শান সাহেবের খুব খুশির ভাব। তার খেয়াঘাট স্টিমারঘাটে পরিণত হতে চলেছে।
সকাল সন্ধ্যায় দুবার স্টিমার ঘাটে ভিড়বে। জেটি নেই–খেয়া পারাপারের বড় নৌকাটা দিয়ে তাকে যাত্রী ও মালপত্র স্টিমারে ওঠানো নামানোর দায় সামলাতে হবে।
কেবল সাধারণ যাত্রী আর সাধারণ মালপত্রের দায়। কোনো কারখানা যদি ভারি মালপত্র আনায় বা পাঠায়, সেগুলো ওঠানো নামানোর ব্যবস্থা কারখানাই করবে।
জবরদস্ত বিরাট চেহারা ছিল শান সাহেবের। বয়সের ভাটা দেখা দিয়েছে।
ঈশ্বরকে বসিয়ে বলে, একটা কাজ তোমাকে দিতে পারি–যদি মন দিয়া কর।
ঈশ্বর বলে, কাজ নিলে মন দিয়া করব না?
শান সাহেব জানায় যে, কাজ খুব সোজা, খাটুনি নেই। তাকে শুধু ঘাটে হাজির থাকতে হবে–সকাল থেকে সন্ধ্যাতক। তাকে নজর রাখতে হবে যাত্রী বা মাল বিভাড়ায় যেন খেয়ায় বা স্টিমারে ওঠেও না, নামেও না।
ঈশ্বর মনে মনে হাসে। কাজ খুব সোজাই বটে। খাটুনি নাই কিন্তু দায়টা যেন খাটুনির চেয়ে তুচ্ছ!
যাই হোক, তবু এটা কাজ। খাটুনি বা দায় কোনো কিছুকেই সে ডরাতে রাজি নয়।
সারাদিন ঘাটেই কাটে।
খানিক রাত্রি পর্যন্ত।
দ্বিতীয় ক্ষেপের স্টিমার কোনোদিন সন্ধ্যায় এসে ভেড়ে, কোনোদিন সন্ধ্যা পার হয়ে যায়।
খাটুনি নেই।
শুধু দায়।
খেয়ানৌকা সারাদিনে কয়েকবার ময়নাদলে পাড়ি দেয়–যাত্ৰী আর মাল নিয়ে।
স্টিমার এসে নোঙর ফেলে দাঁড়ালে যাত্রী ও মাল ওঠায় নামায়।
খাটে মাঝিমাল্লারাই।
কিন্তু ভাড়ার পয়সা কে ফাঁকি দিচ্ছে খেয়াল রাখতে তার হয় প্রাণান্ত।
সারাদিনে তার হাতে অনেক পয়সা জমে। বেহিসাবী পয়সা অনায়াসে মেরে দিতে পারে। কত যাত্ৰী আর কত মালের ভাড়া যে নগদ আদায় করেছে, শান সাহেব কি আর সে হিসাব রাখে!
রাত্রে বাড়ি ফেরার আগে সে পাই পয়সা হিসাব করে শান সাহেবকে বুঝিয়ে দেয়।
পাঠশালায় পড়েছিল।
সে বিদ্যাটা কাজে লাগছে।
কেবল মাসিক বেতন নয়।
দৈনিক নগদ আদায়ের টাকা থেকেও শান সাহেব তাকে কমিশন হিসাবে কিছু দেয়।
রোজ পাঁচসিকা দেড়টাকার মতো মেলে।
দায় সামলাতে, টাকা-পয়সা আদায় করতে, প্ৰাণ যায়–তবু নিজেকে ঈশ্বর ভাগ্যবান মনে। করে।
কিন্তু সে কি জানে না যে ভাগ্য তার চিরদিনই মন্দা
নইলে শান সাহেব সকালবেলা এসে কয়েক ঘণ্টা গুম খেয়ে থেকে মেহেদি রাঙানো নুর চুলকোতে চুলকোতে গভীর আফসোসের সঙ্গে কেন তাকে দুঃসংবাদটা জানাবে!
শান সাহেব বলে, এবার দফা নিকেশ হল ঈশ্বর। বটে নাকি?
হ্যাঁ রে ভাই। ঘাট চলবে না, জেটি বানাবে। অ্যাদ্দিনের কারবার খতম হয়ে যাবে। দেখি চেষ্টা করে–তোমাদের কজনকে যদি কাজে রাখা যায়।
তার মানেই তার কাজের দফাও শেষ।
কোনোরকম ঠেকান দিয়ে তবু দিন কাটানো যাচ্ছিল, আবার শুরু হবে নিরুপায় হয়ে কাজের চেষ্টায় ঘুরে বেড়ানো, কোনোদিন আধপেটা, কোনোদিন উপবাস।
ওই কচি বাচ্চা নিয়ে রোগা শরীরে গৌরী কি সামলাতে পারবে সে ধাক্কা?
দু-চারদিনেই শেষ হয়ে যাবে।
শান সাহেবের অবস্থাও এবার কাহিল হয়ে পড়বে।
তার বিরাট পরিবার–অনেক পোষ্য। জমির আয়ে বছরে টেনেটুনে চার-পাঁচটা মাস কোনোমতে চালিয়ে দিতে পারে।
প্রধান নির্ভর ছিল এই খেয়াঘাটের আয়। মাঝিমাল্লারা অনুগত। নৌকাটা তার নিজের সম্পত্তি–ভাড়া হিসাবেও কিছু পায়, খেয়াঘাট নিলামের মোট দাম থেকে সেটা কাটা যায়।
এত বড় নৌকা কিনে নতুন মাঝিমাল্লা লাগিয়ে নতুন লোককে খেয়াঘাট জমা দেবার অনেক। হাঙ্গামা। নিলামটা প্রকাশ্যে হলেও শান সাহেব বরাবর খেয়াঘাট জমা পেয়ে এসেছে।
তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে লিমিটেড কোম্পানি এবার খেয়া পারাপারের দায় নেবে, জেটি বানাবে, নিয়মিত স্টিমার চালাবে।
যদি কোনো উপায় করা যায় তারই চেষ্টায় শান সাহেব ছুটোছুটি করছিল।
খেয়াঘাটে ঈশ্বর ছিল একা।
শীত প্রায় বিদায় নিয়েছে। বছর কাবার হতে মোটে মাস দু-এক বাকি। মাঝে মাঝে দক্ষিণ থেকে সমুদ্রের বাতাস এসে দেহ মনে নতুন জীবনের স্পন্দন সঞ্চালন করে দিয়ে যায়।
কী সুন্দর যে ছিল সেই সন্ধ্যা! ক্লাবের পশ্চিম দিকের বারান্দায় বসে তখন দূরে হলদে কাদায় ঘোলা নদী আর নদীর ওপারে ঘন সবুজ বনের মোটামুটি ছবি দেখা যায়। ওই বনের আড়ালে সূর্য অস্ত গিয়ে সন্ধ্যা নামার দৃশ্য দেখে ক্লাবের বারান্দায় বসে পেগে চুমুক দিতে দিতেও রোমাঞ্চিত হওয়া যায়।
কারো কারো পক্ষে পেগ তুচ্ছ মনে করা, অভিশাপ মনে করা পর্যন্ত সম্ভব হয়। এখানকার সূর্যাস্তের দৃশ্যই যদি এমনভাবে মুগ্ধ করে আনন্দ দিয়ে সঞ্জীবিত করে দিতে পারে দেহপ্ৰাণ, পেগের কেন প্রয়োজন হবে মানুষের?
জগৎ জুড়ে প্রকৃতির আরো জমকালো আরো রোমাঞ্চকর অফুরন্ত দৃশ্য সম্পদ তো আছে!
অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসার এবং দু-একটা পেগ পেটে যাবার পর অবশ্য এই চিন্তা অনেকের মতো প্রভাসেরও হাস্যকর মনে হয়।
প্রকৃতির রূপ দেখেই যদি মানুষ জীবনে আনন্দের অভাব আর দুঃখ-বেদনার-হতাশার প্রভাব কাটিয়ে দিতে পারত তবে আর ভাবনা ছিল না।
ইভা মিষ্টি ভসনার সুরে রবার্টসনকে বলে, এত ঘন ঘন পেগ চালাবার কোনো মানে হয় ডিয়ার?
প্রভাসও সমানেই চালাচ্ছিল, তাকে সে কিছু বলে না।
প্রভাসের গ্লাস খালি দেখে রবার্টসন একটু হেসে বলে, না না ডার্লিং এবার থেকে ধীরে ধীরে চলবে। গোড়ায় একটু জমিয়ে নিলাম। বলে এক চুমুকে নিজের গ্লাসটা শেষ করে দেয়।
নতুন গ্লাসে প্রভাস দু-এক চুমুক মাত্র দিয়েছিল।
