ঠিক আছে স্যার।
বাই দা ওয়ে, আমি দেখলাম ঐ ইমাম তোমার হাত ধরে-ধরে আসছে। কী ব্যাপার?
হাঁটতে পারছিল না।
ঠিকই পারবে। দৃশ্যটি তাদের দেখতে দাও, তারপর ওদের হাঁটতে বললে হাঁটবে, দৌড়াতে বললে দৌড়াবে। লাফাতে বললে লাফাবে। ঠিক নয় কি?
হয়তো ঠিক।
হয়তো বলছ কেন? তোমার মনে সন্দেহ আছে?
জ্বি-না স্যার।
গুড। সন্দেহ থাকা উচিত নয়। রফিক।
জ্বি স্যার।
তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আমি বেরুব। গ্রামটি ভালোমতো ঘুরে দেখতে চাই।
ঠিক আছে স্যার।
মনে হয় দেখার মতো ইণ্টারেস্টিং অনেক কিছুই আছে এ-গ্রামে।
কিছুই নেই স্যার। এটা একটা দরিদ্র গ্রাম।
রাজাকাররা মনা আর তার ভাইটিকে ঠেলে পানিতে নামিয়ে দিল। বিরু তার ভাইয়ের কোমর জড়িয়ে ধরে আছে। সে কাঁপছে থরথর করে। মনা এক হাতে তার ভাইকে ধরে আছে।
রাইফেল তাক করা মাত্র বিরু চিৎকার করতে লাগল, দাদা, বড় ভয় লাগে। ও দাদা, ভয় লাগে। মনা মৃদু স্বরে বলল, ভয় নাই। আমারে শক্ত কইরা ধর। বিরু প্রাণপণ শক্তিতে ভাইকে আঁকড়ে ধরল।
ইমাম সাহেব গুলি হবার সময়টাতে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। এবং তার পরপরই মুখভর্তি করে বমি করলেন। আজিজ মাস্টার সমস্ত ব্যাপারটি চোখের সামনে ঘটতে দেখল। এক পলকের জন্যেও দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল না।
১১.
আলো মরে আসছে।
আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। মেজর সাহেব আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, কি রফিক, বৃষ্টি হবে?
হতে পারে। এটা ঝড়বৃষ্টির সময়।
তোমার দেশের এই ঝড়বৃষ্টিটা ভালোই লাগে।
রফিক মৃদু স্বরে বলল, তোমার দেশ বললেন কেন? মেজর সাহেব ও গুরু দৃষ্টিতে তাকালেন। কিছু একটা বলতে গিয়েও বললেন না।
কোথাও কোনো শব্দ নেই। যেন গ্রামে কোনো জনমানুষ নেই। মেজর সাহেব হাতা গলায় বললেন, মানুষকে ভয় পাইয়ে দেবার একটা আলাদা আনন্দ আছে। আছে না?
রফিক জবাব দিল না। মেজর সাহেব বললেন, মানুষের ইনসটিংটের মধ্যে এটা আছে। অন্যকে পায়ের নিচে রাখার আকাঙ্খা। তোমার নেই?
না।
আছে, তোমারও আছে। সবারই আছে। থাকতেই হবে।
রফিক কিছু বলল না। তারা হাঁটছে পাশাপাশি। মেজর সাহেব কথা বলছেন বন্ধুর মতো। তাঁর কথার ধরন দেখে মনে হয় রফিককে তিনি যথেষ্ট গুরুত্ব দেন।
বদিউজ্জামানের বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার সময় মীর আলি তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, কেড়া যায়? কেড়া যায়, জয়নাল মিয়া?
মেজর সাহেব থমকে দাঁড়ালেন। রফিক বলল, লোকটা স্যার অন্ধ। মেজর সাহেবকে মনে হল এই খবরে বেশ উৎসাহিত বোধ করছেন।
কে লোকটি, কথা বলে না? কে গো?
আমি রফিক।
রফিকটা কেডা? কোন বাড়ির?
ঘরের ভেতর গিয়ে বসেন চাচা।
মেজর সাহেব ঠাণ্ডা গলায় বললেন, তুমি ওকে কী বললে? রফিক ইংরেজিতে বলল, আমি তাঁকে ঘরে যেতে বললাম।
কেন
এমনি বললাম।
মীর আলি ভয় পাওয়া গলায় চেঁচাল, এরা কে? এরা কে? মেজর সাহেব বললেন, তুমি ওকে বল আমি মেজর এজাজ আহমেদ, কমান্ডিং অফিসার ফিফটি এইটথ ইনফেন্ট্রি ব্যাটালিয়ান।
স্যার, বাদ দেন। বুড়ো মানুষ।
তোমাকে বলতে বলেছি, তুমি বল। যাও, কাছে গিয়ে বল।
রফিক এগিয়ে গেল। মেজর সাহেব তাকিয়ে রইলেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। তিনি কি বুড়োর চোখেমুখে কোনো পরিবর্তন দেখতে চাচ্ছিলেন? কোনো রকম পরিবর্তন অবশ্যি দেখা গেল না। রফিক ফিরে আসতেই মেজর সাহেব বললেন, তুমি এই অন্ধ বুড়োকে বল, মেজর সাহেব আপনাকে সালাম জানাচ্ছেন।
রফিক তাকিয়ে রইল। মেজর সাহেব বিরক্ত স্বরে বললেন, দাঁড়িয়ে আছ কেন, যাও। রফিক এগিয়ে গেল। বুড়ো মীর আলি কিছুই বলল না। মাথা নিচু করে বসেই রইল।
আকাশে মেঘ জমছে। প্রচুর মেঘ। কালবৈশাখী হবে নিশ্চয়ই। তারা হাঁটছে নিঃশব্দে। রফিক একটি সিগারেট ধরিয়েছে। মেজর সাহেব তাকে মাঝে-মাঝে লক্ষ করছেন।
রফিক!
জ্বি স্যার।
তুমি তো জানতে চাইলে না আমি ওকে সালাম জানালাম কেন। জানতে চাও না?
রফিক কিছু বলল না।
রেশোবা গ্রামে আমার যে বৃদ্ধ বাবা আছেন, তিনি অন্ধ। তিনিও বাড়ির উঠোনে এই বুড়োটির মতো বসে থাকেন। পায়ের শব্দ পেলেই এই বুড়োটির মতো বলেন, ইয়ে কৌন?
পথিবীর সব জায়গার মানুষই আসলে এক রকম।
কথাটি কি তুমি বিশেষ কোনো কারণে বললে?
না, কোনো বিশেষ কারণে বলি নি।
রফিক, আমরা একটা যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছি। সারভাইভালের প্রশ্ন। এই সময়ে অন্যায় কিছু হবেই। উল্টোটা যদি হত–ধর বাঙালি সৈন্য আমার গ্রামে ঠিক আমাদের মতো অবস্থায় আছে, তখন তারা কী করত? বল, কী করত তারা? যে, অন্যায় আমরা করছি তারা কি সেগুলি করত না?
না।
না? কী বলছ তুমি! যুক্তি দিয়ে কথা বল। রাগ, ঘৃণা, হিংসা আমাদের মধ্যে আছে, তোমাদের মধ্যেও আছে।
রফিক হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। হাত ইশারা করে বলল, এরা ডেডবডিটা এখনো সরায় নি। মেজর সাহেব দেখলেন দরজার পাশে বুড়োমতো একটি লোক কাত হয়ে পড়ে আছে। নীল রঙের বড়-বড় মাছি ভনভ্ন করে উড়ছে চারদিকে।
স্যার, এই লোকটির নাম নীলু সেন।
এর কি কোনো আত্মীয়স্বজন নেই? এভাবে ফেলে রেখেছে কেন?
রফিক গলা উঁচিয়ে ডাকল, বলাই, বলাই। কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।
কাকে ডাকছিলে?
বলাইকে। ওর ছেলে কিংবা এ-রকম কিছু। এরা দু জল এই বাড়িতে থাকে।
এত বড় একটা বাড়িতে দুটিমাত্র প্রাণী থাকে?
এখন থাকে একটি।
রফিক।
জ্বি স্যার।
আমার মনে হয় তুমি সূক্ষ্মভাবে আমাকে কিছু বলবার চেষ্টা করছ।
