জালাল জানে খোয়াব বা স্বপ্ন না, জেবা সত্যিই কাঁদছে। কিন্তু স্বীকার করতে চাচ্ছে না। কখনো স্বীকার করে না। সবসময় ভান করে সে খুব শক্ত মেয়ে কোনো কিছুতে কাবু হয় না। কিন্তু জালাল জানে জেবার ভেতরেও কোনো জায়গায় একটা দুঃখ আছে, কষ্ট আছে। তার নিজের যেরকম আছে। প্লটফর্মে যারা শুয়ে আছে তাদের সবার যেরকম আছে। কুক্কু ছাড়া–মনে হয় শুধু কুক্কুর মনে কোনো দুঃখ নেই।
জালাল আবার শুয়ে পড়ল। অনেকটা অভ্যাসের বশে কোমরে প্যান্টের ভাজে হাত দিল, সে যেটুকু টাকা জমাতে পারে তা প্যান্টের এই ভাঁজে লুকিয়ে সেলাই করা আছে। গত রাতে লুকিয়ে একবার গুনেছে, সাতশ টাকা হয়েছে তার জন্যে সাতশ টাকা অনেক টাকা। প্যান্টের পকেটে সবসময় কিছু খুচরা টাকা রাখে, যদি কোনো হেরোইনখোর তাদের উপর হামলা করে তা হলে এই টাকাগুলো নিয়েই যেন বিদায় হয়, তার আসল টাকা যেন ধরতে না পারে। জালাল যখন প্যান্টের ভঁজে হাত দিয়ে তার জমানো টাকাগুলো ছুঁয়ে দেখে তখনই তার মনটা ভালো হয়ে যায়।
আজকে কেন জানি তার মনটা ভালো হল না। কেন জানি তার মনটা খারাপ হয়ে থাকল। মাঝে মাঝেই এরকম হয়।
.
০২.
ইভা রিকশা থেকে নেমে স্টেশনের দিকে তাকাল, চকচকে নতুন মডার্ন টাইপের একটা বিল্ডিং–দেখে স্টেশন মনেই হয় না। রেল স্টেশন হলেই কেন জানি মনে হয় এটাকে লাল ইটের পুরানো একটা দালান হতে হবে। ইভা যখন ছোট ছিল তখন বাবার সাথে অনেক জায়গায় গিয়েছে–অনেক রেল স্টেশন দেখেছে, তাই স্টেশনের একটা ছবি তার মাথায় রয়ে গেছে–সেই ছবির সাথে না মিললে ইভার কেন জানি মনে হয় তাকে বুঝি কেউ ঠকিয়ে দিয়েছে!
রিকশা ভাড়া দিয়ে সে রিকশা থেকে নামল। ছোট ব্যাগটা হাতে নিয়ে সে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে কাঁচের দরজা ঠেলে স্টেশনের ভেতরে ঢোকে। আগামী তিন মাস প্রত্যেক বৃহস্পতিবার তাকে এই স্টেশনে আসতে হবে। হেড অফিস থেকে তাকে তিন মাসের জন্যে এখানে পাঠিয়েছে। এখানে যে কয়টা ব্রাঞ্চ অফিস রয়েছে তার প্রত্যেকটাতে ট্রেনিং দিতে হবে। অপরিচিত জায়গায় সবাই অপরিচিত মানুষ। এখানে টানা তিন মাস ইভা থাকতে পারবে না। তাই ঠিক করেছে শনিবার রাতে ঢাকা থেকে এখানে পৌঁছাবে আবার বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা ফিরে যাবে। ঢাকা শহরে রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম, বাতাসে ধূলাবালি আর পোড়া ডিজেলের গন্ধ, ফুটপাথে মানুষের ভিড়, অফিসে রাগি রাগি চেহারার মানুষ, দোকানপাটে জিনিসপত্রের আকাশ ছোঁয়া দাম তারপরেও ঢাকা শহরের বাইরে গেলে ইভার কেন জানি দম বন্ধ হয়ে আসে।
ইভা এক নম্বর পাটফর্মে এসে দাঁড়াল। ট্রেন আসার সময় হয়নি, প্যাসেঞ্জাররা এর মাঝে আসতে শুরু করেছে। ইভা আস্তে আস্তে পাটফর্মটা ঘুরে ঘুরে দেখে। পৃথিবীর সব রেল স্টেশনের মাঝেই একটা মিল আছে, মিলটা কী ইভা ঠিক ধরতে পারে না।
কে যেন ঠাণ্ডা একটা হাত দিয়ে তার কনুইটা ছুঁয়েছে। ইভা ঘুরে তাকাল। তিন-চার বছরের বাচ্চা একটা মেয়ে, মাথায় লাল রুক্ষ চুল, সারা শরীরে ধুলো ময়লার একটা আস্তরণ, ময়লা একটা গেঞ্জি হাঁটু পর্যন্ত চলে এসেছে। বাচ্চাটার চেহারায় অবশ্যি একটা তেজি ভাব আছে দেখে রোগা কিংবা দুর্বল মনে হয় না। বাচ্চা মেয়েটা মুখের মাঝে খুব দুঃখ দুঃখ একটা ভাব ফুটিয়ে বলল, “আফা দুইটা টেহা দিবেন?”
ইভা লক্ষ করল মেয়েটার সামনের দাঁতগুলো নেই। জিজ্ঞেস করল, “কী করবে টাকা দিয়ে?”
“ভাত খামু।”
“ভাত খাও নাই?”
“নাহ!” মেয়েটা চোখ সরিয়ে নিল, ইভা বুঝতে পারল বাচ্চা মেয়েটা এখনো চোখের দিকে তাকিয়ে সরল মুখে মিথ্যে কথা বলা শিখেনি। ইভা তার ব্যাগ খুলে চকচকে একটা দুই টাকার নোট বের করে জিজ্ঞেস করল, “কী নাম তোমার?”
“মায়া।”
ইভা মনে মনে ভাবল এই নামটিই তার হওয়ার কথা, তারপর দুই টাকার নোটটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “এই যে নাও।”
মায়া নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না–কোনো বকাবকি নেই, রাগারাগি নেই এতোটুকু বিরক্ত না হয়ে চাওয়া মাত্রই দুই টাকা দিয়ে দিল? প্রায় খপ করে নোটটা নিয়ে সে উল্টোদিকে হাঁটতে থাকে। কয়েক পা যেতেই তার জেবার সাথে দেখা হল, মায়া চোখ বড় বড় করে বলল, “একটা আফা চাইতেই দুই টেহা দিল।”
“কোন আফা?”
মায়া দেখিয়ে দেয়, “হুই যে লাল শাড়ি কালা ব্যাগ, সুন্দর মতোন আফা।”
কাজেই এবার জেবা তার ভাগ্য পরীক্ষা করতে গেল। কী আশ্চর্য! চাওয়া মাত্রই সেও দুই টাকা পেয়ে গেল, মুখ কাচুমাচু পর্যন্ত করতে হল না। মুহূর্তের মাঝে স্টেশনের সব বাচ্চার কাছে খবরটা পৌঁছে যায়। এক নম্বর প্লাটফর্মে সুন্দর মতোন একজন লাল শাড়ি পরা আপার কাছে চাইলেই সে দুই টাকা দিয়ে দিচ্ছে। শাহজাহান দুই টাকা নিয়ে নিল, মজিদ দুই টাকা নিয়ে নিল, মতিও গিয়ে একটা চকচকে দুই টাকার নোট পেয়ে গেল।
জালাল জগলুল ওস্তাদের তৈরি করা হাফ লিটারের পানির বোতল বিক্রি করছিল, চাইতেই দুই টাকা পাওয়া যাচ্ছে শুনে সেও পানি বিক্রি বন্ধ রেখে সুন্দর মতোন আপার কাছ থেকে দুই টাকা নিয়ে নিল। টাকাটা পকেটে রেখে জালাল বলল, “আপা মিনারেল নিবেন?”
ইভা জিজ্ঞেস করল, “কী নিব?”
জালাল পানির বোতলটাকে দেখিয়ে বলল, “মিনারেল।”
ইভা ফিক করে হেসে বলল, “ও পানি!”
