কাজের মেয়েটি সন্দেহজনক দৃষ্টি ফেলতে-ফেলতে যাচ্ছে। কর্মচারীর মত যে ঢুকেছে, সে মুনিবের মেয়ের সঙ্গে চা খাচ্ছে, দৃশ্যটিতে সন্দেহ করার মত অনেক কিছুই আছে।
আমার চায়ের জায়গাটা আপনার কেমন লাগছে?
খুব ভাল লাগছে।
আপনার বোধহয় একটু শীত-শীত লাগছে। এ-রকম একটা পাতলা জামা পরে কেউ শীতের দিনে বের হয়!
আহ, কী সহজ-স্বাভাবিক সুরে মেয়েটি কথা বলছে! কী প্রচুর মমতা তার গলায়! ফিরোজের মন কেমন যেন অন্য রকম হয়ে গেল।
আপনার বিয়েটা এখনো হয়নি, তাই না?
কোন বিয়ে?
ঐ যে একটি মেয়ের ছবি দেখালেন। বলছিলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে হবে।
ও, আচ্ছা। না, এখনো হয়নি। সামনের মাসে হবার সম্ভাবনা। মেয়ের এক চাচা আমেরিকাতে থাকেন। ছুটি পাচ্ছেন না বলে আসতে পারছেন না। মেয়ে আবার খুব আদরের। কেউ চায় না যে, তার অনুপস্থিতিতে বিয়ে হোক। বাঙালি হচ্ছে সেন্টিমেন্টাল জাত, বুঝতেই পারছেন।
প্রচুর মিথ্যা বলতে হয় বলেই মিথ্যা বলা আর্ট ফিরোজের খুব ভাল জানা। মিথ্যা কখনো এক লাইনে বলা যায় না। মিথ্যা বলতে হয়। আঁটাঘাট বেঁধে। সত্যি কথার কোনো ডিটেল ওয়ার্কের প্রয়োজন হয় না, কিন্তু মিথ্যা মানেই প্রচুর ডিটেল কাজ।
অপালা বলল, আপনি যে এখনো বিয়ে করেননি, সেটা কিভাবে বুঝলাম বলুন তো?
কীভাবে বুঝলেন?
আপনার গায়ের পাতলা জামা দেখে। এই ঠাণ্ডায় আপনার স্ত্রী কিছুতেই এমন একটা জামা গায়ে বাইরে ছাড়তেন না।
ফিরোজ লক্ষ্য করল, মেয়েটি ছেলেমানুষি ভঙ্গিতে হাসছে, যেন এই বিরাট আবিষ্কারে সে উল্লসিত।
আপনি কী আরেক কাপ চা খাবেন?
হ্যাঁ, খাব। এক কাপ খেলে খালে পড়ার সম্ভাবনা।
আপনি নিশ্চয়ই আমাকে খুব অহঙ্কারী মেয়ে ভেবে বসে আছেন, তাই না? আমি কিন্তু মোটেই অহঙ্কারী না।
তাই তো দেখছি!
একা-একা থাকতে-থাকতে স্বভাবটা আমার কেমন অন্য রকম হয়ে গেছে।
এক-একা থাকেন কেন?
ইচ্ছা করে কি আর থাকি? বাধ্য হয়ে থাকতে হয়। মা অসুস্থ। বাবা সারাক্ষণই বাইরে-বাইরে
ঘুরছেন।
অন্য আত্মীয়স্বজনরা আসেন না?
না।
কেন?
জানি না কেন। আমাকে বোধহয় পছন্দ করেন না।
আপনাকে পছন্দ না-করার কী আছে? আমার তো মনে হয় আপনার মত চমৎকার মেয়ে এই গ্রহে খুব বেশি নেই।
ফিরোজ লক্ষ্য করল, মেয়েটি আবার রেগে যাচ্ছে। তার মুখে আগের কাঠিন্য ফিরে আসছে।
ফিরোজের আফসোসের সীমা রইল না। অপালা বলল, আসুন, আপনাকে গোট পর্যন্ত আগিয়ে দিই।
অর্থাৎ অত্যন্ত ভদ্র ভাষায় বলা–বিদেয় হোন। ফিরোজের মন-খারাপ হয়ে গেল। আরেক বার আসার আর কোনো উপলক্ষ নেই। দিন সাতেক পর সে যদি এসে বলে ঐদিন একটা খাম কি আপনার এখানে ফেলে গেছি।–তাহলে তা কী বিশ্বাসযোগ্য হবে? মনে হয় না। এই মেয়েটি অসম্ভব বুদ্ধিমতী।
সে গেট পর্যন্ত ফিরোজের সঙ্গে-সঙ্গে এল, কিন্তু একটি কথাও বলল না। ফিরোজ যখন বলল, যাই তাহলে। সে তার জবাবেও চুপ করে রইল। শুধু দারোয়ানকে বলল, অরুণা এবং বরুণাকে এখন ছেড়ে দাও।
নিশানাথবাবু রাতের বেলা খবর নিতে এলেন। এই মানুষটি সাধারণত খুব হাসিখুশি। কিন্তু আজ কেমন যেন গম্ভীর লাগছে। মুখে খুব চিন্তিত একটা ভঙ্গি। অপালা, বলল, ম্যানেজার কাকু, আপনার কী শরীর খারাপ?
না, শরীর ভালই আছে।
বাবার কোনো খবর পেয়েছেন?
না। ইংল্যান্ডে পৌঁছেছেন, সেই খবর জানি। তারপর আর আমি কিছু জানি না। স্যার মাঝে মাঝে এ রকম ডুব মারেন, তখন সব সমস্যা একসঙ্গে শুরু হয়?
কোনো সমস্যা হচ্ছে কী?
না, তেমন কিছু না।
নিশানাথবাবু এড়িয়ে গেলেন। অপালার মনে হল, বড় কোনো সমস্যা হয়েছে। কারখানাসংক্রান্ত কোনো সমস্যা, যা এরা অপালাকে বলবে না। অপালারও এ-সব শুনতে ইচ্ছে করে না। সমস্যা থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই ভাল।
ম্যানেজার কাকু!
কী মা?
ফিরোজ বলে যে-ছেলেটি আমাদের ঘর ঠিক করে দিল, তাকে একটি চিঠি দিতে বলেছিলাম, দেননি কেন?
নিশানাথবাবু বিস্মিত হয়ে বললেন, দিয়েছি তো!
ও, তাহলে উনি বোধহয় পাননি। রেজিস্ট্রি করে দেয়া দরকার ছিল।
রেজিস্ট্রি করেই তো দিয়েছি। চিঠির সঙ্গে একটা রেভিনিউ স্ট্যাম্প-বসানো রিসিট ছিল। উনি তো। সেখানে সই করে ফেরত পাঠিয়েছেন! কাজেই আমার চিঠি না-পাওয়ার তো কোনো কারণ নেই। আমি বরং কাল তাকে জিজ্ঞেস করব।
না, জিজ্ঞেস করার দরকার নেই।
নিশানাথবাবু ইতস্তত করে বললেন, ছেলেটি আজ এখানে এসেছিল, তাই না?
হ্যাঁ।
এদের বেশি প্রশ্রয় দেয়া ঠিক না, মা। কাজ করেছে টাকা নিয়েছে, ব্যস, ফুরিয়ে গেল। আবার এসে এত কিসের চা খাওয়াখাওয়ি!
অপালা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। নিশানাথবাবুর হঠাৎ এখানে আসার উদ্দেশ্য স্পষ্ট হচ্ছে। তিনি এমনি-এমনি আসনেনি। নিশ্চয়ই তাকে খবর দেয়া হয়েছে। টেলিফোনে জানানো হয়েছে।
মা অপালা।
জি।
তুমি একা-একা থাক, তোমার বোধহয় খারাপ লাগে।
না, আমার খারাপ লাগে না।
খারাপ না-লাগলেও লোনলি তো নিশ্চয়ই লাগে! আমি তোমার কাকিমাকে বলেছি, সে এসে থাকবে।
কোনো দরকার নেই।
না দরকার আছে।
বেশ, দরকার থাকলে তাকে নিয়ে আসুন। তবে আপনি কিন্তু কাকু শুধু-শুধু ভয় পাচ্ছেন। ঐ ছেলে আর এখানে আসবে না।
নিশানাথবাবুকে কোনো কথা বলার সুযোগ না-দিয়ে অপালা উঠে গেল। তার প্রচণ্ড মাথা ধরেছে।
ফখরুদ্দিন সাহেব মৃদু স্বরে বললেন, আমি একটা টেলিফোন করব। দয়া করে ব্যবস্থা করে দিন।
