বিপিন। তোমার সম্বন্ধেও ঠিক ঐ প্রশ্নটা প্রয়োগ করা যেতে পারে।
শ্রীশ। আমি এসেছিলুম আমার সেই সন্ন্যাস-সম্প্রদায়ের কথাটা অবলাকান্তবাবুর সঙ্গে আলোচনা করতে। ওঁর যেরকম চেহারা, কণ্ঠস্বর, মুখের ভাব, উনি ঠিক আমার সন্ন্যাসীর আদর্শ হতে পারেন। উনি যদি ওঁর ঐ চন্দ্রকলার মতো কপালটিতে চন্দন দিয়ে, গলায় মালা প’রে, হাতে একটি বীণা নিয়ে সকালবেলায় একটি পল্লীর মধ্যে প্রবেশ করেন তা হলে কোন্ গৃহস্থের হৃদয় না গলাতে পারেন?
রসিক। বুঝতে পারছি নে মশায়, হৃদয় গলাবার কি খুব জরুরি দরকার হয়েছে?
শ্রীশ। চিরকুমার-সভা হৃদয় গলাবার সভা।
রসিক। বলেন কী? তবে আমার দ্বারা কী কাজ পাবেন?
শ্রীশ। আপনার মধ্যে যেরকম উত্তাপ আছে আপনি উত্তরমেরুতে গেলে সেখানকার বরফ গলিয়ে বন্যা করে দিয়ে আসতে পারেন।– বিপিন, উঠছ নাকি?
বিপিন। যাই, আমাকে রাত্রে একটু পড়তে হবে।
রসিক। (জনান্তিকে) অবলাকান্ত জিজ্ঞাসা করছেন পড়া হয়ে গেলে বইখানা কি ফেরত পাওয়া যাবে?
বিপিন। (জনান্তিকে) পড়া হয়ে গেলে সে আলোচনা পরে হবে, আজ থাক্।
শৈল। (মৃদুস্বরে) শ্রীশবাবু, ইতস্তত করছেন কেন, আপনার কিছু হারিয়েছে নাকি?
শ্রীশ। (মৃদুস্বরে) আজ থাক্, আর-একদিন খুঁজে দেখব।
[শ্রীশ ও বিপিনের প্রস্থান
নীরবালা। (দ্রুত প্রবেশ করিয়া) এ কী রকমের ডাকাতি দিদি! আমার গানের খাতাখানা নিয়ে গেল! আমার ভয়ানক রাগ হচ্ছে।
রসিক। রাগ শব্দে নানা অর্থ অভিধানে কয়।
নীরবালা। আচ্ছা পণ্ডিতমশায়, তোমার অভিধান জাহির করতে হবে না– আমার খাতা ফিরিয়ে আনো।
রসিক। পুলিসে খবর দে ভাই, চোর ধরা আমার ব্যাবসা নয়।
নীরবালা। কেন, দিদি, তুমি আমার খাতা নিয়ে যেতে দিলে?
শৈল। এমন অমুল্য ধন তুই ফেলে রেখে যাস কেন?
নীরবালা। আমি বুঝি ইচ্ছে করে ফেলে রেখে গেছি?
রসিক। লোকে সেইরকম সন্দেহ করছে।
নীরবালা। না রসিকদাদা, তোমার ও ঠাট্টা আমার ভালো লাগে না।
রসিক। তা হলে ভয়ানক খারাপ অবস্থা!
[সক্রোধে নীরবালার প্রস্থান
সলজ্জ নৃপবালার প্রবেশ
রসিক। কী নৃপ, হারাধন খুঁজে বেড়াচ্ছিস?
নৃপবালা। না, আমার কিছু হারায় নি।
রসিক। সে তো অতি সুখের সংবাদ। শৈলদিদি, তা হলে আর কেন, রুমালখানার মালিক যখন পাওয়া যাচ্ছে না, তখন যে লোক কুড়িয়ে পেয়েছে তাকেই ফিরিয়ে দিস। (শৈলের হাত হইতে রুমাল লইয়া) এ জিনিসটা কার ভাই?
নৃপবালা। ও আমার নয়।
[পলায়নোদ্যত
রসিক। (নৃপকে ধরিয়া) যে জিনিসটা খোওয়া গেছে নৃপ তার উপরে কোনো দাবিও রাখতে চায় না।
নৃপবালা। রসিকদাদা, ছাড়ো– আমার কাজ আছে।
» প্রজাপতির নির্বন্ধ ১০
দশম পরিচ্ছেদ
পথে বাহির হইয়াই শ্রীশ কহিল, “ওহে বিপিন, আজ মাঘের শেষে প্রথম বসন্তের বাতাস দিয়েছে, জ্যোৎস্নাও দিব্যি, আজ যদি এখনই ঘুমোতে কিম্বা পড়া মুখস্থ করতে যাওয়া যায় তা হলে দেবতারা ধিক্কার দেবেন।”
বিপিন। তাঁদের ধিক্কার খুব সহজে সহ্য হয়, কিন্তু ব্যামোর ধাক্কা কিম্বা–
শ্রীশ। দেখো, ঐজন্যে তোমার সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়। আমি বেশ জানি দক্ষিনে হাওয়ায় তোমারও প্রাণটা চঞ্চল হয়, কিন্তু পাছে কেউ তোমাকে কবিত্বের অপবাদ দেয় বলে মলয় সমীরণটাকে একেবারেই আমল দিতে চাও না। এতে তোমার বাহাদুরিটা কী জিজ্ঞাসা করি? আমি তোমার কাছে আজ মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করছি, আমার ফুল ভালো লাগে, জ্যোৎস্না ভালো লাগে, দক্ষিনে হাওয়া ভালো লাগে–
বিপিন। এবং–
শ্রীশ। এবং যা কিছু ভালো লাগবার মতো জিনিস সবই ভালো লাগে।
বিপিন। বিধাতা তো তোমাকে ভারি আশ্চর্য রকম ছাঁচে গড়েছেন দেখছি।
শ্রীশ। তোমার ছাঁচ আরো আশ্চর্য। তোমার লাগে ভালো, কিন্তু বল অন্য রকম– আমার সেই শোবার ঘরের ঘড়িটার মতো– সে চলে ঠিক, কিন্তু বাজে ভুল।
বিপিন। কিন্তু শ্রীশ, তোমার যদি সব মনোহর জিনিসই মনোহর লাগতে লাগল তা হলে তো আসন্ন বিপদ।
শ্রীশ। আমি তো কিছুই বিপদ বোধ করি নে।
বিপিন। সেই লক্ষণটাই তো সব চেয়ে খারাপ। রোগের যখন বেদনাবোধ চলে যায় তখন আর চিকিৎসার রাস্তা থাকে না। আমি, ভাই, স্পষ্টই কবুল করছি স্ত্রীজাতির একটা আকর্ষণ আছে– চিরকুমার-সভা যদি সেই আকর্ষণ এড়াতে চান তা হলে তাঁকে খুব তফাত দিয়ে যেতে হবে।
শ্রীশ। ভুল, ভুল, ভয়ানক ভুল! তুমি তফাতে থাকলে কী হবে, তাঁরা তো তফাতে থাকেন না। সংসাররক্ষার জন্যে বিধাতাকে এত নারী সৃষ্টি করতে হয়েছে যে তাঁদের এড়িয়ে চলা অসম্ভব। অতএব কৌমার্য যদি রক্ষা করতে চাও তা হলে নারীজাতিকে অল্পে অল্পে সইয়ে নিতে হবে। ঐ-যে স্ত্রীসভ্য নেবার নিয়ম হয়েছে, এতদিন পরে কুমারসভা চিরস্থায়ী হবার উপায় অবলম্বন করেছে। কিন্তু কেবল একটিমাত্র মহিলা হলে চলবে না বিপিন, অনেকগুলি স্ত্রীসভ্য চাই। বদ্ধ ঘরের একটি জানলা খুলে ঠাণ্ডা লাগালে সর্দি ধরে, খোলা হাওয়ায় থাকলে সে বিপদ নেই।
বিপিন। আমি তোমার ঐ খোলা হাওয়া বন্ধ হাওয়া বুঝি নে ভাই! যার সর্দির ধাত তাকে সর্দি থেকে রক্ষা করতে দেবতা মনুষ্য কেউ পারে না।
শ্রীশ। তোমার ধাত কী বলছে হে?
বিপিন। সে কথা খোলসা করে বললেই বুঝতে পারবে তোমার ধাতের সঙ্গে তার চমৎকার মিল আছে। নাড়ীটা যে সব সময়ে ঠিক চিরকুমারের নাড়ীর মতো চলে তা জাঁক করে বলতে পারব না।
শ্রীশ। ঐটে তোমার আর-একটা ভুল। চিরকুমারের নাড়ীর উপর ঊনপঞ্চাশ পবনের নৃত্য হতে দাও– কোনো ভয় নেই– বাঁধাবাঁধি চাপাচাপি কোরো না। আমাদের মতো ব্রত যাদের, তারা কি হৃদয়টিকে তুলো দিয়ে মুড়ে রাখতে পারে? তাকে অশ্বমেধযজ্ঞের ঘোড়ার মতো ছেড়ে দাও, যে তাকে বাঁধবে তার সঙ্গে লড়াই করো।
