সুরমা কিছু না বলে রোদ থেকে উঠে এলেন মনে মনে রানুর প্রশংসা করলেন। অন্য কোনো মেয়ে হলে এই অবস্থায় ছেলেকে ফেলে বাজারে যেত না। সে গেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে টগরকে রেখে যাওয়ায় তিনি খুশিই হলেন। এই বিশাল এক তলাটায় হ্রার খুব একা একা লাগে। নিজের মেয়েরা বিয়ের পর কোথায় কোথায় চলে গেছে। কেউ ভুলেও খোঁজ করে না। তিনি এই শূন্যপুরী পাহারা দেন। ভাড়াটেদের সঙ্গে ঝগড়া করেন। প্রতি মাসের তিন তারিখে নিজে ব্যাংকে গিয়ে পাঁচ হাজার টাকা জমা দেন। তার কাজ বলতে এইটুকুই। টগর মাঝে মধ্যে এলে তার ভালোই লাগে। যদিও এটা কাউকে বুঝতে দেন না।
টগর সরু চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি হোত ইশারা করে টগরকে ডাকলেন।
পিয়াস লাগছে নাকি রে?
টগর ভেবে পেল না হঠাৎ করে তার পিয়াস লাগবে কেন? সে মাথা নাড়ল।
পিয়াস লাগলে বল ফান্টা এনে দেব।
লাগে নাই।
লেগেছে। মুখ শুকনা।
সুরমা দু’টি ফান্টার বোতল আনালেন। তাদের দুজনের জন্যে দু’টি। তারপর শুরু করলেন ডাকাতের গল্প। খুব ছোট বেলায় নৌকা করে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটা ডিঙি নৌক তাদের নৌকার কাছাকাছি এসে বলল–আগুন আছে? বিড়ি ধরানির আগুন?
গল্প শুনে টগর মুগ্ধ হয়ে গেল। সে মৃদু স্বরে বলল-আরেকটা বলেন। সুরমা তৎক্ষণাৎ দ্বিতীয় গল্প শুরু করলেন। এই গল্পটি প্রথমটির চেয়েও ভাল–সাপের গল্প।
মিলি নিউমার্কেটে একটি বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। রানু অবাক হয়ে বলল তুমি এখানে কি করছ?
মিলি হাসি মুখে বলল, বেড়াচ্ছি।
বেড়াচ্ছি মানে— এটা বেড়াবার জায়গা নাকি? কখন এসেছ?
অনেক্ষণ আগে।
মিলি রানুর সঙ্গে সঙ্গে ঘুরতে লাগল। তার উৎসাহের সীমা নেই। এক সময় রানু বলল, এসো তোমাকে একটা শাড়ি কিনে দেই।
মিলি বিস্মিত হয়ে বলল, কেন আমাকে শাড়ি কিনে দেবে কেন?
বেতন পেয়েছি আজ। এসো তুমি পছন্দ কর। পাঁচশ টাকার মধ্যে। মিলি কোনো রকম আপত্তি না করে শাড়ির দোকানে ঢুকে পড়ল। প্রায় ঘণ্টাখানিক লাগিয়ে শাড়ি কিনল।
ভাবী, এখন একটা আইসক্রিম খাব।
এখন আইসক্রিম খাবে কেন? চল বাসায় চল, ভাত খাবে। ক্ষিধে লাগেনি?
লেগেছে। কিন্তু আইসক্রিম খেতে ইচ্ছা হচ্ছে।
তারা আইসক্রিমের দোকানে ঢুকল। রানুর মনে হল মিলি ঠিক সুস্থ নয়। তার কথাবার্তা, আচার-আচরণে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। তবু কোথায় যেন কিছু একটা গোলমাল হয়ে গেছে। রানু বলল, তোমার শরীর এখন কেমন মিলি?
ভাল।
তোমার বাচা কেমন আছে?
জানি না।
জানি না মানে?
আমার শাশুড়ি তাকে নিয়ে গেছেন।
কোথায় নিয়ে গেছেন?
ময়মনসিংহে। ওদের বাড়িতে।
তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না মিলি। মিথ্যা কথা বলছি। ঠিক না? মিলি হেসে ফেলল।
কেন এত মিথ্যা বল?
জানি না কেন বলি। চল ভাবী উঠি। বাসায় চলে যাব। ঘুম পাচ্ছে।
আমার সঙ্গে যাবে না?
উ ছ। ভাবী, বাবা যে বিয়ে করছে তুমি শুনেছ?
রানু কিছুই বলল না। মিলির কোনো কথার গুরুত্ব দেবার কোনো প্রয়োজন নেই। ওর যা মনে আসে তাই বলে।
আমার কথা বিশ্বাস করছ না, তাই না ভাবী?
ঠিকই ধরেছ। করছি না।
এবার কিন্তু সত্যি কথাই বলছি। বাবা তার সেক্রেটারিকে বিয়ে করেছেন। আমার কথা বিশ্বাস না হলে একশ টাকা বাজি রাখতে পার।
রানু চুপ করে রইল। দেড়টা বাজে। মাথা ধরে গেছে। এত সময় হাঁটাহাঁটি করা ঠিক হয়নি। মিলি গেটের কাছে এসেই বলল–ভাবী, শাড়ির রঙটা এখন আর আমার পছন্দ হচ্ছে না। পাঁচ মিনিটের জন্যে আসবে শাড়িটা বদলে নেব। প্লিজ ভাবী তোমার পায়ে পড়ি।
একটি চমৎকার দৃশ্য
ওসমান সাহেব দূর থেকে একটি চমৎকার দৃশ্য দেখলেন। গেটের বাইরে অপলা ও টগর।
অপালা হাসছে। অপলার কোলে হাসছে টগর।
তিনি মুগ্ধ চোখে তাকালেন। কিছু কিছু দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে অন্য রকম করে ফেলে। অন্ধকার দূর করে দেয়। মনের কোনো একটা স্যাঁতস্যাতে জায়গায় হঠাৎ খানিকটা আলো এসে পড়ে।
তার মন হাল্কা হয়ে গেল। দীর্ঘদিন তিনি কিছু লিখতে পারছেন না। একটি লাইনও নয়। না। লেখার মত কষ্টও যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তিনি হাসলেন। একজনের কান্না অন্য জনকে স্পর্শ করে না। কিন্তু হাসি করে।
অপলা চেঁচাল–দুলাভাই। দুলাভাই। সে আজ এত উল্লসিত কেন? ওসমান সাহেব হাসতে হাসতে বুললেন, কি খবর অপলা?
আমাদের ভাল খবর। আপনার খবর কি? আমার কোনো খবর নেই। এত খুশি কেন? অপলা ঘাড় কাত করে বলল–খুব ভাল সময়ে এসেছেন। ভাল সময় কেন? ७ों दव्लब नां। অপলা হাসছে। টগর হাসছে। হাসছেন ওসমান সাহেব। রানু দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখল। এমন আনন্দিত হবার মত কি ঘটেছে? টগর বাবার কোলে যাবা জন্যে হাত বাড়িয়েছে। এটাও একটা নতুন দৃশ্য। টগর তার বাবা-মোর প্রতি আলাদা কোনো আবেগ দেখায় না।
ওসমান সাহেব ছেলেকে হাত বাড়িয়ে কোলে নিলেন। টগর বলল, আজ কি বুধবার? না। আজ বুধবার না। অন্য একবারে এসে দেখলাম কেমন লাগে। তুমি খুশি হয়েছ টগর?
হ্যাঁ।
বেশি খুশি? না অল্প খুশি?
টগর দাঁত বের করে হাসল। অপলা বলল চলুন উপরে যাই। ওসমান সাহেবের কেন জানি দোতলায় উঠতে ইচ্ছা হল না। তার মনে হল দোতলায় উঠলেই চমৎকার বিকালটা অন্য রকম হয়ে যাবে। রানু এসে কঠিন মুখে দু’একটা কথা জিজ্ঞেস করবে। আজ কারোর কঠিন মুখ দেখতে ইচ্ছা! করছে না।
তিনি বললেন–অপলা চল রাস্তার মোড়ে যাই। টগরকে চকলেট কিনে দেই। আজ ওর জন্যে কিছু আনা হয়নি।
