.
শুশুকের যত্ন করে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে বকুলের দেরি হয়ে গেল, সেজন্যে আবার তার বকুনি খেতে হল। এবারে শুরু হল উলটো দিক দিয়ে প্রথমে মা তারপর বড়চাচা সবশেষে বাবা। বিকেলে বকুনি খেয়ে তার যেরকম মন-খারাপ হয়েছিল এখন সেরকম কিছু হল না, পুরো বকুনিটা সে তার এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিল। তার মাথায় তখন শুশুকটির জন্যে চিন্তা। কীভাবে এই ব্যথা-পাওয়া শুশুকটিকে সারিয়ে তোলা যায় সেটা নিয়ে ভাবনা।
পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে গেল বকুল। পা টিপে টিপে ঘর থেকে বের হয়ে সে নদীর তীর ধরে হেঁটে যেতে থাকে। ভোরবেলা নদীর ওপরে কেমন কুয়াশা কুয়াশা ভাব, দূরে গাছপালাগুলো আবছা দেখা যাচ্ছে। এখনও সূর্য ওঠেনি, পূর্ব দিকে আকাশে লালচে হয়ে আসছে। এক-দুজন মানুষ দাঁতন দিয়ে দাঁত ঘষতে ঘষতে ইতস্তত হাঁটছে। এত ভোরবেলা বকুলকে দেখে একজন বলল, “কী বকুল? তুই এত ভোরে কী করিস?”
বকুল আমতা আমতা করে বলল, “সকালে ঘুম থেকে ওঠা স্বাস্থ্যের জন্যে ভালো চাচা। শরীর ভালো থাকে।”
“যাচ্ছিস কোথায়?”
“এই তো হেঁটে আসছি। সকালে হাঁটাহাটি করলে শরীর ভালো থাকে।”
মানুষটি অবাক হয়ে বকুলের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর বকুল সকালে উঠে হাঁটাহাঁটি করার ভঙ্গি করে কুমোরপাড়ার দিকে অদৃশ্য হয়ে যায়।
যে-গাছটায় তারাপদ মাস্টার ফাঁসি নিয়েছিল বকুল তার নিচে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখল শুশুকটা এখনও আগের জায়গায় নিশ্চল হয়ে পড়ে আছে। বকুলের বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে, মরে গিয়েছে নাকি? পা টিপে টিপে কাছে গিয়ে সে শুশুকটাকে স্পর্শ করল, সাথে সাথে সেটি ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল–না, এখনও বেঁচে আছে। বকুল পানিতে নেমে দুই হাতে আঁজলা করে পানি এনে শুশুবটার শুকনো শরীরটা ভিজিয়ে দিতে শুরু করল। শরীরটা ভিজিয়ে বকুল শুশুকটার পিঠের কাটার জায়গাটার দিকে তাকায়, এখনও লাল হয়ে ফুলে আছে। যে-লোহার টুকরাটা গেঁথেছিল সেটা মনে হয় শ্যালো ইঞ্জিন লাগানো নৌকার প্রপেলরের টুকরা। বকুল পানি দিয়ে শুশুকটার শরীর ভেজাতে ভেজাতে আবার নরম গলায় কথা বলতে থাকে, “আহা বেচারা আমার শুশুক সোনা, কত ব্যথা পেয়েছ তুমি! পিঠের মাঝে গেঁথে গিয়েছে প্রপেলর। এখন আর ভয় কী! এই তো দেখতে দেখতে ভালো হয়ে যাবে। আহা বেচারা, খাওয়া হয়নি কতদিন! কী খাও তুমি? নিয়ে আসব তোমার জন্যে খাবার?”
দুপুরবেলা বকুল শুশুকটার জন্যে খাবার নিয়ে এল। শুশুক কী খায় সে জানে না, তবে পানিতে যখন থাকে নিশ্চয়ই মাছ খায়। এখন নিশ্চল হয়ে শুয়ে আছে, মাছ কী চিবিয়ে খেতে পারবে? অনেক চিন্তা-ভাবনা করে শুশুকের জন্যে সে আলাদা একটা খাবার তৈরি করল। গরুর জন্যে সরিয়ে রাখা ভাতের মাড় রান্নাঘর থেকে চুরি করা এক গ্লাস দুধ এবং মাছের কুটোকাটা–যেটাকে সে থেঁতলে পিষে একেবারে হালুয়া করে ফেলেছে। তিনটি জিনিস একসাথে মিশিয়ে তার মাঝে সে দুটি প্যারাসিটামল গুঁড়ো করে দিল। মাথাব্যথায় মানুষের জন্যে যদি কাজ করে শুশুকের পিঠের ব্যথার কেন কাজ করবে না? শুশুকটাকে কেমন করে খাওয়াবে সে জানে না, তাই সাথে করে একটা ছোট বাটি নিয়ে এল। শুশুকটার মুখ হাঁ করিয়ে সাবধানে সে তার বিশেষ খাবার বাটিতে করে ঢেলে দিতে থাকে। প্রথম এক দুবার মুখের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল, কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝেই সে বেশ ভালো করে খাইয়ে দিতে শুরু করে। শুধু তাই না, মনে হতে থাকে শুশুকটা যেন বেশ আগ্রহ নিয়েই খাচ্ছে। কয়েকদিন থেকেই নিশ্চয়ই না খেয়ে আছে। বকুলের শুশুকটার জন্য এত মায়া হল সেটি আর বলার মতো নয়। খাওয়ানো শেষ করে সে পানি দিয়ে আবার শুশুকটার সারা শরীর ভিজিয়ে দিতে শুরু করে, মাথায় গলায় হাত বুলাতে বুলাতে নরম গলায় আদর করে কথা বলতে থাকে।
বিকেলবেলা বকুল আবার খাবার নিয়ে এল। দুপুরবেলা পাড়ার সব বাচ্চাকাচ্চাদের মাছ ধরতে লাগিয়ে দিয়েছিল। তারা ছাঁকা জালে নদীর পাশে খাল এবং ডোবার ছোট মাছ ধরেছে, মাছের সাথে কাঁকড়া, ব্যাং, শামুক, গুগলিও উঠে এসেছে। সবগুলিকে থেঁতলে পিষে নিয়ে তার সাথে আবার মিশিয়েছে ভাতের মাড়, দুধ আর প্যারাসিটামল। বাবার তোশকের নিচে ফোড়ার কী-একটা ওষুধ ছিল সেটাও সে গুড়ো করে মিশিয়ে দিল, মানুষের ঘা যদি এই ওষুধ খেলে ভালো হতে পারে তাহলে শুশুকের কেন ভালো হবে না? যেসব বাচ্চাকাচ্চা মহাউৎসাহে মাছ ধরেছে, সেগুলোকে পিষতে বকুলকে সাহায্য করেছে তারা সবাই খুব উৎসাহী ছিল জিনিসটা নিয়ে কী করা হয় সেটা দেখার জন্যে। কিন্তু বকুল এই মুহূর্তে ঠিক তাদের বিশ্বাস করতে পারল না। সবাইকে নিয়ে মাঠে দাড়িয়াবান্দা খেলা শুরু করিয়ে সে সটকে পড়র। প্লাস্টিকের একটা বোতলে এই বিশেষ খাবার নিয়ে সে আবার ছুটে গেল শুশুকের কাছে। এবারে সে একটা পরিবর্তন লক্ষ করল, শুশুকটা তার শরীরের বেশির ভাগ পানিতে ডুবিয়ে রেখে শুধু মাথাটা শুকনো ডাঙায় ঠেকিয়ে রেখেছে। বকুল কাছে বসে শুশুকটার গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে মুখ হাঁ করিয়ে আবার তাকে খাইয়ে দিল। বকুল বেশ উৎসাহ নিয়ে আবিষ্কার করল সে এবার শুশুকটার মাঝে খানিকটা জীবনের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে–এটা এর লেজ নাড়ছে এবং খাবারের বাটিটা মুখের কাছে আনতেই সেটা খাবার জন্যে নিজেই মুখটা অল্প খুলে ফেলছে। বকুল শুশুকটার মাথায় গলায় হাত বুলিয়ে আবার অনেকক্ষণ আদর করে নরম গলায় কথা বলল। বকুলের ভুলও হতে পারে কিন্তু তার কেন জানি স্পষ্ট মন হল শুশুকটা তার কথা একটু একটু বুঝতে পারছে।
