এ-রকম সে করে। তার ভাষায়, দুঃসময়ের জন্যে ঘুম স্টক করে রাখা। সেই স্টক-করা ঘুমের কারণে ভবিষ্যতে কোনো রকম আলস্য ছাড়াই না-ঘুমিযে থাকতে পারে। উট যেমন দুঃসময়ের জন্যে পানি জমা করে রাখে, অনেকটা সে-রকম। শুধু দুপুরে খাবার সময় পাশের ইরাবতী হোটেলে খেতে গেছে। বাংলাদেশ হওয়ায় এই একটি লাভ, সুন্দর-সুন্দর নামের ছড়াছড়ি। পানের দোকানের নাম ময়ূরাক্ষী; জুতোর দোকানের নাম সোহাগ পাদুকা।
ইরাবতী রেস্টুরেন্টের নাম হওয়া উচিত ছিল–নালাবতী। পাশ দিয়ে কর্পোরেশনের নর্দমা গিয়েছে। নর্দমাগুলি বানানোর কায়দা এমন যে, পানি চলে যায়, কিন্তু ময়লা জমা হয়ে থাকে। সেই পূতিগন্ধময় নরকের পাশে খাবার ব্যবস্থা। তবে রান্না ভাল। পচা মাছও এমন করে রোধে দেয় যে দ্বিতীয় বার যেতে ইচ্ছে করে। ইরাবতী রেস্টটুরেন্টে ফিরোজের তিনশ টাকার মত বাকি ছিল। সে বাকি মিটিয়ে আরো দুশ টাকা অ্যাডভান্স ধরে দিল। দিনকাল পাল্টে গেছে। অ্যাডভান্স পেয়েও লোকজন খুশি হয় না। ম্যানেজার এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন কিছুক্ষণ আগে একটি জ্যান্ত ইদুর গিলে ফেলেছে। সেই ইন্দুর হজম হয়নি, পেটে নড়াচড়া করছে।
ফিরোজ বলল, আছেন কেমন ভাইসাব?
ভালই। আপনারে তো দেখি না।
সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত। সিনেমায় নেমে পড়েছি, বুঝলেন?
ম্যানেজার ফুস করে বলল, ভালই।
আপাতত হিরোইনের বড় ভাইয়ের রোল করছি। মোটামুটি একটা সেন্ট্রাল ক্যারেক্টার। বই রিলিজ হলে দেখবেন। পাস দিয়ে দেব।
নাম কী বইয়ের?
নয়া জিন্দেগি। হিট বই হবে।
ফিরোজ রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে মিষ্টি পান। কিনল। রাতে আর খেতে আসবে না। ঘরেই যা হোক কিছু খেয়ে নেবে, কাজেই পাউরুটি, কলা এবং এক কৌটা মাখন। কিনল। বাজারে নতুন বরই উঠেছে, খেতে ইচ্ছা করছে। ভাংতি টাকা সব শেষ। একটা পাঁচশ টাকার নোট আছে, সেটা ভাঙাতে ইচ্ছা করছে না। বরই না কিনেই সে ফিরে এল। ছেলেমানুষি একটা আফসোস মনে জেগে রইল।
হাজি সাহেব বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে আছেন। ফিরোজ হাসিমুখে এগিয়ে গেল।
স্লামালিকুম।
ওয়ালাইকুম সালাম। কেমন আছেন ফিরোজ সাহেব?
জি, ভাল।
ক’দিন ধরে দেখি না আপনাকে?
দারুন ব্যস্ত! আজি একটু ফাঁকা পেয়েছি, ভাবলাম আপনাকে জরুরি কথাটা বলে যাই।
কী জরুরি কথা?
ঐ যে আপনার মেয়ের ছবি নিয়ে গেলাম যে!
ও, আচ্ছা। বসেন, চা খাবেন?
তা খাওয়া যায়।
হাজি সাহেব ভেতরে গিয়ে চায়ের কথা বলে এলেন। ফিরে এসে আগ্রহী চোখে তাকিয়ে রইলেন।
ঐ যে আপনার কাছ থেকে ছবি নিয়ে গিয়েছিলাম, ছবি দেখে সবার এক কথা–মেয়ে কী ছবির মত সুন্দর? ফটোজেনিক ফেস ভাল থাকলে অনেক সময় এলেবেলে মেয়েকেও রাজকন্যার মত লাগে।
হাজি সাহেব ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেললেন। মেয়ে যদি ছবির কাছাকাছিও হয়, তাহলেও ওদের কোনো আপত্তি নেই। যেদিন বলবেন, সেদিনই বিয়ে।
আপনি কী মেয়ের অসুবিধার কথাটা বলেছেন?
পাগল হয়েছেন। এখন আমি এইসব বলব? কথাবার্তা মোটামুটি পাকা হয়ে যাবার পর খুব কায়দা করে…।
না, যা বলবার এখনই বলবেন। মেয়েকে আমি একটা বাড়ি লিখে দেব, এটাও বলবেন। ৪৩ কাঁঠাল বাগান। একতলা বাড়ি। ইচ্ছা করলে বাড়ি দেখে আসতে পারেন।
মেয়েই দেখলাম না, আর বাড়ি!
বাড়িটাই লোকে আগে দেখে, মেয়ে দেখে পরে। তবে মেয়েকে আপনি দেখবেন। আসতে বলেছি। আসুন, ভেতরে গিয়ে বসি।
তারা বসার ঘরে পা দেয়ামাত্র হাজি সাহেবের ছোট মেয়েটি ঘরে ঢুকাল। কী শান্ত স্নিগ্ধ, মুখ! গভীর কালো চোখে ডুবে আছে চাপা কষ্ট। সেই কষ্টের জন্যেই বুঝি এমন টলটলে চোখ।
ফিরোজ বলল, দাঁড়িয়ে আছ কেন, বস।
মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে বসল। তার আচার-আচরণে কিছুমাত্র জড়তা লক্ষ্য করা গেল না। সে সরাসরি তাকিয়ে আছে, চোখ নামিয়ে নিচ্ছে না।
কী নাম তোমার?
লতিফা।
প্রায় চার বছর তোমাদের এদিকে আছি। নামটা পর্যন্ত জানি না। খুবই অন্যায়। তুমি কী আমার নাম জান?
জানি।
হাজি হাসেব বললেন, লতিফা, তুই এখন ভেতরে যা। চা দিতে বল।
লতিফা সঙ্গে সঙ্গে উঠে চলে গেল। ফিরোজ একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস চেপে ফেলল। তার ইচ্ছে করছে, বলে–পাত্র হিসেবে আমাকে আপনার কেমন লাগে?
বলা হল না। আধুনিক সমাজে বাস করার এই অসুবিধে। মনের কথা খোলাখুলি কখনো বলা যায় না। একটি মেয়েকে ভাল লাগলেও তাকে সরাসরি সেই কথা বলা যাবে না। অনেক ভনিতা করতে হবে। অনেক চড়াই-উৎরাই পার হতে হবে।
হাজি সাহেব বললেন, আমার মেয়েটা বড় আদরের।
ফিরোজ কিছু বলল না। সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটার একটা আলাদা মজা আছে। যে-কোনো দিকে যাওয়া যায়, যেখানে ইচ্ছে সেখানে থেমে যাওয়া যায়। এই সৌভাগ্য কজনার হয়? সবাই ব্যস্ত। সবাই ছুটছে। এর মধ্যে দু’একজন অন্য রকম থাকুক না, যাদের ছোটার ইচ্ছে নেই, প্রয়োজনও নেই।
এখন প্রায় বিকেল! হাঁটতে-হাঁটতে অপালাদের বাড়ির সামনে চলে যাওয়া যায়। কেন জানি এই অহঙ্কারী মেয়েটিকে দেখতে ইচ্ছে করছে। তার কঠিন মুখ, চোখের তীব্র দৃষ্টিও কেন জানি মধুর। এর ব্যাখ্যা কী? কোনো ব্যাখ্যা নেই। এই রহস্যময় পৃথিবীর অনেক কিছুই ব্যাখ্যা করা যায় না। কবি, দার্শনিক, শিল্পী.. এরা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। সেই চেষ্টা কত যুগ আগে শুরু হয়েছে, এখনও চলছে। ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ হয়নি।
