একদিন ফিরে দেখলাম কেমন লাগে। আয়, ভেতরে আয়। তোকে তো কখনও সন্ধ্যার পর ছাদে দেখা যায় না। আজ কি মনে করে?
তোমার কাছে একটা আবেদন নিয়ে এসেছি, ছোট চাচা।
আবেদন গ্রান্টেড।
না শুনেই গ্রান্ট করে দিলে?
হুঁ। আজ আমার মনটা ভালো। এইজন্যই পেয়ে গেলি।
মন ভালো কেন?
এখন বলব না। যথাসময়ে বলব। আবেদনটা কি?
আমার এক বান্ধবী এসেছে–রাতে আমার সঙ্গে থাকবে। তুমি কি আজ রাতে তোমার ঘরটা আমাদের ছেড়ে দেবে।
একি! তুই দেখি রাজত্ব চেয়ে ফেললি। ঘরটাই আমার রাজত্ব।
শুধু এক রাতের জন্য চেয়েছি।
নিজের ঘর ছাড়া অন্য কোনো ঘরে আমার এক ফোঁটা ঘুম হয় না। যাই হোক বেকুবের মতো আগেই যখন গ্রান্টেড বলে দিয়েছি তখন গ্রান্টেড। এক্ষুনি ঘর ছেড়ে দিচ্ছি।
রাত বারোটার সময় ছাড়লেই হবে। ছোট চাচা, থ্যাংক য়্যু। তুমি এবারে অবশ্যই আমেরিকার ভিসা পাবে। আমি সত্যি সত্যি তোমার জন্য দোয়া করব।
জাহেদুর রহমান বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল, ড্রয়ারে হাত দিবি না। টেবিলের উপর কাগজপত্র আছে, ঘাটাঘাটি করবি না।
কোনো কিছুতেই আমরা হাত দেব না।
গুড।
.
রাত একটার দিকে লিলি স্বাতীকে নিয়ে ছাদে এলো। চিলেকোঠার কাছে এসে স্বাতী। থমকে দাঁড়াল। অবাক হয়ে বলল, তোদের ছাদের এই ঘরটা তো সুন্দররে। কে। থাকে এখানে?
আমার ছোট চাচা?
বাহ্, ঘরটাও তো খুব গোছানো। শুধু একটাই সমস্যা ব্যাচেলার ব্যাচেলার গন্ধ।
লিলি বলল, রাতে আমরা এই ঘরে ঘুমুব।
স্বাতী বলল, ঘুমুবার জন্য তোর এখানে এসেছি না-কি? ঘুমুব না। আমার যা ঘুমানোর ঘুমিয়ে ফেলেছি। ছাদে বিছানা করতে বলেছিলাম, করিস নি?
করেছি। ঐ কোনায়।
বাহ সুন্দর তো! অসাধারণ।
একটা শীতল পাটি বিছিয়েছি শুধু–অসাধারণের কি!
এইটাই অসাধারণ। ছাদের উপর শীতল পাটি মানায়, গদির বিছানা মানায় না। বালিশ কোথায়?
ছোট চাচার ঘর থেকে নিয়ে আসছি।
উহু-ব্যাচেলার গন্ধওয়ালা বালিশে আমি ঘুমুব না। তুই তোর ঘর থেকে বালিশ নিয়ে আয়। ফ্লাস্কভর্তি করে চা আনতে বলেছিলাম, এনেছিস?
আমাদের ফ্লাক্স নেই।
বলিস কি, তোদের ফ্লাক্স নেই?
লিলি হাল্কা গলায় বলল, আমাদের কিছুই নেই।
চা ছাড়া সারারাত জাগব কীভাবে?
তোর যখন চা খেতে ইচ্ছা করবে বলবি, ছোট চাচার ঘরে ওয়াটার হিটার আছে, টি ব্যাগ আছে। চা বানিয়ে দেব।
দেয়াশলাই আনবি। সিগারেট খেতে হবে। তুই আবার না না করে ঢং করতে পারবি না। তুইও খাবি।
লিলি এবং স্বাতী পাটিতে শুয়ে আছে। মাথার উপর তারা ভরা আকাশ। স্বাতী বলল, তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকবি। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে না, সাধারণভাবে। তারার দিকে তাকিয়ে গল্প করতে থাকবি।
কী গল্প?
যা মনে আসে।
লিলি বলল, তুই আমার গল্প শোনার জন্য এত যন্ত্রণা করে আমার সঙ্গে শেয়ার ব্যবস্থা করেছিস তা কি ঠিক? তুই এসেছিস তোর গল্প বলার জন্য। কী বলতে চাস বল, আমি শুনছি।
স্বাতী নিচু গলায় বলল, হাসনাতকে যখন বললি–আমি আসব না তখন সে কী বলল?
টেলিফোনে তো একবার বলেছি।
আবার বল। টেলিফোনে কি বলেছিস আমার মনে নেই। উনি কিছুই বলেন নি।
কিছুই না?
না।
ভালো করে ভেবে বল। হয়তো কিছু বলেছে।
বলেছেন–ও আচ্ছা।
সেই ও আচ্ছাটা কিভাবে বলল?
ও আচ্ছা বাক্যটা অনেকভাবে বলা যায়। হাই ড্রামা করে বলা যায়, গভীর বিষাদের সঙ্গে বলা যায়, রাগের সঙ্গে বলা যায়। ও কীভাবে বলল?
খুব সাধারণভাবে বলেছেন।
স্বাতী নিশ্বাস ফেলে বলল, আমার ধারণা ওর মধ্যে ড্রামা কম। আবেগ আছে–তবে তা আইসবার্গের মতো। চোখে পড়ে না।
লিলি শান্ত গলায় বলল, একজন ভদ্রলোকের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠভাবে মিশলি, সারারাত জেগে তারা দেখলি, বিয়ে ঠিকঠাক করলি, তারপর হুট করে সব ভেঙে দিলি?
স্বাতী বলল, আমার চায়ের পিপাসা হচ্ছে।
তুই আমার প্রশ্নের জবাব দিস নি।
প্রশ্ন কোথায়? প্রশ্ন না করলে জবাব দেব কী? বল, তোর প্রশ্ন বল।
বিয়ে সত্যি সত্যি পুরোপুরি ভেঙে গেছে?
হুঁ।
কেন?
আমি ঠিক যে রকম মানুষ চাচ্ছি সে রকম মানুষ ও না।
তুই কী রকম মানুষ চাচ্ছিস?”
ব্যাখ্যা করতে পারব না।
উনি যে সে রকম মানুষ না সেটা বুঝলি কী করে? মানুষ বুঝতেও তো সময় লাগে।
তাকে সময় দিয়েছি। এত ঘনিষ্ঠভাবে তার সঙ্গে যে মিশলাম, কেন মিশলাম? তাকে ভালোমতো জানার জন্যই মিশলাম। লিলি চা খাব।
লিলি চা বানানোর জন্য উঠে গেল। স্বাতী শুয়ে শুয়ে তারা দেখছে। ঐ রাতের মতো হচ্ছে না, তারাগুলো ঝট করে চোখের উপর নেমে আসছে না। কে জানে আকাশের তারা নামানোর জন্য একজন প্রেমিক পুরুষ হয়তো দরকার হয়।
লিলি চা নিয়ে এসেছে। স্বাতী উঠে বসতে বসতে বলল, দেয়াশলাই এনেছিস?
লিলি দেয়াশলাই সামনে রাখল।
স্বাতী বলল, তুই দেয়াশলাইটা এমনভাবে ছুঁড়ে ফেললি যেন আমি দেয়াশলাই দিয়ে ভয়ঙ্কর কোনো পাপ করতে যাচ্ছি। তা কিন্তু করছি না। আমি অতি নিরীহ একটা সিল্ককাট সিগারেট আগুন দিয়ে পুড়াব। তুইও পুড়াবি।
আমি না।
আচ্ছা লিলি, তোর মধ্যে কি কৌতূহল বলে কিছু নেই? এই যে হাজার হাজার ছেলে, বুড়ো, জোয়ান ধুমসে সিগারেট খাচ্ছে, কায়দা করে ধোঁয়া ছাড়ছে–ব্যাপারটা কি একবার জানারও ইচ্ছা হয় না?
না।
এই যে আমি সিগারেট টানছি, আমাকে দেখেও ইচ্ছা হচ্ছে না?
না।
থাক তাহলে, জোর করব না। খুব মানসিক চাপের মধ্যে আছি। ভেবেছিলাম তোর সঙ্গে রাত জেগে, হইচই করে, সিগারেট টেনে চাপটা কমাব। তোর কাছে আসায় লাভের মধ্যে লাভ এই হয়েছে মনের চাপটা বেড়েছে। তুই তোর সুন্দর মুখ শ্বেতপাথরের মূর্তির মুখের মতো করে রেখেছিস। আমার সঙ্গে এ-রকম আচরণ করছিস যেন আমি সিন্দাবাদের ভূত হয়ে তোর ঘাড়ে চেপে আছি। শুনুন ইয়াং লেডি, আমি কোনো সিন্দাবাদের ভূত না। আমি কারোর ঘাড়ে চাপি না।
