ওনার পীর আছে নাকি?
সব পয়সাওয়ালা মানুষের একজন পীর-ফকির আছে। রাস্তার কোনো ভিক্ষুককে শুনবেন না সে পীরের মুরিদ। যে কোনো কোটিপতির কাছে যান শুনবেন তিনি পীরের মুরিদ।
স্যার কি কোটিপতি?
কোটি টাকা এখন কোনো টাকাই না। সারের যে টাকা ব্যাংকে জমা আছে তার ইন্টারেস্টই আসে কয়েক কোটি। ওনার টাকা নিয়ে আলাপ করে আমাদের কোনো লাভ আছে? আমার লাভ নাই। আমরা গরুর লেজ। মাছি তাড়ায়ে তাড়ায়ে জীবন শেষ। এই লোক মানুষ হয়েছে এতিমখানায়। কে তার বাপ কে তার মা কিছুই জানে না। বিশ্বাস হয়?
শফিক চুপ করে রইল। সোবাহান সাহেব বললেন, ওনার টাকা-পয়সার হিসাব করে দুইজন চার্টার্ড একাউন্টেট। চারজন ক্যাশিয়ার। কি অবিশ্বাস্য কথা!
আপনি কি চারজন ক্যাশিয়ারের একজন?
আরে দূর দূর। আমি হলাম গুহ্যদ্বারের ক্যাশিয়ার। আমি এইখানকার খরচের হিসাব রাখি। আসল লোকজন বসে মতিঝিলে হেড অফিসে। আপনার বেতন হবে আমার এখান থেকে। ভালো কথা, চাকরির শুরুর প্রথম মাসের বেতন অ্যাডভান্স দেয়া হয়। এটা স্যারের নিয়ম। এই টাকা মাসে মাসে কেটে রাখা হয়। আপনি মনে করে আজ যাওয়ার সময় বেতন নিয়ে যাবেন।
শফিক বিস্মিত হয়ে বলল, পুরো বেতন?
অবশ্যই। এখানে চাকরির মজা আছে। কাজকর্ম কিছু নাই এইটাই সমস্যা। ভাই আমি উঠি। আমজাদ সাহেবের খবর নেই।
ওনার কি হয়েছে?
বমি টমি করে একাকার। এখন শুয়ে আছেন। মাথায় পানি দিচ্ছে। মনে হয় ডাক্তার ডাকা দরকার।
সব মিলিয়ে কতবার উঠবোস হয়েছে? স্যার জানতে চেয়েছেন এই জন্যে জিজ্ঞাস করছি।
এগজাক্ট ফিগার আপনাকে জেনে বলছি। সতেরোশর ওপর হয়েছে। ওনার সঙ্গে কি আপনার দেখা হয়েছে?
জি না।
একবার দেখা করবেন। লোক কিন্তু ভালো। আপনার কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। এখন আপনার ঘরেই শুয়ে আছেন। এই ঘরটা তার ছিল। চাকরি চলে যাওয়ার পর আপনাকে দেয়া হয়েছে।
ঘর অন্ধকার। দুটা জানালার পর্দা টানা। আমজাদ আলি লম্বালম্বি হয়ে শুয়ে আছেন। চোখ বন্ধ। মুখ হাঁ করে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। মাথা ভেজা। মাথায় তোয়ালে জড়ানো। কিছুক্ষণ আগেই মাথায় পানি দেয়া বন্ধ হয়েছে। পানির বালতি এখনো সরানো হয়নি। শফিকের পায়ের শব্দে তিনি চোখ মেললেন। ফ্যাসফ্যাস গলায় বললেন, কে?
আমার নাম শফিক। শফিকুল করিম।
ভাই সাহেব আপনাকে চিনেছি। আপনি স্যারের নতুন ম্যানেজার। ভালো আছেন?
জি ভালো আছি।
আমার অবস্থা কাহিল। বমি করে বারান্দা ভাসায়ে ফেলেছি। ভাই সাহেব বসেন, দাড়ায়ে আছেন কেন?
শফিক বসল। আমজাদ আলি বললেন, আপনার ঘর দখল করে বসে আছি কিছু মনে নিবেন না।
কোন অসুবিধা নাই। আপনার কি জ্বর। শরীর কাঁপছে।
শীত শীত লাগছে। জ্বর কিনা বুঝতে পারছি না।
গায়ের ওপর একটা চাদর কি দিয়ে দেব?
আমজাদ আলি ব্যাকুল হয়ে বললেন, চাদর-টাদর কিছু আপনাকে দিতে হবে। কাউকে ডাক দিয়ে বলেন দিয়ে দিবে।
শফিক তার কপালে হাত দিল। জ্বর ভালোই আছে।
মবিনুর রহমান তাঁর শোবার ঘরে। ফুট রেস্টে পা তুলে গভীর মনোযোগে টিভি দেখছেন। টিভি দেখছেন বলা ঠিক হবে না, টিভিতে ছবি দেখছেন। সউিন্ড অফ করা। হিন্দি কোনো সিনেমা হচ্ছে। পাত্র-পাত্রীরা সবাই দীর্ঘ ডায়লগ বলছে। সবার চোখেই পানি। মবিনুর রহমানকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি পাত্র-পাত্রীদের ঠোঁট নাড়া দেখে ডায়লগ ধরার চেষ্টা করছেন। তিনি টিভি থেকে চোখ না সরিয়ে ডাকলেন, বাবুল।
শফিক জি স্যার বলে ঘরে ঢুকল।
তিনি তার দিকে তাকালেন না। সিনেমায় যে দৃশ্যটা চলছে সেটা শেষ হবার জন্যে অপেক্ষা করলেন। শফিক বলল, স্যার কিছু লাগবে?
তিনি হালকা গলায় বললেন, তোমার হাত কি পরিষ্কার আছে?
জি স্যার পরিষ্কার।
পরিষ্কার থাকলেও একটা কাজ করো বাথরুমে যাও, সাবান দিয়ে হাত ভালো করে ধুয়ে এসে আমার পায়ে ক্রিম লাগিয়ে দাও। আমার সামান্য ডায়াবেটিসের মতো আছে। ডায়াবেটিসে পায়ের যত্ন নিতে হয়। তুমি যেটা করবে সেটা হলো হালকা করে ম্যাসাজ করবে। আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে ক্রিম দেবে।
শফিক অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তার কি করা উচিত সে বুঝতে পারছে। ইংরেজি সাহিত্যে তার এমএ ডিগ্রি আছে। ভাইবা পরীক্ষায় এক্সটারনাল এগজামিনার বললেন, আমি একজন বিখ্যাত কবির নিজের লেখা এপিটাফের দুটা লাইন বল। তুমি যদি কবির নাম বলতে পারো তাহলে তোমাকে ভালো নাম্বার দেব। এমনিতেও তুমি ভালো করেছ তারপরেও সুন্দর সুযোগ পেলে। দেখি সুযোগটা কাজে লাগাতে পার কিনা—
I would have written of me on my stone
I had a lovers quarrel with the world.
এই লাইন দুটা কোন কবির লেখা?
শফিক বলল, রবার্ট ফ্রস্ট।
ভাইবায় সে সত্তর পারসেন্ট নাম্বার পেয়েছিল। থিওরি আরেকটু ভাল করলে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে যেত। সে মাস্টারি করত ইউনিভার্সিটিতে। ছাত্রছাত্রীদের সাহিত্য পড়াতো। এসথেটিকস শেখাতো। তাদের সঙ্গে একটি মেয়েই ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল, সে ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করেছে।
মবিনুর রহমান তার ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। তিনি মনে হয় কিছু বুঝার চেষ্টা করছেন। শফিকের কাছে এখন তাকে তার এমএ পরীক্ষার ভাইবা বোর্ডের চেয়ারম্যানের মতো লাগছে। যিনি কখনো কাউকে কোনো প্রশ্ন করেননি। যার একমাত্র কাজ ছিল ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে থাকা।
বাবুল?
জি স্যার।
তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে আমার পায়ে ক্রিম মাখিয়ে দিতে তোমার কিছু আপত্তি আছে। তোমার বাবার পায়ে তুমি কখনো হাত বুলিয়ে দাওনি?
