শরীর ভালো। বেশি রকম ভালো। এই জন্যেই অফিসে যাই নি। ঠিক করেছি— আজ সারাদিন মজা করব। একটা ক্যাব ভাড়া করে ময়নামতি যাব। ছোটবেলায় একবার ময়নামতি যাবার কথা ছিল, যাওয়া হয় নি। হ্যালো শোন, তুমি কি আমার সঙ্গে ময়নামতি যাবে?
আজ তো যেতে পারব না। আজ আমার ছেলে আসবে।
ভুলে গিয়েছিলাম। আজ পাঁচ তারিখ। ঘর গুছিয়ে রেখেছ?
মোটামুটি গুছিয়েছি।
আমাকে কী জন্যে টেলিফোন করেছ? পুত্রের আগমন সংবাদ দিতে, না অন্য কোনো কারণ আছে?
একটা জরুরি ব্যাপার নিয়ে তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চাই।
আলাপ করো।
ঘটনাটা হলো কাল সন্ধ্যায় আমি বাসায় ফিরে দেখি, দরজার নিচ দিয়ে কে যেন একটা মুখবন্ধ খাম ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে।
খামে কী আছে? প্রেমপত্র?
খামে পাঁচশ টাকার বিশটা নোট। আচ্ছা শোন, টাকাটা কি তুমি দিয়েছ?
আমি? আমি টাকা দেব কোন দুঃখে?
হঠাৎ করে মনে হলো তুমি কি-না। অনেকদিন পরে ছেলে আসছে, এদিকে আমার হাত খালি। তুমি বিষয়টা জানো বলে…।
জনাব শোনেন, আমি মহিলা হাজী মুহম্মদ মহসিন না। আমি অতি কৃপণ এক মহিলা। যে খেয়ে না-খেয়ে টাকা জমায়। কী জন্যে জমায় জানেন, একদিন সে সংসার করবে। সংসারে টুকটাক খরচ করবে। একটা মাইক্রোওয়েভ অভেন কিনবে, একটা প্রেসারকুকার কিনবে, একটা রাইস কুকার…
আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, তোমার শরীর খারাপ। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।
আমি নিজেই জড়িয়ে যাচ্ছি, আমার কথা তো জড়াবেই। কিসে জড়িয়ে যাচ্ছি জিজ্ঞেস করলে না?
কিসে জড়িয়ে যাচ্ছ?
দুঃখজালে জড়িয়ে যাচ্ছি। মানুষ জড়ায় প্রেমজালে, আমি জড়াই দুঃখজালে।
আনিকা, টেলিফোন রাখি?
কেন, এক্ষুণি কি তোমার ছেলেকে আনতে যেতে হবে?
ওকে আনতে যাব বিকেলে।
বিকেল হতে এখনো অনেক দেরি। কিছুক্ষণ কথা বলল।
কী নিয়ে কথা বলব?
কী নিয়ে কথা বলবে তাও আমি বলে দেব? আজকাল দেখি আমার সঙ্গে কথা বলার মতো কোনো টপিকও খুঁজে পাও না। নতুন কোনো অল্পবয়েসীর সঙ্গে কি প্রণয় হয়েছে? তার নাম কী?
তুমি কী সব কথা যে বলো!
অ্যাই শোন, তুমি পঞ্চাশ পৃষ্ঠার বাধানো খাতা জোগাড় কর। সেই খাতায় তুমি এ পর্যন্ত যে কটি মেয়ের প্রেমে পড়েছ, তাদের নাম-ধাম লিখে রাখ। প্রথমে লিখবে নাম। তারপর লিখবে বয়স। তারপর লিখবে কী কারণে প্রেমে পড়লে। সব শেষে লেখা থাকবে কী কারণে প্রেম চলে গেল।
অনিকা আমি রাখি?
আবার অনিকা বলছ? আমার নাম আনিকা। একটা আকার আছে। আচ্ছা ঠিক আছে, এখন থেকে তুমি আমাকে অনিকাই ডাক। অনিকা ডাকার একটা
সুবিধা আছে।
কী সুবিধা?
তুমি তোমার প্রেমিকাদের নাম অ্যালফাব্যাটিলি নিশ্চয় সাজাবে। সেখানে আমার নাম সবার আগে চলে আসবে। আনিকা নাম হলে অনেক পেছনে পরে যাব। প্রথমে স্বরে অ, তারপর স্বরে আ। হ্যালো, টেলিফোন কি রেখে দিলে?
না।
তুমি কতদিন পর আমাকে টেলিফোন করেছ, সেটা জানো?
না জানি না।
ঠিক এক মাস তিন দিন পর। তুমি শেষ টেলিফোন করেছিলে গত মাসের দুতারিখে। আজ পাঁচ তারিখ।
তুমি সব দিন-তারিখ মুখস্থ করে রাখ?
হ্যাঁ রাখি। তোমার সঙ্গে সম্পর্কিত সব কিছু মুখস্থ করে রাখি।
আনিকা শোন, আমি একটা দোকান থেকে টেলিফোন করছি। দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলছি, ওরা নিশ্চয়ই বিরক্ত হচ্ছে।
বিরক্ত হচ্ছে না, ওরা খুশি হচ্ছে। তুমি নিশ্চয়ই ওদের মিনিট হিসেবে টাকা দেবে। তুমি যত বেশি কথা বলো ওদের ততই লাভ। তাছাড়া এখন তোমার কাছে দশ হাজার টাকার বান্ডেল আছে। টাকার সমস্যা নেই। আরো তিন মিনিট কথা বললা। তুমি কি জানো টেলিফোনে তোমার গলার স্বর অদ্ভুত সুন্দর?
জানতাম না। এখন জানলাম।
আমাদের বাসায় গতকাল সন্ধ্যায় ধুন্ধুমার কাণ্ড হয়েছে।
কী কাণ্ড হয়েছে?
ধুন্ধুমার কাণ্ড। মিতুর স্বামী মিষ্টি, কাপড়-চোপড় নিয়ে উপস্থিত। বাবার জন্য পাঞ্জাবি, আমার এবং মার জন্যে শাড়ি।
মিতুর স্বামী মানে? মিতু কি বিয়ে করেছে না-কি?
হ্যাঁ, ও আগস্ট মাসেই বিয়ে করে ফেলেছে। তার স্বামীর কাঠের দোকান আছে। দোকানের নাম Wood king। মিতুর বর হচ্ছে বনের রাজা।
মিতু গোপনে বিয়ে করে ফেলেছে? আশ্চর্য তো!
আশ্চর্য হবার কী আছে! মিতু আমার মতো না। সাহসী মেয়ে।
তোমাদের বাড়ির সবার রিঅ্যাকশান কী? সবাই মেনে নিয়েছেন?
আমি এবং মা, আমরা দুজন খুশি। মা খুশি, কারণ মিতুর বনের রাজার চেহারা সুন্দর। লম্বা-ফর্সা। সে প্রতিটি বাক্যে তিনবার করে বলছে মা। আমি খুশি, কারণ সে আমার জন্যে যে শাড়িটা এনেছে সেই শাড়িটা সুন্দর। কালো মেয়েদের সব শাড়িতে মানায় না। এই শাড়িতে মানাবে। শাড়িটার রঙ হালকা গোলাপি। গোলাপির উপর রুপালি ফুল। তুমি আর্টিস্ট মানুষ। তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছ কালোর সঙ্গে হালকা গোলাপি এবং সিলভার কালার খুব ভালো যায়।
বুঝতে পারছি। তোমার বাবা–উনার রিঅ্যাকশান কী?
বাবার রিঅ্যাকশান যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং। ছেলে চলে যাবার পর বাবা আমাকে ডেকে বললেন–ঐ ছেলে যে পাঞ্জাবিটা এনেছে, সেটা বাথরুমে রেখে আয়। আমি বললাম, কেন? বাবা বললেন, আমি ঐ পাঞ্জাবির উপর পিশাব করব, এই জন্যে। হ্যালো শোন, তিন মিনিট পার হয়েছে। এখন তুমি টেলিফোন নামিয়ে রাখতে পার। যে তোমাকে দশ হাজার টাকা পাঠিয়েছে, তার প্রতি আমি খুবই কৃতজ্ঞ। সে টাকাটা পাঠিয়েছে বলেই তুমি আমাকে টেলিফোন করেছ।
টাকাটা কে দিতে পারে বলো তো? ইমনের মা না তো?
