তুই শালা রসিক আছিস। চা খাবি?
না।
এরা আফিং দিয়ে চা বানায়—খেয়ে দেখ এক কাপ। নেশা লেগে যাবে।
আফিং দিয়ে চা বানায় মানে?
কী-একটা যেন দেয়, খালি খেতে ইচ্ছা করে। আমি একবার পরপর আট কাপ চা খেয়েছি। তারপর দেখি মাথা ঘুরছে।
আবার মিথ্যা কথা বলছিস?
মিথ্যা বলব কেন?
তোর সামনেই তো এক কাপ চা পড়ে আছে। মুখেই তুলিস নি বলে মনে হচ্ছে।
মনটা ভালো নেই দোস্ত। মলিনার জন্যে খারাপ লাগছে। খুবই খারাপ লাগছে।
মলিনা কে?
ধরা পড়েছে আমাদের সাথে। বড় ভালো মেয়ে। কী রকম ঠাণ্ডা চেহারা। চোখগুলির উপর ছায়া পড়ে আছে, এরকম মনে হয়। আর গলার স্বর কী যে অদ্ভুত। শুধু শুনতে ইচ্ছে করে। অল্প কিছুক্ষণ ওর কথা শুনলে নেশা ধরে যায়, মনে হয় খালি কথাই শুনি।
তুই তো দূরে দাঁড়িয়ে দরদাম করা দেখছিলি। এত কথা শুনলি কখন?
হাজতে কথা হয়েছে।
হাজতে তো যতদূর জানি ছেলেদের আর মেয়েদের আলাদা-আলাদা রাখে।
মাসুম চুপ করে রইল। ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
উঠি রে মাসুম। বাসায় যা, তোর মামা মনে হচ্ছে পেরেশান। বাসায় গিয়ে ভাতটাত খা।
মাসুম আমার সঙ্গে-সঙ্গে এল। নিচু গলায় বলল, এই কদিন আর কোথাও বেরুবটেরুব না। ভাইভার ডেট দিলে জানাবি। শিগগির দেবে নাকি?
দিয়ে দিয়েছে।
দিয়ে দিয়েছে মানে?
দিয়ে দিয়েছে মানে দিয়ে দিয়েছে। সাত, আট, নয়।
সে কী? তাহলে তো আন্দোলন করতে হয়।
কি আন্দোলন?
পরীক্ষা পেছানোর অন্দোলন। পাশ করে করবটা কী? বেকার হবার চেয়ে ছাত্র থাকা ভালো না? কত রকম ফেসিলিটি।
কি ফেসিলিটি?
মাসুম জবাব দিল না। বাস-স্ট্যান্ডে দুজন খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। মোটামুটি ফাঁকা বাস একটা দাঁড়িয়েছিল। সেটায় উঠলাম না। কেন উঠলাম না কে জানে। পরের বাসটায় হয়তো গাদাগাদি ভিড় থাকবে। ঠেলাঠেলি করে তাতেই উঠব। আমরা সবাই কেমন অন্যরকম হয়ে গেছি। শুধু উল্টো কাজ করতে ইচ্ছা করে।
একটা মিছিল যাচ্ছে। নির্জীব ধরনের মিছিল। কোনোরকম উৎসাহ-উত্তেজনা নেই। কার চামড়া যেন তুলে নিতে চাচ্ছে, কিন্তু এমনভাবে বলছে যেন চামড়া তুলে নেয়াটা একটা আরামদায়ক ব্যাপার। মিছিলের পেছনে-পেছনে একটা পুলিশের গাড়ি। গাড়ির জানালায় মোটাসোটা একজন পুলিশ অফিসারের মুখ। ভদ্রলোককে খুবই ক্লান্ত মনে হচ্ছে। হাই তুলছেন।
মাসুম।
বল।
এশার সঙ্গে কি তোর ইদানীং দেখা হয়েছে?
পরশু হয়েছে।
ওর খবর কি বল তো?
খবর কিছু জানি না। সিরাজের সঙ্গে খুব খাতির জমিয়েছে।
সিরাজটা কে?
মালদার পার্টি, এশার একটা কবিতার বই বের করে দিয়েছে।
তাই নাকি?
হুঁ। আমার কাছে এক কপি বেচতে নিয়ে এসেছিল। পুশিং সেল। আমি বললাম–মাগনা দিলেও আমি এই বই নেব না।
সত্যি বই বের করেছে?
হুঁ।
আমার তো মনে হয় তুই আবার মিথ্যা কথা বলছিস।
মাঝে-মাঝে সত্যি কথাও বলি।
বইটার নাম কি?
নাম জানি না। আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।
মাসুম আগ্রহ নিয়ে মিছিলের দিকে তাকাচ্ছে। মিছিল দেখলেই সে এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করে। এখনো করছে সম্ভবত। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে ঢুকে পড়বে।
মাসুম পিচ করে এক দল থুথু ফেলে বলল, মাদি মার্কা একটা মিছিল বের করেছে। নেতাটাকে দেখছিস? পান খাচ্ছে, আঙুলে আবার চুন। এই শালা মিছিল করবে। কি? কিছু একটা করা দরকার বীরু।
কী করবি?
পুলিশের জীপে দুটা ইটের চাক্কা মারলেই খেল জমে যাবে। আয় না!
পাগল।
দেশটা কেমন ঝিম মেরে গেছে। উত্তেজনা নেই। ফায়ার নেই। ঐ শালা নেতার দিকে তাকিয়ে দে হারামজাদা এখন সিগারেট ধরাচ্ছে—দাঁড়া খেল জমিয়ে দিই। ভেলকি লাগিয়ে দেব। পটকা-ফটকা থাকলে ভালো হত।
আমি উদ্বিগ্ন গলায় বললাম, আমি বাসে উঠে বিদায় হয়ে নিই, তারপর যা ইচ্ছা করিস।
তাড়াতাড়ি চলে যা। হেভি গ্যাঞ্জাম লাগিয়ে দেব।
আমি দ্রুত বাসে উঠে পড়লাম। মাসুম চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে কাণ্ড কিছু একটা করবে। আমার বাস চলে না-যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে কি না কে জানে। আমি বাসের জানালা গলে হাত নাড়লাম। মাসুম দেখল কি না বুঝলাম না, মুখ শক্ত করে আগের মতোই দাঁড়িয়ে রইল। বাস ছেড়ে দিল। দেখতে দেখতে ঝড়ের গতি। প্রতিটি বাস এবং ট্রাকের ড্রাইভাররা সম্ভবত নিয়তিবাদী। যা হবার হবে এই রকম একটা ভাব করে এক্সিলেটার চাপতে থাকে। সামনে বড় রকমের জটলা থাকলে হয়তোবা চোখ বন্ধ করে ফেলে। মতি মিয়া নামের একজন ট্র্যাক ড্রাইভারের সঙ্গে আমার খানিকটা আলাপ আছে। তার কাছে শুনেছি, ঢাকা শহর নাকি একজন কামেল আদমির কন্ট্রোলে আছে। সেই কামেল আদমির হুকুম ছাড়া কিছু হবার উপায় নেই। কাজেই সাবধান হয়ে ট্রাক চালালে যে-কথা, অসাবধান হয়ে চালালেও সেই একই কথা। আকসিডেন্ট হবার হলে হবেই।
সেই কামেল আদমির ঠিকানাও মতি মিয়া জানে। একদিন আমাকে নিয়ে যাবে, এরকম কথা আছে। ভেবে রেখেছি যাব। দেখে আসব। পৃথিবীতে দেখার জিনিসের শেষ নেই। অনেক কিছুই তো দেখলাম, একজন কামেল আদমিও দেখে আসি। মনে-মনে ভদ্রলোকের একটা চেহারাও কল্পনা করে রেখেছি। তিন মণের মধ্যে ওজন (এখন পর্যন্ত কোনো রোগা পীর আমার চোখে পড়ে নি। ঐশ্বরিক ব্যাপার-স্যাপার এবং শরীরের মেদ—এই দুয়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে বলে আমার ধারণা)। ভদ্রলোকের গা থেকে নিশ্চয়ই ভুরভুর করে আতরের গন্ধ বেরুচ্ছে। চোখে সুৰ্মা দেওয়ায় চোখ দুটি দেখাবে কোমল। ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বরও হবে মোলায়েম যাকে বলে সিকি ভয়েস। এঁদের সব কিছুই মোলায়েম থাকে। গলার স্বর মোলায়েম, কথাবার্তা মোলায়েম, শরীর মোলায়েম—শুধু অন্তরটি কঠিন। একাত্তুরে তাই দেখা গেছে।
