কথা শুনিয়া হোসেন মহাব্যস্ত হইলেন। খাদ্যাদির অভাব না থাকিলেও জল বিহনে কিরূপে বাঁচিবেন, এই চিন্তাই প্রবল হইল। মদিনার বহুসংখ্যক লোক সঙ্গে রহিয়াছে। অল্পবয়স্ক বালক-বালিকাগণ যখন পিপাসায় কাতর হইবে, জিহ্বাকণ্ঠ শুষ্ক হইয়া অর্ধোচ্চারিত কথা বলিতেও ক্ষমতা থাকিবে না, তখন কি করিবেন? এই চিন্তায় হোসেন ফোরাত নদীর দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া কি উপায়ে জয়লাভ করিবেন, ভাবিতেছেন, দেখিতে পাইলেন যে, চারিজন সৈনিক পুরুষ তাঁহার শিবির লক্ষ্য করিয়া সম্ভবতঃ কিছু ত্রস্তে চলিয়া আসিতেছে। মনে মনে ভাবিলেন, মোস্লেম আমার কুফা গমনে বিলম্ব দেখিয়া হয়ত সৈন্যগণকে কোন স্থানে রাখিয়া অগ্রে আমার সন্ধান লইতে আসিতেছে।
আগন্তুক চতুষ্টয় যত নিকটবর্তী হইতে লাগিল, ততই তাঁহার কল্পনা যে ভ্রমসঙ্কুল, তাহা প্রমাণ করিয়া দিল। শেষে দেখিলেন যে, তাহারা অপরিচিত; এমন কি কোন স্থানে তাহাদিগকে দেখিয়াছেন কি না, তাহাও বোধ হইল না। সৈন্য চতুষ্টয় নিকটে আসিয়াই হোসেনের পদ চুম্বন করিল। তন্মধ্য হইতে অপেক্ষাকৃত সজ্জিত পুরুষ কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া নত শিরে বলিতে লাগিলেন, “হজরত! দুঃখের কথা কী বলিব, আমরা এজিদের সৈন্য, কিন্তু আপনার মাতামহ-উপদিষ্ট ধর্মে দীতি। আমাদের কথায় অবিশ্বাস করিবেন না, শত্রুর বেতনভোগী বলিয়া শত্রু মনে করিবেন না। আমরা কিছুরই প্রত্যাশী নহি, কেবল আপনার দুঃখে দুঃখিত হইয়া কয়েকটি মাত্র কথা বলিতে অতি সাবধানে আপনার শিবিরে আসিয়াছি। সময় যখন মন্দ হইয়া উঠে, তখন চতুর্দিক হইতেই অমঙ্গল ঘটিয়া থাকে। এক্ষণে আপনার চতুর্দিকেই অমঙ্গল দেখিতেছি, মোস্লেমের ন্যায় হিতৈষী বন্ধু জগতে আপনার আর কেহ হইবে না। আবদুল্লাহ্ জেয়াদ আপনার প্রাণ বিনাশ করিবার অভিপ্রায়েই ষড়যন্ত্র করিয়াছিল। ভাগ্যগতিকে মোস্লেম কুফায় যাইয়া আবদুল্লাহ্ জেয়াদের হস্তে বন্দি হইলেন! শেষে তাহারই চক্রে ওত্বে অলীদ্ এবং মারওয়ানের সহিত যুদ্ধে মোস্লেম বীরপুরুষের ন্যায় শত্রু বিনাশ করিয়া সেই শত্রুহস্তেই প্রাণ পরিত্যাগ করিয়াছেন। তাঁহার সঙ্গে যে সহস্র সৈন্য ছিল, তাহারাও ওত্বে অলীদ ও জেয়াদের হস্তে প্রাণবিসর্জন করিয়া স্বর্গবাসী হইয়াছে। এক্ষণে সীমার, ওমর, আপনার প্রাণবধের জন্য নানাপ্রকার চেষ্টায় আছে। মারওয়ান, ওত্বে অলীদ্ এ পর্যন্ত আসিয়া উপস্থিত হয় নাই। এজিদের আজ্ঞাক্রমে আমরাই ফোরাতনদীকূল একেবারে বন্ধ করিয়াছি। মনুষ্য দূরে থাকুক পশু-পক্ষীকেও না ছাড়িয়া দিলে নদীতীরে যাইতে কাহারো সাধ্য নাই। সংক্ষেপে সকলই বলিলাম, যাহা ভাল বিবেচনা হয় করিবেন।” এই বলিয়াই আগন্তুক হোসেনের পদচুম্বন করিয়া চলিয়া গেল।
মোস্লেমের দেহত্যাগের সংবাদে হোসেন মহাশোকাকুল হইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিতে লাগিলেন, “হা ভ্রাতঃ মোস্লেম! যাহা বলিয়া গিয়াছিলে তাহাই ঘটিল। হোসেনের প্রাণবিনাশ করিতেই যদি আবদুল্লাহ্ জেয়াদ্ কোন ষড়যন্ত্র করিয়া থাকে, তবে সে যন্ত্রে আমিই পড়িব, হোসেনের প্রাণ তো রক্ষা পাইবে? ভাই! নিজ প্রাণ দিয়া হোসেনকে জেয়াদের হস্ত হইতে রক্ষা করিলে। তুমি তো মহা অক্ষয় স্বর্গসুখে সুখী হইয়া জগৎ-যন্ত্রণা হইতে পরিত্রাণ পাইলে। আমি দুরন্ত কারবালা প্রান্তরে অসহায় হইয়া বিন্দুমাত্র জলের প্রত্যাশায় বোধ হয় সপরিবারে জীবন হারাইলাম। রে দুরন্ত পাপিষ্ঠ জেয়াদ্! তোর চক্রে মোস্লেমকে হারাইলাম। তোর চক্রেই আজ সপরিবারে জল বিহনে মারা পড়িলাম!” মোস্লেমের জন্য হোসেন অনেক দুঃখ করিতে লাগিলেন। ওদিকে জলাভাবে তাঁহার সঙ্গিগণ মধ্যে মহাকোলাহল উপস্থিত হইল।
ক্রমে সকলেই পিপাসাক্রান্ত হইয়া হোসেনের নিকট আসিয়া বলিতে লাগিলেন, “জলাভাবে এত লোক মরে! পিপাসায় সকলেই শুষ্ককণ্ঠ, এক্ষণে আর তা সহ্য হয় না!”
সকাতরে হোসেন বলিলেন, “কী করি। বিন্দুমাত্র জলও পাইবার প্রত্যাশা আর নাই। ঈশ্বরের নামামৃত পান ভিন্ন পিপাসা-নিবৃত্তির আর এখন কি উপায় আছে? বিনা জলে যদি প্রাণ যায়, সকলেই সেই করুণাময় বিশ্বনাথের নাম করিয়া পিপাসা নিবৃত্তি কর। সকলেই আপন আপন স্থানে যাইয়া ঈশ্বরোপাসনায় মনোনিবেশ কর।” সকলেই পরমেশ্বরে মনোনিবেশ করিলেন। ক্রমে ৯ই তারিখ কাটিয়া গেল। দশম দিবসের প্রাতে হোসেনের শিবিরে মহাকোলাহল। প্রাণ যায় আর সহ্য হয় না! এই প্রকার গগনভেদী শব্দ উঠিতে লাগিল। পরিবারস্থ সকলের আর্তনাদে এবং কাতরস্বরে হোসেন আর তিষ্ঠিতে পারিলেন না। উপাসনায় ক্ষান্ত দিয়া, হাসনেবানু ও জয়নাবের বস্ত্রাবাসে যাইয়া তাঁহাদিগকে সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন। কন্যা, পুত্র এবং অল্পবয়স্ক বালক-বালিকারা আসিয়া এক বিন্দু জলের জন্য তাঁহাকে ঘিরিয়া দাঁড়াইল। সাহারবানু দুগ্ধপোষ্য শিশুসন্তানটি ক্রোড়ে করিয়া আসিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিতে লাগিলেন, “আজ সাত রাত নয় দিনের মধ্যে একবিন্দু জলও স্পর্শ করিলাম না। পিপাসায় আমার জীবন শেষ হউক, তাহাতে কিছুমাত্র দুঃখ করি না; কিন্তু স্তনের দুগ্ধ পর্যন্ত শুষ্ক হইয়া গিয়াছে। এই দুগ্ধপোষ্য বালকের প্রাণনাশের উপক্রম হইল। এই সময়ে একবিন্দু জল-কোন উপায়ে ইহার কণ্ঠে প্রবেশ করাইতে পারিলেও বোধ হয় বাঁচিতে পারিত।” হোসেন বলিলেন, “জল কোথায় পাইব? এজিদের সৈন্যগণ ফোরাত নদীর কূল আবদ্ধ করিয়াছে, জল আনিতে কাহারো সাধ্য নাই।”
