বাজে কথা বলবে না। তোমার কাউকেই দেখতে ইচ্ছা করে না।
তাজিনই নিশ্চয় এই পত্রলেখক। চিঠিপত্র লেখার অভ্যেস তার আছে। জন্মদিন, নববর্ষ এইসব বিশেষ দিনগুলোতে তার একটা সুন্দর কার্ড আসবেই।
এটাও বোধহয় একটা কার্ড। গেট ওয়েল কার্ড। বড়। আপার কাছে নানান ধরনের কার্ডের বিরাট সংগ্রহ।
ফিরোজ ভেবেছিল গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে চিঠি পড়বে। এতক্ষণ ধৈর্য ধরতে পারল না। তার কেবলই মনে হতে লাগল, চিঠির রচয়িতা হয়তবা অপালা। এ রকম মনে হবার কোনো কারণ নেই, কিন্তু তবু মনে হচ্ছে।
খাম খুলে ফিরোজের নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। অপালাই লিখেছে। আহ, এত গভীর আনন্দের ব্যাপারও ঘটতে পারে! চিঠিটি পড়তে ইচ্ছে করছে না। পড়া মানেই তো ফুরিয়ে যাওয়া। বরং গুটি-গুটি লেখা তিনটি পৃষ্ঠা নিয়ে সে সারা রাত জেগে বসে থাকবে। মাঝে-মাঝে ঘােণ নেবে। এই কাগজ কোনো ফুলের গুচ্ছ নয়। তবু নেশা-ধরানো সৌরভ নিশ্চয়ই লুকানো আছে। সবাই সে সৌরভ পাবে না। যার পাবার শুধু সে-ই পাবে।
ফিরোজ সাহেব।
আপনার হাসপাতালের ঠিকানা কোথায় পেয়েছি বলুন তো? না, এখন বলব না, আপনি ভাবতে থাকুন। এটা একটা ধাঁধা। দেখি আপনি কেমন বুদ্ধিমান। ধাঁধার জবাব দিতে পারেন কী না। আমি হাসপাতলে আপনাকে দেখতে অ্যাসিনি, যদিও খুব আসার ইচ্ছা ছিল। কেন আসিনি জানেন? ছোটবেলায় আমাদের একজন কাজের মেয়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসে। তাকে দেখবার জন্যে এক’দিন হাসপাতালে এসে কী দেখি, জানেন? দেখি দুতিন মাস বয়সী একটা বাচ্চাকে বড় একটা গামলায় শুইয়ে রাখা হয়েহে। বাচ্চাটা মারা। বাচ্চার নাভি ও নাকে লাল-লাল পিঁপড়া। এই কুৎসিত দৃশ্যটি দুঃস্বপ্ন হয়ে বার-বার আমার কাছে ফিরে আসে। হাসপাতালে যেতে আমার এই কারণেই ইচ্ছা করে না।
এখন বলি আপনার ঠিকানা কোথায় পেলাম। আপনার বান্ধবীর বাবার কাছ থেকে। আপনার বান্ধবীর সঙ্গেও আমার আলাপ হয়েছে। খুব লাজুক মেয়ে, তত্ত্ব কিছু কথা শেষ পর্যন্ত বলেছে। তবে আমার ধারণা, আপনার সঙ্গে সে খুব বক-বক করবে।
আচ্ছা, আপনি আমাকে কিন্তু একটা ভুল কথা বলেছেন। আপনাদের বিয়ের ব্যাপারে। ভুল আমি ভেঙে দিয়েছি। আপনার বান্ধবী, তার বাবা এবং মা সবাই খুব খুশি। তারা মনে-মনে সুপাত্রে হিসেবে আপনাকে কামনা করছিলেন। মনের কথাটা পর্যন্ত বললেন না! আপনার সঙ্গে এই দিকে আমার কিছু মিল আছে। আমিও নিজের মনের কথাটা কিছুতেই বলতে পারি না। আমার একটা ডাইরি আছে, মাঝে মাঝে তাতে লিখি; এই মুহূর্তে আপনাকে আমার একটা মনের কথা বলি। অামাব মনে হচ্ছে, এখন বললে সেটা খুব দোষেব হবে না। কথাটা হচ্ছে, আমি যখন জানলাম— আপনার একজন ভালবাসার মানুষ আছে, তখন আমার কেন জানি মন-খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মন–খারাপ ভাবটা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। কাটিতেই যে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। না। কাটাই ভাল। কী বলেন। আপনি? আমি ঠিক বলিনি? কিছু কিছু কষ্ট আছে সুখের মত। আবার কিছু কিছু কষ্ট খুব কঠিন।
এখন আপনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। আপনি সুস্থ হয়ে উঠলেই আপনাকে নিয়ে এক জায়গায় বেড়াতে যাব। যেখানে যাব, সেখানে চমৎকার একটা রহস্য আছে। দেখি, আপনি রহস্য ভেদ করতে পাবেন কি না; আমার মনে হয় আপনি পাববেন। কারণ, আপনার খুব বুদ্ধি—অন্তত আমার তাই ধারণা।
এই চিঠি আপনি পাবেন কী না বুঝতে পারছি না। কে জানে হয়ত চিঠি পৌঁছবার আগেই সুস্থ হয়ে ফিবে যাবেন। আগ্রহ নিয়ে এই চিঠি লিখছি, আপনি তা না পেলে খুব কষ্টের ব্যাপার হবে।
বিনীতা
অপালা
সারা রাত ফিরোজ ঘুমুতে পারল না।
কত বার যে চিঠিটা পড়ল! প্রতিবারই মনে হল এটা তো আগে পড়া হয়নি। এ্যাটেনডিং ফিজিশিয়ান এক সময় বললেন, আপনি এমন ছটফট করছেন কেন? কোনো অসুবিধা হচ্ছে কী?
জি হচ্ছে। অস্থির-অস্থির লাগছে।
অস্থির-অস্থির লাগার তো কোনো কারণ দেখছি না। অসুখ সেরে গেছে, কাল-পরশুর মধ্যে রিলিজ অর্ডার হবে। আসুন, আপনাকে একটা ট্রাংকুলাইজার দিয়ে দিই।
একটায় কাজ হবে না, বেশি করে দিন।
আপনার কী হয়েছে বলুন তো?
খুব আনন্দ হচ্ছে ডাক্তার সাহেব।
ফিরোজ ঘুমুতে গেল শেষরাতের দিকে। ঘুম ভাঙল অনেক বেলায়। নাশতা নিয়ে এসেছে। দরিদ্র দেশের হাসপাতালের তুলনায় বেশ ভাল নাশতা। দু পিস রুটি, একটা সেদ্ধ ডিম, একটা কলা, এক গ্লাস দুধ। নাশতা যে দিতে আসে, সে ট্রে নামিয়ে দিয়েই চলে যায় না। অপেক্ষা করে। কোনো রুগী যখন বলে ভাল লাগছে না, কিছু খাব না, তখন যে বড় খুশি হয়। ট্ৰে উঠিয়ে নিয়ে যায়। আজ তাকে খুশি করা গেল না। ফিরোজের খুব খিদে পেয়েছে। জানালা গলে শীতের রোদ এসেছে। খুবই ভাল লাগছে সেই রোদের দিকে তাকিয়ে থাকতে। বেড নাম্বার চল্লিশের বুড়ো রুগীটি খুব কষ্ট পাচ্ছে। গোঙানির মত শব্দ করছে। গভীর বেদনায় ফিরোজের মন ভরে গেল। তার ইচ্ছে করতে লাগল, রুগীর মাথার কাছে গিয়ে বসে। মাঝে মাঝে পৃথিবীর সবাইকে ভালবাসতে ইচেছ করে।
ফিরোজ সত্যি সত্যি বেড় নম্বর চল্লিশের দিকে এগিয়ে গেল। নরম গলায় বলল, আপনার কী খুব কষ্ট হচ্ছে?
দরজা খুলল বড় মেয়েটি
দরজা খুলল বড় মেয়েটি।
অপালা এর নাম জানে না। শুধু এর কেন, কারোরই নাম জানে না। আজও হয়ত জানা হবে না। অপালা ক্ষীণ স্বরে বলল, ভেতরে আসব? বড় মেয়েটি হ্যাঁ-না কিছুই বলল না। শুধু দরজা ছেড়ে একটু সরে গেল। অপালা বলল, তোমার নাম কী?
