হারেস বলিল,”শিরচ্ছেদের কথা ছিল না। ধরিয়া আনিবার আদেশ ছিল। জীবিত অবস্থায় তাহাদিগকে দরবার পর্যন্ত আনা দুঃসাধ্য বলিয়াই মাথা আনিয়াছি। শত শত জন এই বালকদ্বয়ের সন্ধানে ছিল। আমাকে দরবারে আনিতে দেখিলেই কাড়িয়া লইত। তাহারা রাজদরবারে আনিয়া স্বচ্ছন্দে পুরস্কার লাভ করিয়া যাইত। পরিশ্রম আমার-লাভ করিত ডাকাতদল। আমি বাদশাহ নামদারের মঙ্গলকামী হিতৈষী। চির-শত্রুর বংশে কাহাকেও রাখিতে নাই। হয়তো সময়ে এই বালকদ্বয় বীরশ্রেষ্ঠ বীর শত্রুর ন্যায় দণ্ডায়মান হইত। আমি একেবারে নির্মূল করিয়া দিয়াছি। আমাকে স্বীকৃত পুরস্কারে পুরস্কৃত করিয়া বিদায় করুন, আজ দুই দিন দুই রাত্রি আমার আহার নাই-নিদ্রা নাই-বিশ্রামের সময় অবসর কিছুই নাই। এই দুইটি বালকের মস্তক গ্রহণ করিতে আমার দুটি পুত্র এবং স্ত্রীর মাথা কাটিয়াছি।” দরবার সমেত সকলে মহা দুঃখিত হইলেন। নরপতি জেয়াদ বলিলেন, “ওহে বীর! সে কী কথা?”
“কী কথা! -আপনার শত্রুকুল নির্মূল করিতে আমার বংশ নিপাত করিলাম, তত্রাচ আপনার নিকট যশলাভ করিতে পারিলাম না। যাহার জন্যে এত কাণ্ড তাহা-অর্থাৎ সে মোহরগুলি পাইব কি-না তাহাতেও এখন সন্দেহ হইল।”
মন্ত্রীদল মধ্য হইতে একজন বলিলেন, “আপনার পুরস্কার ধরা আছে। -আর তিনটি খুন কি প্রকারে কোথায় করিলেন বলুন শুনি।”
“তিনটি খুনই বটে! কেন করিলাম শুনুন। আমার দুই পুত্র, এক স্ত্রী-এই তিনটি। তাহারা কিছুতেই এই শত্রুবালকদের শির কাটিতে দিবে না। বাধা দিতে আরম্ভ করিল! একে একে বাধা দিল। একে একে লাল বসন পরাইয়া ফোরাতজলের কূলে শয়ন করাইয়া দিলাম। এক স্থানেই সকলের শিরচ্ছেদে রক্তপাত। -নড়াচড়া-পরে সকলের দেহই ফোরাতজলে ক্ষেপণ। -অবগাহন-নিমজ্জন-বিসর্জন!”
আবদুল্লাহ্ জেয়াদ্ বলিলেন, “এ দৃশ্য আমি দেখিতে পারি না। নিরপরাধ বালকদ্বয়ের শির যে আপন হাতে কাটিতে পারে, সেই কার্যে বাধা দিয়াছিল-কাহারা? এই নরপিশাচের সন্তান দুইজন আর সহধর্মিণী স্বয়ং। তাহাদিগকেও বিনাশ করিয়াছে! -মোহরের এতই লোভ যে দুইটি পুত্র একটি স্ত্রী, সকলকেই বিনাশ করিয়াছে-এমন নররাক্ষসের শির কিছুতেই স্বস্থানে থাকিতে পারে না। হায়! হায়! একই সময়ে পাঁচটি মানবজীবন শেষ করিয়াছে। আমার আদেশ-মোস্লেম-পুত্রদ্বয়হন্তা হারেস, এই দুই বালকের শির সম্মানের সহিত মাথায় করিয়া ফোরাতকূলে লইয়া যাইবে। এই দুই বালকের মস্তক যে স্থানে দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়াছিল, সেই স্থানে সেই অস্ত্রে মহাপাপীর মস্তক দেহবিচ্ছিন্ন করিয়া, ফোরাতজলে নিক্ষেপ করিয়া জল অপবিত্র করিয়ো না। শৃগাল-কুকুরের ভক্ষণের সুযোগ করিয়া দিয়ো। স্লেম-পুত্রদ্বয়ের দেহখণ্ড ফোরাতজলে ভাসাইয়া দিয়াছে, কী করিব।-কোন উপায় নাই। বিশেষ সন্ধান করিয়া দেখিয়ো। যদি এই যুগল ভ্রাতার মৃতদেহ প্রাপ্ত হওয়া যায়, তবে রীতিমত কাফন-দাফন করিয়া যথোচিতরূপে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াদি করিয়া আমার আদেশ সম্পূর্ণ করিয়ো এবং কার্য শেষে আমাকে সংবাদ জ্ঞাপন করিয়ো।”
ঘাতক প্রহরী কার্যকারক তখনই রাজাদেশ মত কার্য করিতে প্রবৃত্ত হইল। মোস্লেম-পুত্রদ্বয়ের খণ্ডিত শির, মহামূল্য বস্ত্রে আবরিত করিয়া হারেস-শিরে চাপাইয়া ফোরাতকূলে লইয়া চলিল। ফোরাতকূলে যাইয়া দেখিল, রক্ত আর বালিতে জমাট বাঁধিয়া একস্থানে চিহ্নিত হইয়া রহিয়াছে। আরো এক আশ্চর্য ঘটনা দেখিল যে, মোস্লেম পুত্রদ্বয়ের শিরশূন্য যুগল দেহ গলাগলি করিয়া জড়াইয়া জলে ভাসিতেছে। কী আশ্চর্য! স্রোতজলে যে মৃতদেহ ভাসাইয়া দিয়াছিল, স্রোত বিপরীতে কে টানিয়া আনিল? আরো আশ্চর্য সংযোগ করিল কে? রাজকীয় কার্যকারক এই অত্যাশ্চর্য ঘটনা দেখিয়া, তাঁহার মনেও একটা কথা হঠাৎ উদয় হইল। তিনি পাত্রস্থ দুইটি মস্তক ফোরাতজলের নিকটে ধরিতেই জড়িত যুগল দেহ ভাসিতে ভাসিতে আসিয়া আপন-আপন মস্তকে সংলগ্ন হইল। রাজকর্মচারী দুই মৃতদেহ উঠাইয়া পৃথক্ করিতে বহু চেষ্টা করিলেন, কিন্তু কিছুতেই পৃথক্ করিতে পারিলেন না। সে গলাগলির হস্তবন্ধন ছিন্ন করিতে পারিলেন না। সে অপূর্ব ভ্রাতৃস্নেহ-হস্তবন্ধন বহু যত্নেও ছিন্ন করিতে পারিলেন না। শবদেহের সে আশ্চর্য ভ্রাতৃমায়া বন্ধন ছাড়াইয়া পৃথক্ করিতে সম হইলেন না। বাধ্য হইয়া দুই ভ্রাতার দেহ একত্রে স্নান করাইয়া একত্রে কাফন করিয়া এক গোরে দাফন্ করিলেন।
তাহার পর হারেসের প্রতি রাজাজ্ঞা যাহা ছিল, তাহা সম্পাদন করিতেই হারেস বলিল, “আমার উচিত শাস্তি হইল। অতিরিক্ত লোভের অতিরিক্ত ফল ভোগ করিলাম। হা-পুত্র! হা-স্ত্রী!! হা-লোভ!!!”
হারেসের খণ্ডিত দেহ বধ্যভূমিতে পড়িয়া রহিল।
মহরম পর্ব ২৪ প্রবাহ
হোসেন সপরিবারে ষষ্টি সহস্র সৈন্য লইয়া নির্বিঘ্নে কুফায় যাইতেছেন। কিন্তু কতদিন যাইতেছেন, কুফার পথের কোন চিহ্নই দেখিতে পাইতেছেন না। একদিন হোসেনের অশ্বপদ মৃত্তিকায় দাবিয়া গেল। ঘোড়ার পায়ের খুর মৃত্তিকা মধ্যে প্রবেশ করিয়া যাইতে লাগিল, কারণ কি? এইরূপ কেন হইল? কারণ অনুসন্ধান করিতে করিতে হঠাৎ প্রভু মোহাম্মদের ভবিষ্যৎ বাণী হোসেনের মনে পড়িল। নির্ভীক হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার হইল, অঙ্গ শিহরিয়া উঠিল। হোসেন গণনা করিয়া দেখিলেন, আজ মহরম মাসের ৮ম তারিখ। তাহাতে আরো ভয়ে ভয়ে অশ্বে কশাঘাত করিয়া কিঞ্চিৎ অগ্রে গিয়া দেখিলেন যে, এক পার্শ্বে ঘোর অরণ্য, সম্মুখে বিস্তৃত প্রান্তর। চক্ষুনির্দিষ্ট সীমামধ্যে মানবপ্রকৃতি-জীবজন্তুর নামমাত্র নাই। আতপতাপ নিবারণোপযোগী কোনপ্রকার বৃক্ষও নাই, কেবলই প্রান্তর-মহাপ্রান্তর। প্রান্তর-সীমা যেন গগনের সহিত সংলগ্ন হইয়া ধূ-ধূ করিতেছে। চতুর্দিকে যেন প্রকৃতির স্বাভাবিক স্বরে আক্ষেপ-হায়! হায়! শব্দ উত্থিত হইয়া নিদারুণ দুঃখ প্রকাশ করিতেছে। জনপ্রাণীর নামমাত্র নাই, কে কোথা হইতে শব্দ করিতেছে তাহাও জানিবার উপায় নাই। বোধ হইল যেন শূন্যপথে শতসহস্র মুখে, ‘হায়! হায়!’ শব্দে চতুর্দিক আকুল করিয়া তুলিয়াছে।
