কথা শেষ করার আগেই তুমি কথা বল কেন? বড় বিবক্ত লাগে। যা বলছিলাম শোন, আমি পরশুদিন দেখি মাত্র এগার হাজার তিনশ তেত্ৰিশ টাকা জমেছে। এই টাকাটা দিয়ে কী করা যায় বল তো?
কী করতে চাও?
সেটাই তো বুঝতে পারছি না। বুঝতে পারলে কী তোমাকে জিজ্ঞেস করতাম?
অজন্তাকে দিয়ে দাও।
না। ওকে যা দেবার তুমিই দেবে, আমি এই টাকাটা তিথিকে দিতে চাই।
দবির উদ্দিন এই কথায় তেমন বিস্মিত হলেন না। তার কেন যেন মনে হচ্ছিল ফরিদা এই কাজটিই করবে। তিনি বললেন, ও তোমার টাকা নেবে না।
কেন নেবে না?
তা জানি না। তবে সে যে নেবে না। এইটুকু জানি।
আমারও তাই ধারণা। তবে ও যেন নেয়। সেই ব্যবস্থা সহজেই করা যায়।
কী ভাবে?
আমি মরবার পর তুমি তাকে বল টাকাটা আমি তার জন্যে রেখে গেছি তাহলে সে একটা সমস্যায় পড়বে। জীবিত মানুষের কথা আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি মৃত মানুষের কথা পারি না। তাছাড়া আমি তাকে একটা চিঠিও লিখে রেখে যাব। তুমি খুব দামী কিছু কাগজ কিনে এনো তো।
দামী কাগজ লাগবে কেন?
শেষ চিঠিটা দামী কাগজে লিখতে ইচ্ছা করছে।
বেশ, আনব দামী কাগজ। এখন তাহলে উঠি?
না, আরেকটু বস।
ফরিদা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছেন। দবির উদ্দিন অস্বস্তি বোধ করছেন তার কাছে ফরিদার দৃষ্টি খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। তার চোখ তো এত উজ্জ্বল কখনো ছিল না। ফরিদা বললেন, চিঠিটা লিখব কী করে বল তো? আমি তো হাতই নাড়তে পারি না।
আমি লিখে দেব।
ফরিদা হাসলেন। প্রথমে মৃদু স্বরে, পরক্ষণেই সেই হাসি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। দবির উদ্দিন হাসির কারণটা ধরতে পারলেন না। তার কাছে মনে হচ্ছে এই হাসি স্বাভাবিক মানুষের হাসি না। একজন অসুস্থ মানুষের হাসি।
ফরিদা বললেন, তুমি আমার হাতটা একটু ধর তো, দেখি কী ভাবে হাত ধর।
কী বললে?
আমার হাতটা একটু ধর।
দবির উদ্দিন, ফরিদার হাতে হাত রাখলেন। রোগশীর্ণ পাণ্ডুর হাত। নীল শিরাগুলি পর্যন্ত ফুটে রয়েছে। ফরিদা অস্পষ্ট স্বরে বললেন, কারণে-অকারণে তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, তুমি কিছু মনে করো না।
ফরিদার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।
টুকু অরুকে ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছে
টুকু অরুকে ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছে।
যাচ্ছে বাসে। অরু বসার জায়গা পেয়েছে টুকু তার পাশেই হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে। অরু বলল, টুকু তুই আমার কোলে বোস।
টুকু খুব লজ্জা পেল। কারো কোলে বসে যাবার বয়স কী আছে? তার বয়স বাড়ছে এই কথাটা কারোরই মনে থাকে না। টুকুর প্যান্টে স্টার সিগারেটের প্যাকেটে তিনটা সিগারেট পর্যন্ত আছে। এই খবর জানতে পারলে আপার নিশ্চয়ই খুব মন খারাপ হবে।
দাউদকান্দিতে পৌঁছবার পর টুকু বসার জায়গা পেল। অরুর পাশের বৃদ্ধ নেমে গেছেন। অরু বলল, তুই জানালার পাশে বসবি টুকু?
না।
আয় না বোস, সুন্দর দেখতে দেখতে যাবি।
তুমি দেখতে দেখতে যাও।
আপার দিকে তাকাতে টুকুর বড় ভাল লাগছে। ফিরে যাবার আনন্দে। আপার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে আছে, কেমন ছটফট করছে। আনন্দে ধরে রাখতে পারছে না।
অরু নিচু গলায় বলল, টুকু তোর কী মনে হয়, আমাদের দেখলে তোর দুলাভাই রাগারগি করবে?
জানি না আপা।
কিছু তো করবেই। পুরুষ মানুষের এমনিতেই রাগ বেশি থাকে। তোকে হয়ত কিছু বকাঝকা দিবে, তুমি কিছুই মনে করিস না।
আমি কিছু মনে করি না।
মনে না করাই ভাল। এত কিছু মনে পুষে রাখলে সংসার চলে না।
কথা বলো না আপা। সবাই শুনছে।
অরু চুপ করে গেল, কিন্তু বেশিক্ষণ চুপ থাকতে পারল না। ফিসফিস করে বলল–সুসান আমাকে দেখলে কী করবে। আন্দাজ কর তো টুকু?
টুকু জবাব দিল না। অরু বলল, প্রথম এরকম ভান করবে। যে আমাকে চিনতে পারছে না। ওর এই স্বভাব। তার বাবা একবার তিন দিনের জন্যে বাইরে গিয়েছিল, ফিরে আসার পর সুমন এমন ভাব করেছে যেন বাবাকে চেনে না। অথচ ঠিকই চিনেছে। রিমন আবার ঠিক তার উল্টো। শব্দ পেলেই ঝাপ দিয়ে কোলে পড়বে।
আপা চুপচাপ বস তো।
রিমনের শার্টটা ছোটই হয়। কিনা কে জানে। সুমনের জন্যে একটা পাঞ্জাবি কিনেছি। আর রিমনের জন্যে শার্ট। একটু বড় কেনার দরকার ছিল। ওদের কাপড়গুলি তুই দেখেছিস?
না।
দেখবি?
এখন দেখব না আপা। আর তুমি এত কথা বলছ কেন?
কেউ তো আর শুনতে পারছে না, ফিসফিস করে বলছি।
চুপচাপ বসে থাক আপা, ঘুমুবার চেষ্টা কর।
দূর বোকা, বাসে কেউ ঘুমায়?
তারা বাড়িতে পৌঁছল। সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে! আব্দুল মতিনের সঙ্গে দেখা হল বাংলাঘরের সামনে। সে মাগরেবের নামাজের জন্যে অজু করছিল। মতিন কড়া গলায় বলল, কে?
টুকু বলল, দুলাভাই আমরা।
আমরা! আমরাটা আবার কে?
আপাকে নিয়ে এসেছি দুলাভাই।
কে আনতে বলেছে?
অরু নিচু গলায় বলল, রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বকবকি করছ, কেন? ঘরে যাই তারপর…
এ দেখি ফড়ফড় করে কথাও বলে।
টুকু বিস্মিত গলায় বলল, এই সব কী বলছেন দুলাভাই?
আব্দুল মতিন খেকিয়ে উঠল, চামচিকা দেখি আমাকে ধমক দেয়। দূর হা হারামজাদা।
টুকু হতভম্ব হয়ে গেল। হৈচৈ শুনে লোকজন জড়ো হয়েছে। ভেতর থেকে অরুর এক মামাশ্বশুর বের হয়েছেন। তিনি কোনো কথা বললেন না। সুমন তার গলা জড়িয়ে ধরে আছে এবং ভীত চোখে তাকাচ্ছে তার বাবার দিকে। অরু, অসহায় ভঙ্গিতে ছেলের দিকে এগিয়ে গেল! আব্দুল মতিন চেঁচিয়ে উঠল, এই কোথায় যাস তুই, খবরদার।
অরুর চোখে পানি এসে গেছে, সে গুছিয়ে কিছু চিন্তা করতে পারছে না। কী করবে সে? ছুটে গিয়ে তার স্বামীর পায়ে উপুড় হয়ে পড়বে। কিন্তু এত লোকজন চারদিকে জড়ো হচ্ছে–আহা, যদি কেউ না থাকত। অরু ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, তুমি এ রকম করছ কেন?
