কফিল চাচা খেঁকিয়ে উঠে বললেন, “কী হয়েছে?”
“পুলিশ।”
এই কথাটায় অবিশ্যি ম্যাজিকের মতো কাজ হল। চোখ কপালে তুলে বললেন, “কোথায়?”
“এই বাইরে ছিল এখন অন্যদিকে হেঁটে গেছে। আপনার কথা জিজ্ঞেস করছিল।”
“আমার কথা?” কফিলউদ্দিনকে হঠাৎ কেমন জানি ফ্যাকাশে দেখায়।”আমার কথা কী জিজ্ঞেস করেছে?”
“আপনি কখন বাসায় থাকেন কী করেন এইসব। ছেলেধরার সাথে যোগাযোগ আছে কি না সেটাও জিজ্ঞেস করেছে।”
কফিলউদ্দিন কেমন যেন চিমশে মেরে গেলেন। শিউলি বলল, “পুলিশের হাতে অনেক কাগজ ছিল। সেখানে থেকে এই কাগজটা নিচে পড়ে গিয়েছিল। পুলিশ টের পায় নাই, আমি তুলে এনেছি।”
“দেখি দেখি–” বলে কফিল চাচা শিউলির হাতের কাগজটা প্রায় ছোঁ মেরে নিলেন। চশমা ছাড়া কিছু পড়তে পারেন না তাই খড়ম খটখট করে ঘরে ঢুকে টেবিলের উপর থেকে চশমাটা নিয়ে নাকের ডগায় চাপিয়ে নিয়ে কাগজটা পড়ার চেষ্টা করতে লাগলেন।
শিউলির বুক ঢিপঢিপ করতে শুরু করল। সুপার গু খুব তাড়াতাড়ি কাজ করে, আর কিছুক্ষণ চশমাটা নাকের ডগায় রাখতে পারলেই হবে। শিউলি ডোক গিলে জিজ্ঞেস করল, “কী লেখা আছে কাগজে?”
“বুঝতে পারলাম না। দেখে মনে হয় ইংরেজি ট্রান্সলেশন। আমি গরুকে খাওয়াই–আই ইট কাউ।”
“তাই লেখা?”
“হুম।”
“অন্য পৃষ্ঠায় কী লেখা?”
কফিল চাচা অন্য পৃষ্ঠায় কী লেখা সেটা পড়তে শুরু করলেন। খানিকটা পড়ে শিউলির দিকে তাকালেন, “তুই সত্যি এই কাগজটা পেয়েছিস?”
“হ্যাঁ এটাই।”
কফিলউদ্দিন আবার কাগজটা পড়লেন, পড়ে গম্ভীর হয়ে গেলেন। শিউলি জিজ্ঞেস করল, “কী লেখা আছে চাচা?”
“এখানে লেখা, একটি বাঁদর একটি তৈলাক্ত বাঁশ বাহিয়া উপরে উঠিতেছে। প্রতি মিনিটে দুই ফুট উপরে উঠিয়া পরের মিনিটে–” কফিল চাচা এবার কড়াচোখে শিউলির দিকে তাকালেন, “তুই সত্যি এইটা পেয়েছিস?”
শিউলি মাথা চুলকাল, “এইটাই তো মনে হল।”
কফিলউদ্দিন আবার কাগজটা পড়তে শুরু করলেন। উপর থেকে নিচে–নিচে থেকে উপরে, ডান থেকে বামে–বাম থেকে ডানে এবং শিউলি তখন সটকে পড়ল। তাঁর কাজ শেষ, এখন তার বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার সময়। কিন্তু তার কাগজটা কেমন হয়েছে না দেখে সে কেমন করে যায়?
কিছুক্ষণ পরেই হঠাৎ সে বাড়ির ভেতর থেকে বিকট চিৎকার শুনতে পেল, মনে হল কফিল চাচা ডাক ছেড়ে একটা আর্তনাদ দিয়েছেন।
বাইরে যেসব বাচ্চাকাচ্চা খেলছিল তাদের পিছুপিছু শিউলিও বাড়ির ভেতরে এসে ঢুকল। দেখতে পেল উঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কফিল চাচা তার চশমাটা খোলার চেষ্টা করছেন এবং খুলতে না পেরে একটু পরেপরে একটা বিকট আর্তনাদ দিচ্ছেন। পাহাড়ের মতো মোটা শরীর নিয়ে চাচিও হাজির হলেন, মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, “এইরকম করে চাঁচাচ্ছেন কেন?”
“চশমা!”
“চশমা কী হয়েছে?”
“খোলা যাচ্ছে না।”
“খোলা যাচ্ছে না! ঢং নাকি?” এই বলে চাচি চশমা ধরে একটা টান দিলেন এবং কফিল চাচা একেবারে গলা ফাটিয়ে একটা চিৎকার দিলেন। দেখা গেল সত্যি চশমা খোলা যাচ্ছে না এবং হঠাৎ করে চাচির মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
“মাথাটা নিচু করেন দেখি।”
কফিন চাচা মাথাটা কচ্ছপের মতো নিচু করলেন। চাচি খুব ভালো করে পরীক্ষা করে আরও গম্ভীর হয়ে গেলেন। কফিল চাচা শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে?”
“মনে হচ্ছে চামড়ার সাথে আটকে গেছে।”
কফিল চাচা কাঁদোকাঁদো গলায় বললেন, “আটকে গেছে?”
“হ্যাঁ।”
“সেটা কেমন করে হয়?”
আশেপাশে যারা ছিল তারা সবাই তখন কফিল চাচার চশমা পরীক্ষা করতে শুরু করে, সবাই একটু করে টানাটানি করে আর প্রত্যেকবারই কফিল চাচা বিকট একটা করে আর্তনাদ করে ওঠেন। কফিল চাচার ফুপাতো ভাই–বাজারের জামে মসজিদের পেশ ইমাম, খানিকক্ষণ টানাটানি করে বললেন, “মনে হয় কেটে খুলতে হবে।”
“কেটে?” কফিল চাচা আর্তনাদ করে বললেন, “নাক-কান কেটে?”
“তাই তো মনে হচ্ছে।”
চাচি ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “কিন্তু এটা হল কেমন করে?”
কফিল চাচার ফুপাতো ভাই দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, “হয়।”
“হয়?”
“হ্যাঁ। বাজানের কাছে শুনেছি একবার করবে লাশ নামাতে গিয়ে একজন কবর থেকে উঠতে পারে না। পা মাটির সাথে লেগে গেছে। একেবারে এইরকম–এখন চশমা নাকের সাথে লেগে গেছে।”
“কিন্তু কারণটা কী?”
“গজব।” কফিল চাচা ভাঙা গলায় বললেন, “গজব?”
“হ্যাঁ। আল্লাহর গজব। আল্লাহর হক আদায় না করলে গজব হয়। এতিমের হক আদায় না করলেও হয়। তওবা করো, দান-খয়রাত করো। এতিমের হক আদায় করো—”
শিউলি বুঝল এখন তার পালিয়ে যাওয়ার সময় হয়েছে। সবাই যখন নাকের উপর চশমা এঁটে বসার কারণটা বের করার চেষ্টা করছে, টানাটানি করে সেটা খোলার চেষ্টা করছে তখন পেছন থেকে শিউলি সটকে পড়ল। যেতে যেতে শুনল কফিল চাচা একটু পরেপরে বিকট গলায় চিৎকার করছেন।
গ্রামে পথে দুই মাইল হেঁটে, নৌকায় নদী পার হয়ে শেষ অংশটুকু বাসে গিয়ে শিউলি শেষ পর্যন্ত স্টেশনে পৌঁছাল। ট্রেন চলে গেলে সে খুব বিপদে পড়ে যেত, কিন্তু কফিলউদ্দিনের বাড়িতে থাকলে তার যে বিপদ হতে পারে তার তুলনায় এই বিপদটি কিছুই না।
স্টেশনে খোঁজাখুঁজি করতেই সে পাগল ধরনের মানুষটিকে পেয়ে গেল–একটা বেঞ্চে বসে কিছু-একটা খুব মনোযোগ দিয়ে ভাবছে। একেবারে কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর পরেও যখন মানুষটি তাকে দেখল না তখন সে শার্টের কোনা ধরে টানল, মানুষটা তখন কেমন জানি একেবারে ভূত দেখার মতো চমকে উঠে বলল, “কে?”
