মধুসূদন কেবল একটা বিষয়ে টেক্কা দিতে পারে! সে তার ধনে। তাই আজ সকালেই ঘরে জহরি এসেছিল। তার কাছ থেকে তিনটে আংটি নিয়ে রেখেছে, দেখতে চায় কোন্টাতে কুমুর পছন্দ। সেই আংটির কৌটা তিনটি পকেটে নিয়ে সে তার শোবার ঘরে গেল। একটা চুনি, একটা পান্না, একটা হীরের আংটি। মধুসূদন মনে মনে একটি দৃশ্য কল্পনাযোগে দেখতে পাচ্ছে। প্রথমে সে যেন চুনির আংটির কৌটা অতি ধীরে ধীরে খুললে, কুমুর লুব্ধ চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তার পরে বেরোল পান্না, তাতে চক্ষু আরো প্রসারিত। তার পর হীরে, তার বহুমূল্য উজ্জ্বলতায় রমণীর বিস্ময়ের সীমা নেই। মধুসূদন রাজকীয় গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললে, “তোমার যেটা ইচ্ছে পছন্দ করে নাও।” হীরেটাই কুমু যখন পছন্দ করলে তখন তার লুব্ধতার ক্ষীণ সাহস দেখে ঈষৎ হাস্য করে মধুসূদন তিনটে আংটিই কুমুর তিন আঙুলে পরিয়ে দিলে। তার পরেই রাত্রে শয়নমঞ্চের যবনিকা উঠল।
মধুসূদনের অভিপ্রায় ছিল এই ব্যাপারটা আজ রাত্রের আহারের পরে হবে। কিন্তু দুপুরবেলাকার দুর্যোগের পর মধুসূদন আর সবুর করতে পারলে না। রাত্রের ভূমিকাটা আজ অপরাহ্নে সেরে নেবার জন্যে অন্তঃপুরে গেল।
গিয়ে দেখে কুমু একটা টিনের তোরঙ্গ খুলে শোবার ঘরের মেজেতে বসে গোছাচ্ছে। পাশে জিনিসপত্র কাপড়চোপড় ছড়ানো।
“এ কী কাণ্ড! কোথাও যাচ্ছ নাকি?”
“হাঁ।”
“কোথায়?”
“রজবপুরে।”
“তার মানে কী হল?”
“তোমার দেরাজ খোলা নিয়ে ঠাকুরপোদের শাস্তি দিয়েছ। সে শাস্তি আমারই পাওনা।”
“যেয়ো না” বলে অনুরোধ করতে বসা একেবারেই মধুসূদনের স্বভাববিরুদ্ধ। তার মনটা প্রথমেই বলে উঠল– যাক-না দেখি কতদিন থাকতে পারে। এক মুহূর্ত দেরি না করে হন্ হন্ করে ফিরে চলে গেল।
যোগাযোগ ৩৬-৪০
৩৬
মধুসূদন বাইরে গিয়ে নবীনকে ডেকে পাঠিয়ে বললে, “বড়োবউকে তোরা খেপিয়েছিস।”
“দাদা, কালই তো আমরা যাচ্ছি, তোমার কাছে ভয়ে ভয়ে ঢোঁক গিলে কথা কব না। আমি আজ এই স্পষ্ট বলে যাচ্ছি, বড়োবউরানীকে খেপাবার জন্যে সংসারে আর কারো দরকার হবে না– তুমি একাই পারবে। আমরা থাকলে তবু যদি-বা কিছু ঠাণ্ডা রাখতে পারতুম, কিন্তু সে তোমার সইল না।”
মধুসূদন গর্জন করে উঠে বললে, “জ্যাঠামি করিস নে। রজবপুরে যাবার কথা তোরাই ওকে শিখিয়েছিস।”
“এ কথা ভাবতেই পারি নে তো শেখাব কি?”
“দেখ্, এই নিয়ে যদি ওকে নাচাস তোদের ভালো হবে না স্পষ্টই বলে দিচ্ছি।”
“দাদা, এ-সব কথা বলছ কাকে? যেখানে বললে কাজে লাগে বলো গে।”
“তোরা কিছু বলিস নি?”
“এই তোমার গা ছুঁয়ে বলছি, কল্পনাও করি নি।”
“বড়োবউ যদি জেদ ধরে বসে তা হলে কী করবি তোরা?”
“তোমাকে ডেকে আনব। তোমার পাইক বরকন্দাজ পেয়াদা আছে, তুমি ঠেকাতে পার। তার পরে তোমার শত্রুপক্ষেরা এই যুদ্ধের সংবাদ যদি কাগজে রটায় তা হলে মেজোবউকে সন্দেহ করে বোসো না।”
মধুসূদন আবার তাকে ধমক দিয়ে বললে, “চুপ কর্! বড়োবউ যদি রজবপুরে যেতে চায় তো যাক, আমি ঠেকাব না।”
“আমরা তাঁকে খাওয়াব কী করে?”
“তোমার স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে। যা, যা বলছি! বেরো বলছি ঘর থেকে।”
নবীন বেরিয়ে গেল। মধুসূদন ওডিকলোন-ভিজনো পটি কপালে জড়িয়ে আবার একবার আপিসে যাবার সংকল্প মনে দৃঢ় করতে লাগল।
নবীনের কাছে মোতির মা সব কথা শুনে দৌড়ে গেল কুমুর শোবার ঘরে। দেখলে তখনো সে কাপড়-চোপড় পাট করছে তোলবার জন্যে। বললে, “এ কী করছ বউরানী?”
“তোমাদের সঙ্গে যাব।”
“তোমাকে নিয়ে যাবার সাধ্য কী আমার!”
“কেন?”
“বড়োঠাকুর তা হলে আমাদের মুখ দেখবেন না।”
“তা হলে আমারও দেখবেন না।”
“তা সে যেন হল, আমরা যে বড়ো গরিব।”
“আমিও কম গরিব না, আমারও চলে যাবে।”
“লোকে যে বড়োঠাকুরকে নিয়ে হাসবে।”
“তা বলে আমার জন্যে তোমরা শাস্তি পাবে এ আমি সইব না।”
“কিন্তু দিদি, তোমার জন্যে তো শাস্তি নয়, এ আমাদের নিজের পাপের জন্যেই।”
“কিসের পাপ তোমাদের?”
“আমরাই তো খবর দিয়েছি তোমাকে।”
“আমি যদি খবর জানতে চাই তা হলে খবর দেওয়াটা অপরাধ?”
“কর্তাকে না জানিয়ে দেওয়াটা অপরাধ।”
“তাই ভালো, অপরাধ তোমরাও করেছ আমিও করেছি। একসঙ্গেই ফল ভোগ করব।”
“আচ্ছা বেশ, তা হলে বলে দেব তোমার জন্যে পালকি। বড়োঠাকুরের হুকুম হয়েছে তোমাকে বাধা দেওয়া হবে না। এখন তবে তোমার জিনিসগুলি গুছিয়ে দিই। ওগুলো নিয়ে যে ঘেমে উঠলে!”
দুজনে গোছাতে লেগে গেল।
এমন সময়ে কানে এল বাইরে জুতোর মচ্ মচ্ ধ্বনি। মোতির মা দিল দৌড়।
মধুসূদন ঘরে ঢুকেই বললে, “বড়োবউ, তুমি যেতে পারবে না।”
“কেন যেতে পারব না?”
“আমি হুকুম করছি বলে।”
“আচ্ছা, তা হলে যাব না। তার পরে আর কী হুকুম বলো।”
“বন্ধ করো তোমার জিনিস প্যাক করা।”
“এই বন্ধ করলুম।” বলে কুমু উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মধুসূদন বললে, “শোনো, শোনো।”
তখনই কুমু ফিরে এসে বললে,”কী বলো।”
বিশেষ কিছুই বলবার ছিল না। তবু একটু ভেবে বললে, “তোমার জন্যে আংটি এনেছি।”
“আমার যে-আংটির দরকার ছিল সে তুমি পরতে বারণ করেছ, আর আমার আংটির দরকার নেই।”
“একবার দেখোই না চেয়ে।”
মধুসূদন একে একে কৌটো খুলে দেখালে। কুমু একটি কথাও বললে না।
“এর যেটা তোমার পছন্দ সেইটেই তুমি পরতে পারো।”
“তুমি যেটা হুকুম করবে সেইটেই পরব।”
“আমি তো মনে করি তিনটেই তিন আঙুলে মানাবে।”
“হুকুম কর তিনটেই পরব।”
