লিলি আজ স্বাতীদের বাড়িতে ঢুকল ভয়ে ভয়ে। স্বাতীর বাবা নাজমুল সাহেবের সঙ্গে যদি দেখা হয়ে যায়। যদি তিনি বলেন এত সেজেগুজে বের হয়েছ কী ব্যাপার? তাহলে লিলি কী বলবে? তাঁকে নিশ্চয়ই বলা যাবে না–আজ আপনার মেয়ে গোপনে বিয়ে করবে। আমি তাকে নিতে এসেছি।
লিলি কিছু না বললেও একদিন তো সব জানাজানি হবে। তখন যদি লিলির সঙ্গে তার দেখা হয় এবং তিনি বলেন–মা, তোমাকে এত স্নেহ করি আর এত বড় একটা ঘটনা সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছুই বললে না? এটা তো মা তোমার কাছ থেকে আশা করি নি।
নাজমুল সাহেব বসার ঘরের বারান্দায় মাদুর পেতে বসেছেন। কেরোসিন কাঠ দিয়ে বক্সজাতীয় কি যেন বানাচ্ছেন। কাঠমিস্ত্রীদের মতো তাঁর কানে পেনসিল গোঁজা। হাতে ছোট্ট একটা করাত। লিলিকে দেখে তিনি হাসিমুখে বললেন, কেমন আছ গো লিলি মামণি?
লিলি বলল, ভালো। কী বানাচ্ছেন চাচা?
আগে বলব না। বানানো হোক তারপর সবাইকে চমকে দেব।
স্বাতী কি বাসায় আছে?
হ্যাঁ আছে। মেয়েটির কোনো সমস্যা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। খুব অস্থির। অকারণে একবার দোতলায় যাচ্ছে–একবার নামছে। সকালে নাশতা খায় নি–শরীর নাকি ভালো না। তোমাদের কি কোথাও যাবার কথা?
স্বাতী জবাব দিল না। তার বুক ঢিপ ঢিপ করছে। বেশিক্ষণ জেরা করলে সত্যি কথা বলে ফেলবে। নাজমুল সাহেব বললেন, সোজা দোতলায় উঠে যাও মা। ও ঘণ্টাখানেক ধরে দোতলার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। যাবার আগে আরেকটা কাজ করতে পারবে মা?”
অবশ্যই পারব।
রান্নাঘরে গিয়ে তোমার চাচিকে বলো আমাকে এক কাপ চা দিতে। কড়া করে যেন বানায়।”
লিলি রান্নাঘরের দিকে রওনা হলো। স্বাতীর মা রওশন আরা লিলির দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসলেন যেন লিলি তারই একটা মেয়ে। অন্যের মেয়েদের দিকে এমন আপন করে তাকানো যে কত বড় গুণ তা-কি এই মহিলা জানেন?
লিলি বলল, চাচি খুব কড়া করে এক কাপ চা চাচাকে দিন।
রওশন আরা বললেন, আচ্ছা দিচ্ছি। তোমাকে দূত হিসেবে পাঠিয়েছে বলেই দিচ্ছি। তোমার চাচার চা নিষেধ হয়ে গেছে। ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। চিনি একেবারেই বন্ধ। আর এদিকে তার ঘনঘন চা খাবার অভ্যাস। শুধু লিকার হলে কথা ছিল–একগাদা চিনি দিয়ে চা বানাতে হয়।
বাজারে স্যাকারিন জাতীয় কি নাকি পাওয়া যায় চাচি?
পাগল হয়েছ, তোমার চাচা খাবে স্যাকারিনের চা? মুখে দিয়েই থু করে ফেলে .বে না? দিয়ে দেখেছিলাম। লিলি তুমি কী খাবে বলো?
আমি কিছু খাব না চাচি।
বললেই হবে? তুমি আজ সারাদিন থাকো। দুপুরে খেয়েদেয়ে তারপর যাবে। স্বাতীর কি হয়েছে তুমি কিছু জানো লিলি?
লিলি শঙ্কিত গলায় বলল, কেন চাচি।
ও কাল রাত থেকে কেমন ছটফট করছে। সকালেও কিছু খায় নি। আমাকে কিছু বলল না। তুমি জিজ্ঞেস করো তো ব্যাপার কী?
আচ্ছা চাচি, আমি জিজ্ঞেস করব।
লিলি দোতলায় উঠে গেল। দোতলার টানা বারান্দার শেষ মাথায় স্বাতী দাঁড়িয়ে আছে। লিলিকে তার দিকে আসতে দেখেও সে সিউল না। যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিল সেভাবে দাঁড়িয়ে রইল। লিলি যখন ডাকল, এই স্বাতী! তখনই সে নড়েচড়ে উঠল। তীক্ষ্ণ গলায় বলল, তুই এত সুন্দর শাড়ি কবে কিনলি? আগে দেখি নি তো? তোকে অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে কুইন অব সেবা।
লিলি হকচকিয়ে গেল। স্বাতীর ব্যাপারটা সে বুঝতে পারছে না। কেমন পাগলি-পাগলি চেহারা। মনে হচ্ছে দুদিন চুলে চিরুনি দেয় নি, চুল জট ধরে আছে। চোখের নিচে কালি। কিছুক্ষণ আগে মনে হয় পান খেয়েছে। দাঁত লাল হয়ে আছে। পরে আছে সাধারণ একটা শাড়ি। লিলি বলল, তুই এখনও রেডি হোস নি? সাড়ে এগারোটা বাজে। আমাদের না বারোটার মধ্যে যাবার কথা?
স্বাতী এমনভাবে তাকাল যেন লিলির কথা বুঝতে পারছে না। সে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, মিষ্টি পান খাবি লিলি? আমার ছোট মামা কলকাতা থেকে এক গাদা মিষ্টি পান প্যাকেট করে নিয়ে এসেছে। আচ্ছা বল দেখি মিষ্টি পান কোনো আনার জিনিস? আমি অবশ্যি একটার পর একটা পান খেয়ে যাচ্ছি। দেখ, পান খেয়ে দাঁতের কী অবস্থা করেছি।
লিলি বলল, তোর ব্যাপারটা কী? আজ না তোর বিয়ে। ভুলে গেছিস?
স্বাতী হাসল। লিলি বলল, এ রকম অদ্ভুত করে হাসছিস কেন?
একটা ব্যাপার হয়েছে। আয় ঘরে আয়, বলছি।
স্বাতী হাত ধরে লিলিকে তার ঘরে নিয়ে গেল। চাপা গলায় বলল, চুপ করে বোস। আমি আসছি। এক্ষুনি আসছি। তোকে এই শাড়িটাতে দারুণ লাগছে। দাম কত নিল? এক হাজারের উপরে নিশ্চয়ই।
পনেরো শ।
দাম বেশি নিয়েছে। তবু সুন্দর। আমায় গায়ের রঙ তোর মতো ফর্সা হলে আমিও কিনতাম।
তোর ব্যাপারটা কি আগে শুনি।
স্বাতী প্রায় ফিসফিস করে বলল, আমি ঠিক করেছি যাব না।
কখন ঠিক করলি?
কাল রাতে। ঠিক এগারোটার সময়। সারারাত আর ঘুম হয় নি। তাকিয়ে দেখ এক রাতে চোখে কালি পড়ে গেছে। সকালে এমন মাথা ঘুরছিল, মনে হচ্ছিল পড়ে যাব।
হঠাৎ এ-রকম ডিসিশান নিলি কেন?
স্বাতী আঙুল দিয়ে শাড়ি পেঁচাচ্ছে। খুব যেন অস্বস্তিতে পড়ে গেছে।
কথা বলছিস না কেন?
মন স্থির করতে পরছি না।
বিয়ে পিছিয়ে দিচ্ছিস?
স্বাতী জবাব দিল না। আঙুলে চুলের জট সারাবার চেষ্টা করতে লাগল। লিলি বলল, উনাকে জানিয়েছিস?
কাকে? হাসনাতকে?
হুঁ।
না।
উনি তো বসে অপেক্ষা করতে থাকবেন।
স্বাতী বলল, দাঁড়া তোর জন্য মিষ্টি পান নিয়ে আসি।
