এই রচনা নিয়ে কত কাণ্ড! আমাদের বাংলার স্যার কবিরউদ্দিন খুব খুশি। ক্লাসে সবাইকে পড়ে শোনালেন। শুধু তাই না, লেখাটা কপি করে তিনি দৈনিক বাংলার শিশুদের পাতায় ছাপতে দিলেন। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার, লেখাটা সেখানে ছাপাও হল। এটাই আমার প্রথম ছাপা লেখা এবং এটাই শেষ।
বাবা এই লেখা পড়লেন না। কারণ তিনি জানেনই না যে তার মেয়ের একটা লেখা ছাপা হয়েছে। আমার খুব ইচ্ছা করছিল বাবাকে লেখাটা পড়াই, আবার লজ্জাও লাগছিল। নিজের গোপন ভালবাসার কথা জানাতে লজা করে…।
আমার মনে হয় লজ্জা একটু বেশি। মা এত অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, আমার এত খারাপ লাগে, কিন্তু নিজের খারাপ লাগার কথা মাকে কখনো জানাই না। জানাতে ইচ্ছা করে না। সব সময় মনে হয় নিজের মনের কথা থাকুক না মনে! কী হবে সবাইকে জানিয়ে?
ভোরবেলা খুব সহজভাবে অপালা নিচে নেমে এল। নাশতার টেবিলে বসল। নিশানাথবাবুর স্ত্রী প্রায় ছুটে এলেন। চায়ের কাঁপে চুমুক দিতে দিতে অপালা বলল, একটা হাসির গল্প বলুন তো কাকিমা।
তিনি খুবই অবাক হলেন। এত অবাক হলেন যে হাসির গল্প মনে এল না। তিনি হাসির গল্পের জন্যে আকাশপাতাল হাতড়াতে লাগলেন। অপালা নাশতা শেষ করে অরুণা-বিরুণার খোঁজে গেল। অরুণা তাকে বিশেষ পছন্দ করে না, তবে বরুণা তার জন্যে পাগল। আজ দু’জনই ছুটে এল। লাফালাফি করতে লাগল। বরুণার স্বভাব হচ্ছে আদর দেখানোর জন্যে পা কামড়ে ধরার ভঙ্গি করা। অপালা যখন বলে–এই, এ সব কী! তখন তার ফুর্তির সীমা থাকে না। অনেকটা দূরে ছুটে যায়, আবার দৌড়ে এসে কামড়ের ভঙ্গি করে। আজ দু’জনই এক খেলা খেলছে। দুজনের মনেই আনন্দ।
গোমেজ এসে বলল, আপা, আপনার টেলিফোন।
গোমেজের হাতে এক কাপ কফি।
আপা, কফিটা নিন। অন্য রকম করে বানিয়েছি।
অন্য রকম মানে? লবণ দিয়েছ নাকি গোমেজ ভাই?
খেয়ে দেখেন আপা।
অপালা কফির কাপ হাতে টেলিফোন ধরতে গেল। টেলিফোন করেছেন মা। তার গলাটা কেমন অদ্ভুত শোনাচ্ছে। যেন খুব সূক্ষ্মভাবে কাঁপছে।
মা, তুই কেমন আছিস?
আমি ভাল আছি। আমি খারাপ থাকিব কেন? আমার তো আর হাটের অসুখ হয়নি।
আজ তোর পরীক্ষা না?
হ্যাঁ, বিকেলে।
তোর বাবা বলছিল, তুই নাকি পরীক্ষা দিবি না?
পরীক্ষা দেব না কেন? এত পড়াশোনা শুধু শুধু করলাম? তবে পরীক্ষাটা খুব খারাপ হবে।
তুই কাল তোর বাবাকে কী বলেছিলি? সে সারা রাত ঘুমুতে পারেনি।
ও-মা, সে কী কথা! আমি তো কিছু বলিনি। কই, বাবাকে দাও তো, তোমার কাছে আছেন না?
না। টিকিটের জন্যে ছোটাছুটি করছে। টিকিট পাচ্ছে না। এখন গেছে আরোফ্লটের অফিসে মস্কো হয়ে ঢাকায় যাবে।
তোমাদের এত ব্যস্ত হবার কিছু নেই। আমার কিছু হয়নি। আমি খুব ভাল আছি।
সত্যি ভাল আছিস?
হ্যাঁ, সত্যি ভাল। মিথ্যা ভালো আবার কেউ থাকে নাকি?
অপালা হেসে ফেলল।
প্রশ্ন হাতে নিয়ে অপালার জ্বর এসে গেল। সব অচেনা। মনে হচ্ছে অন্য কোনো সাবজেক্টের প্রশ্ন ভুল করে দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, লিখতে গিয়ে দেখল। সে লিখতে পারছে। উত্তরগুলো বেশ ভালই হল। রিগ্রেশন মডেলের একটা জটিল অঙ্কও শেষ পর্যন্ত মিলিয়ে ফেলল। কে জানে, হয়ত এই শেষ পরীক্ষাটাই তার সবচেয়ে ভাল হয়েছে।
অনার্সের কঠিন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে। বেশ লাগছে তার। ইচ্ছে করছে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরে বেড়াতে। গাড়িতে করে নয়, হেঁটে হেঁটে। ফিরোজ নামের ঐ ছেলেটিকে সঙ্গে নিলে কেমন হয়? তাকে গিয়ে সে যদি বলে, আপনি আপনার বান্ধবীর কাছে আমাকে নিয়ে চলুন, ঐ মেয়েটিকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
হাজি সাহেব অবাক হয়ে একটি দৃশ্য দেখলেন। বিশাল একটা নীল রঙের গাড়ি তাঁর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছে। লম্বা, ফর্সা একটা মেয়ে নামছে গাড়ি থেকে। বেশ সহজ-স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দোতলায় উঠে যাচ্ছে। যেন অনেক বার সে এসেছে। সব কিছু তার খুব ভাল চেনা। দোতলায় এই মেয়েটি কার কাছে যাচ্ছে? মেয়েটির বয়স এমন যে চট করে তুমি বলা যায় না। আবার তার মত একজন বয়স্ক লোকের পক্ষে আপনি করে বলাও মুশকিল তাঁর বড় মেয়ের বয়স নিশ্চয়ই এর চেয়ে বেশি। হাজি সাহেব ইতস্তত করে বলেই ফেললেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ?
অপালা সিঁড়ির মাঝামাঝি থেমে গেল। দুপা নেমে এসে বলল, ফিরোজ বলে একজন ভদ্রলোক থাকেন, তার কাছে।
উনি তো হাসপাতালে।
সে কী, কেন?
আকাশপাতাল জ্বর। আমিই হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি।
কোন হাসপাতাল, কত নম্বর বেড়, এইসব বলতে পারবেন?
মুখস্থ বলতে পারব না। আমার কিছু মনে থাকে না। তবে লেখা আছে। আমার সঙ্গে এস,
অপালা নেমে এল। হাজি সাহেব বললেন, ফিরোজ তোমার কে হয়?
কিছু হয় না। আমার খুব পরিচিত।
হাজি সাহেবের ভ্রূ কুঞ্চিত হল। বেফাঁস কিছু বলে ফেলছিলেন, বহু কষ্টে নিজেকে সামলালেন। মেয়েটাকে ঘরে নিয়ে হাসপাতালের নাম-ঠিকানা দেবার কোনো আগ্রহ এখন আর অনুভব করছেন না। তবু মুখের ওপর বলা যায় না … তুমি চলে যাও, তোমাকে কিছু দেব না।
অপালা হাজি সাহেবের পেছনে-পেছনে বসার ঘরে গিয়ে ঢুকল। সেখানে তার জন্যে বড় রকমের একটা বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। হাজি সাহেবের ছোট মেয়ে বিছানার ওপর বসে আছে। তার ছবিই সে ফিরোজের কাছে দেখেছে। মেয়েটি ছবির চেয়েও অনেক সুন্দর। তবে সে বোধহয় নিজের পরিবারের বাইরে কারো সঙ্গে মিশতে অভ্যস্ত নয়। খুব হকচিকিয়ে গেছে। একটি কথাও না-বলে চলে যাচ্ছে ভেতরের দিকে। কেমন অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাঁটছে। এমনভাবে হাঁটছে কেন?
