় আবার নতুন বাড়ি উঠেছে।
উইলিয়ামস লেনের পথচারীদের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল তারা জানে না। বহু বর্ষ আগে চোখের জল এক দুঃখদিনের রাজা যে তাদের অভিনন্দন জানিয়েছিল, তা তাদের মনেও নেই।
রাস্তার উপর একটা ভিখিরির ছেলে হাইড্রান্ট থেকে একটা ভাঙা টিনের কৌটোয় জল নিচ্ছিল। হঠাৎ পা পিছলে সে পড়ে গিয়ে কেঁদে উঠল। তারপর যে এমন হবে বুঝিনি। ডাক্তার সাদারল্যান্ড ছুটে গিয়ে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলেন। তুলেই ক্ষান্ত হলেন না তিনি; আদর করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
কী করছেন? কী করছেন? আপনার জামাকাপড় সব কাদায় বোঝাই হয়ে যাবে। তাছাড়া ওর পায়ে ঘা রয়েছে।-ভিখিরির ছেলেকে সায়েবকে কোলে তুলে নিতে দেখে, কয়েকজন ভদ্রলোক ছুটে এলেন।
ডাক্তার সাদারল্যান্ডের সেদিকে খেয়াল নেই। ছেলেটার নাক দিয়ে সর্দি ঝরছিল। নিজের রুমাল বার করে মুছে দিলেন। আদর করতে করতে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে বললেন, তুমরা মা কীধার? তুমকো ড্যাডি-পিতাজি?
আঙুল দিয়ে ছেলেটা শিয়ালদা স্টেশনের দিকটা দেখিয়ে দিল। তারপর ভয় পেয়ে, বাচ্চাটা হঠাৎ জোর করে কোল থেকে নেমে ছুটে পালিয়ে গেল। ভেবেছে, কেউ বোধহয় ওকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে।
ডাক্তার সাদারল্যান্ড পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সন্ধ্যার প্রায়ান্ধকারে উইলিয়ামস লেন-এর মোড়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, ডাক্তার সাদারল্যান্ড ছেলেটার সর্দিমোছা রুমালের একটা অংশ দিয়ে নিজের চোখ দুটো মুছছেন।
উইলিয়ামস লেন থেকে আমরা সোজা লোয়ার সার্কুলার রোডের সমাধিক্ষেত্রে চলে এসেছি। তখন অন্ধকার একটু বল পেয়েছে—একেবারে টেম্পোরারি পোস্ট থেকে যেন কোয়াসি-পার্মানেন্ট হয়েছে।
সমাধিক্ষেত্রে ঢোকার মুখে কয়েকজন মালি ফুল বিক্রি করছিল। মালিরা আমাদের দিকে এগিয়ে এল-সায়েব, ফুল।
আমার কাছে টাকা ছিল না, কিন্তু সায়েব ফুল কিনলেন।
রাত্রের অন্ধকারে ফুল হাতে করে মৃতমানুষদের সেই নিস্তব্ধ শহরে আমরা ঢুকে পড়াম। কিছুই দেখতে পাওয়া যায় না। এখানে বিছে বা সাপ থাকাও আশ্চর্য নয়। সাদারল্যান্ডের পকেটে টর্চ ছিল—কিন্তু সামান্য টর্চে আর কতটুকু আলো হবে? মনে হল যেন মধ্যরাত্রে কোনো ভদ্র-হোটেলে ঢুকে পড়েছি আমরা। রাতের সব অতিথি কর্মমুখর দিনের শেষে ক্লান্ত দেহে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে রয়েছেন। আইন মেনে আমরা দুজনে যেন গোপনে বাইরে পালিয়েছিলাম। এখন দারোয়ানের চোখ এড়িয়ে পা টিপে টিপে দুরু দুরু বক্ষে নিজের ঘরে ফিরে আসছি।
বহুজনের এই বিচিত্র মেলা থেকে আজ আর শাজাহান হোটেলের সেই বার-বালিকাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। কে জানে, এই বিশাল প্রান্তরের কোন অংশে একদিন উইলিয়ামস লেনের ছেলেরা চিরদিনের জন্যে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে গিয়েছিল। তাদের কেউই হয়তো আজ নেই। তবু শাজাহান হোটেল আজও তার অনন্ত যৌবন নিয়ে বেঁচে রয়েছে। মোহিনী মায়ায় ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ও কামার্ত মানুষদের আজও নিজের কাছে আহ্বান করছে।
সামনে একটা গাছ ছিল। সেই গাছের তলায় ফুলগুলো নামিয়ে দিয়ে, ডাক্তার সাদারল্যান্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। আর আমার মনে হল, হবস যেন আমাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন—আমাদের কানের কাছে আপনমনে আবৃত্তি করছেন—
Gone away are the Kidderpore girls,
With their powdered faces & ticked up curls,
Gone uway are those sirens dark,
Fertile kisses, but barren of heart–
Bowing alternatively cold and hot–
Steadfastly sticking to all they got–
Filing a bevy of sailors boys
With maddening hopes of synthetic joys.
সুযোগ পেলে ডাক্তার সাদারল্যান্ড বোধহয় সারারাত ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কিন্তু আমার তো হোটেলে ফেরা দরকার। আমাকে না পেয়ে মার্কোপোলো এতক্ষণ হয়তো চিৎকার শুরু করে দিয়েছেন।
বললাম, ডাক্তার সাদারল্যান্ড, এবার বোধহয় আমরা ফিরতে পারি।
উত্তরে তিনি যে আমার সঙ্গে অমন অসৌজন্যমূলক ব্যবহার করবেন তা প্রত্যাশা করিনি। দাঁতে দাঁতে চেপে তিনি বললেন, ফর হেভেনস্ সেক, আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও।
আমার চোখে তখন জল এসে গিয়েছিল। তোমার খামখেয়ালির জন্যে শেষে আমার এতকষ্টে জোগাড়-করা চাকরিটা যাক। অথচ প্রতিবাদও করতে সাহস হয়নি। হোটেলে গিয়ে ম্যানেজারকে লাগিয়ে দিলেই হল—বা চিঠিতে কমপ্লেন করলেই, আমাকে আবার পথে বসতে হবে। খদ্দের সব সময়ই ঠিক, যদি কোনো দোষ হয়ে থাকে সে তোমার, একথা সত্যসুন্দরদা আমাকে অনেকবার মনে রাখতে বলে দিয়েছেন।
ফেরবার সময় ট্যাক্সিতে আমি একটা কথাও বলিনি। ডাক্তার সাদারল্যান্ডও কথা বলবার চেষ্টা করেননি। গাড়ি থেকে নেমে, তার ধন্যবাদের জন্য অপেক্ষা না করেই আমি কাউন্টারে বোসদার কাছে চলে গিয়েছি।
