কিছু দূরে যাইয়া হোসেন আকাশপানে দুই-তিন বার চাহিয়া ভূতলে পড়িয়া গেলেন। বিষাক্ত তীরবিদ্ধ ক্ষতস্থানের জ্বালা, পিপাসার জ্বালা, শোকতাপ,-বিয়োগদুঃখ,-নানা-প্রকার জ্বালায় অধীর হইয়া পড়িলেন। জেয়াদ্ এবং ওমর প্রভৃতি ভাবিল যে, হোসেনের মৃত্যু হইয়াছে। কিছুণ পরে হস্তপদ সঞ্চালনের ক্রিয়া দেখিয়া নিশ্চয় হোসেনের মৃত্যু মনে করিল না, মৃত্যু নিকটবর্তী জ্ঞান করিয়া কিঞ্চিৎ দূরে স্থিরভাবে দণ্ডায়মান রহিল।
হোসেন ভূমিতলে পড়িয়া রহিয়াছেন। সীমারের সামান্য শরাঘাতে তাদৃশ মহাবীরের প্রাণবিয়োগ হইবে, অসম্ভব ভাবিয়া কেহই হোসেনের নিকট যাইতে সাহসী হইল না; কেহ কেহ নিশ্চয় মৃত্যু অনুমান করিতেছে; মুখেও বলিতেছে যে, “হোসেন আর নাই! চল, হোসেনের মস্তক কাটিয়া আনি।” দুই এক পদ যাইয়া আর অগ্রসর হইতে সাহস হয় না। হোসেনের মৃত্যু সংবাদ এজিদের নিকট লইয়া গেলে কোন লাভই নাই। এজিদ্ সে সংবাদ বিশ্বাস করিয়া কখনোই পুরস্কার দান করিবেন না। মস্তক চাই! ভাবিয়া ভাবিয়া সীমার বলিল, “জেয়াদ্! তুমি তো খুব সাহসী, তুমিই মৃত হোসেনের মাথা কাটিয়া আন!”
জেয়াদ্ বলিল, “হোসেনের মাথা কাটিতে আমার হস্ত স্থির থাকিবে না, সাহসও হইবে না! আমি উহা পারিব না। যদি দুর্বলতাবশতঃ হোসেন ধরাশায়ী হইয়া থাকে কিংবা অন্য কোন অভিসন্ধি করিয়া মড়ার ন্যায় মাটিতে পড়িয়া থাকে, আমাকে হাতে পাইলে, বল তো আমার কী দশা ঘটিবে? যাহার ভয়ে জঙ্গলে পলাইয়া প্রাণরক্ষা করিয়াছি, ইচ্ছা করিয়া তাহার হাতে পড়িব? আমি তো কখনোই যাইব না! মাথা কাটিয়া আনা তো শেষের কথা, নিকটেও যাইতে পারিব না!”
অলীদকে সম্বোধন করিয়া সীমার বলিলেন, “ভাই অলীদ! তোমার অভিপ্রায় কী? তুমি হোসেনের মাথা কাটিয়া আনিতে পারিবে না কি?”
অলীদ উত্তর করিল, “আমি হোসেনের বিরুদ্ধে যাহা করিয়াছি, তাহাই যথেষ্ট হইয়াছে! এজিদের বেতনভোগী হইয়া আজ কার্বালা প্রান্তরে যাহা আমি করিলাম, জগৎ বিলয় না হওয়া পর্যন্ত মানবহৃদয়ে সমভাবে তাহা পাষাণাঙ্কবৎ খোদিত থাকিবে! ইহার পরিণামফল কি আছে, তাহা,-ভবিতব্য কি আছে, তাহা কে জানে ভাই?-ভাই তোমরা আমায় মার্জনা কর, আমি পারিব না! হোসেনের মাথাও আমি কাটিতে চাহি না, লক্ষ টাকা পুরস্কারেরও আশা করি না। যাহার হৃদয়ে রক্তমাংসের লেশমাত্রও নাই, লক্ষ টাকার লোভে সেই এই নিষ্ঠুর কার্য করুক!”
সদর্পে সীমার বলিয়া উঠিল, “দেখিলাম তোমাদের বীরত্ব! -দেখিলাম তোমাদের সাহস! -বুঝিলাম তোমাদের ক্ষমতা! -এই দেখ, আমি এখনই হোসেনের মাথা কাটিয়া আনি!”-এই কথা বলিয়াই সীমার খঞ্জরহস্তে একলম্ফে হোসেনের বক্ষের উপর গিয়া বসিল। যে সীমারের নামে অঙ্গ শিহরিয়া উঠিয়াছিল, যে সীমারের নামে হৃদয় কাঁপিয়া উঠিয়াছিল, পাঠক! এই সেই সীমার! সুধার খঞ্জর-হস্তে সেই সীমার, ঐ হোসেনের বরে উপর বসিয়া গলা কাটিতে উদ্যত হইল!!!
হোসেন জীবিত আছেন। উঠিবার শক্তি নাই। অন্যমনস্কে কি চিন্তায় অভিভূত ছিলেন, তিনিই জানেন। চক্ষু মেলিয়া বক্ষের উপর খঞ্জর হস্তে সীমারকে দেখিয়া বলিতে লাগিলেন, “তুমি ঈশ্বরের সৃষ্ট জীব-তুমি আমার বক্ষের উপর বসিলে। নূরনবী মোহাম্মদের মতাবলম্বী হইয়া ইমাম হোসেনের বক্ষের উপর পা রাখিয়া বসিলে! তোমার কী পরকাল বলিয়া কিছুই মনে নাই? এমন গুরুতর পাপের জন্য তুমি কী একটুও ভয় করিতেছ না?”
সীমার বলিল, “আমি কাহাকেও ভয় করি না!-আমি পরকাল মানি না। নূরনবী মোহাম্মদ কে? আমি তাহাকে চিনি না। তোমার বুকের উপর বসিয়াছি বলিয়া পাপের ভয় দেখাইতেছ? সে ভয় আমার নাই! কারণ আমি এখনই এই খঞ্জরে তোমার মাথা কাটিয়া লইব। যাহার মাথা কাটিয়া লক্ষ টাকা পুরস্কার পাইব, তাহার বুকের উপর বসিতে আবার পাপ কি? সীমার পাপের ভয় করে না।”
“সীমার! আমি এখনই মরিব। বিষাক্ত তীরের আঘাতে আমি অস্থির হইয়াছি। বক্ষের উপর হইতে নামিয়া আমায় নিশ্বাস ফেলিতে দাও। একটু বিলম্ব কর!-একটু বিলম্বের জন্য কেন আমাকে কষ্ট দিবে? আমার প্রাণ বাহির হইয়া গেলে মাথা কাটিয়া লইও। দেহ যত খণ্ড করিতে ইচ্ছা হয়, করিয়ো। একবার নিশ্বাস ফেলিতে দাও! আজ নিশ্চয়ই আমার মৃত্যু। এই কার্বালা-প্রান্তরেই হোসেনের জীবনের শেষ কার্য সমাপ্ত। জীবনের শেষ এই র্কাবালায়। ভাই সীমার! তুমি নিশ্চয়ই আমার মাথা কাটিয়া লইতে পারিবে। আমি আশীর্বাদ করিতেছি, এই কার্য করিয়া তুমি জগতে বিখ্যাত হইবে। ক্ষণকাল অপেক্ষা কর।”
অতি কর্কশস্বরে সীমার বলিল, “আমি তোমার বুকের উপর চাপিয়া বসিয়াছি, মাথা না কাটিয়া উঠিব না। যদি অন্য কোন কথা থাকে, বল। বুকের উপর হইতে একটুও সরিয়া বসিব না।” এই বলিয়া সীমার আরো দৃঢ়রূপে চাপিয়া বসিয়া হোসেনের গলায় খঞ্জর চালাইতে লাগিল।
হোসেন বলিতে লাগিলেন, “সীমার! আমার প্রাণ এখনই বাহির হইবে; একটু বিলম্ব কর।-এই কষ্টের উপর আর কষ্ট দিয়া আমাকে মারিয়ো না।”
সীমার তীক্ষ্ণধার খঞ্জর হোসেনের গলায় সজোরে চালাইতে লাগিল, কিন্তু চুল পরিমাণ কাটিতে পারিল না। বারবার খঞ্জরের প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে লাগিল। হস্তদ্বারা বারংবার খঞ্জরের ধার পরীক্ষা করিয়া দেখিল। পুনরায় অধিক জোরে খঞ্জর চালাইতে লাগিল। কিছুতেই কিছুই হইল না-তিলমাত্র চর্মও কাটিল না। সীমার অপ্রস্তুত হইল। আবার খঞ্জরের প্রতি ঘনঘন দৃষ্টিপাত করিতে লাগিল। আবার ভাল করিয়া দেখিয়া খঞ্জরের ধার পরীক্ষা করিল।
