‘না। শুধু জামা বদলে এলাম। কাপড়ও অন্যকরম করে পরেছি। বুঝতে পারছেন না?’
‘বুঝতে পারছি।’
‘কি রকম দেখাচ্ছে আমাকে?’
‘তা কি বলা যায় আনন্দ?’ হেরম্ব সিঁড়ির উপরের ধাপে বসেছিল। তার পায়ের নিচে সকলের তলার ধাপে আনন্দ বসতেই সেও নেমে এল। আনন্দ চেয়ে না দেখেই একটু হাসল।
হেরম্ব কোনো কথা বলল না। আনন্দের এখন নীরবতা দরকার এটা সে অনুমান করেছিল। হাঁটুর সামনে দুটি হাতকে বেঁধে আনন্দ বসেছে। তার ছড়ানো বাবরি চুল কান ঢেকে গাল পর্যন্ত ঘিরে আসছে। তার ছোট ছোট নিশ্বাস নেবার প্রক্রিয়া চোখে দেখা যায়।
আনন্দ এক সময় নিশ্বাস ফেলে বলে, ‘জামাকাপড়! কি ছোট মন আমাদের!’
‘আমাদের, আনন্দ।’
‘না, আমাদের। এসব সৃষ্টি করেছি আমরা। এ আমাদের এক ধরনের ছল।’
নিঃশব্দে সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। তারা চুপ করে বসে থাকে। আনন্দকে চমকে দেবার ভয়ে হেরম্ব নড়তে সাহস পায় না; জোরে নিশ্বাস ফেলতে গিয়ে চেপে যায়। আকাশে চাদ গতিহীন। আনন্দের নাচের প্রতীক্ষায় হেরম্বের মনেও সমস্ত জগৎ স্তব্ধ হয়ে গেছে।
তারপর এক সময় আনন্দ উঠে গেল। ঘাসে-ঢাকা জমিতে গিয়ে চাঁদের দিকে মুখ করে সে ধ্ৰুপতে বসল। প্ৰণামের ভঙ্গিতে মাথা মাটিতে নামিয়ে দুহাত সম্মুখে প্রসারিত করে স্থির হয়ে রইল।
আনন্দ কতক্ষণ নৃত্য করল হেরন্থের সে খেয়াল ছিল না।
চাঁদের আলো তার চোখে নিভে নিভে মান হয়ে এসেছিল নাচের গোড়াতেই। এটা তার কল্পনা অথবা আকাশের চাঁদকে মেঘে আড়াল করেছিল, হেরম্ব বলতে পারবে না। কিন্তু শ্লথ, মন্থর গতিছন্দ থেকে আনন্দের নৃত্য চঞ্চল হতে চঞ্চলতর হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জ্যোৎস্নাও যে উজ্জ্বল হতে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছিল। এ কথা হেরম্ব নিঃসংশয়ে বলতে পারে। হয়তো চোখে তার ধাঁধা লেগেছিল। হয়তো চন্দ্ৰকলা নৃত্যের শোনা ব্যাখ্যাটি তার মনে প্রভাব বিস্তার করেছিল।
পূর্ণিমা থেকে আনন্দ কিন্তু অমাবস্যায় ফিরে যেতে পারে নি। নৃত্য যখন তার চরম আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে, তার সর্বাঙ্গের আলোড়িত সঞ্চালন এক ঝলক আলোর মতো প্রখর দ্রুততায় হেরম্বের বিস্ময়চকিত দৃষ্টির সামনে চমক সৃষ্টি করেছে, ঠিক সেই সময় অকস্মাৎ সে থেমে গেল।
ঘাসের উপর বসে তাকে হাঁপাতে দেখৈ হেরম্ব তাড়াতাড়ি উঠে তার কাছে গেল।
‘কি হল, আনন্দ?’
‘ভয় করছে।’ আনন্দ বলল। রুদ্ধস্বরে, কান্নার মতো করে।
সে থারথার করে কাঁপছে। তার মুখ আরক্ত, সর্বাঙ্গ ঘামে ভেজা। তার দুচোখে উত্তেজিত অসংযত চাহনি। চুলগুলি তার মুখে এসে পড়ে ঘামে জড়িয়ে গিয়েছিল। চুল পিছনে সরিয়ে হেরম্ব তার কানের পাশে আটকে দিল। তাকে দম নেবার সময় দিয়ে বলল, ‘ভয় করছে? কেন ভয় করছে, আনন্দ?’
আনন্দ বলল, ‘কি জানি। হঠাৎ সমস্ত শরীর আমার কেমন করে উঠল! মনে হল, এইবার আমি মরে যাব। মরে যেতে আমার কখনো ভয় হয় নি। আজ কেন যে এরকম করে উঠল! অন্য দিন নাচের পর ঘুম আসে। আজ শরীর জ্বালা করছে!’
‘গরম লাগছে?’
‘না। ঝাঁজের মতো জ্বালা করছে–হাড়ের মধ্যে। আমি এখন কি করি! কেন এই রকম হল?’
‘একটু বিশ্রাম করলেই সেরে যাবে। শোবে আনন্দ? শুয়ে পড়লে হয়তো —’
আনন্দ হেরম্বের কোলে মাথা রেখে ঘাসের উপর শুয়ে পড়ল। তার নিশ্বাস ক্রমে ক্রমে সরল হয়ে আসছে, কিন্তু মুখের অস্বাভাবিক উত্তেজনার ভাব একটুও কমে নি। হেরম্বের চোখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে থাকতেই তার দুচোখ জলে ভরে গেল।
‘এরকম হল কেন আজ? তোমার জন্যে?’
‘হতে পারে। আমি তো সহজ লোক নই। পৃথিবীতে আমার জন্যে অনেক কিছুই হয়েছে।’
অন্ধ যে ভাবে আশ্রয় খোজে, আনন্দ তেমনি ব্যাকুল ভঙ্গিতে তার দুটি হাত বাড়িয়ে দিল। হেরম্বের হাতের নাগাল পেতেই শক্ত করে চেপে ধরে সে যেন একটু স্বস্তি পেল।
‘ঠিক করে কিছুই বুঝতে পারছি না। আরো যেন কত কি দুঃখ একসঙ্গে ভোগ করছি। আচ্ছা! তুমি তো কবি, তুমি কিছু বুঝতে পারছ না?’
‘আমি কবি নই, আনন্দ। আমি সাধারণ মানুষ।’
আনন্দ তার এই সবিনয় অস্বীকারের প্রতিবাদ করল।
‘তুমি আমার কবি। কবি না হলে কেউ এমন ঠাণ্ডা হয়? সন্ধ্যার সময় তোমাকে দেখেই আমি চিনেছিলাম। তুমি না থাকলে আমি এখন এখানে গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদে নাচের জ্বালায় জ্বলে মরে যেতাম।‘
‘জ্বালা কমে নি আনন্দ?’
‘কমেছে।’
‘নাচ শেষ করবে?’
‘না। নাচ শেষ করে ঘুমোবে কে? তার চেয়ে এ কষ্টও ভালো। ঘুম তো মরে যাওয়ার সমান, শুধু সময় নষ্ট।’
আনন্দ হঠাৎ উৎকৰ্ণ হয়ে বলল, ‘ক’টা বাজল? অনেক দূরে থানায় ঘণ্টা বাজছে। ক’টা বাজল শুনলে?’
হেরম্ব বলল, ‘ও ঘণ্টা ভুল, আনন্দ। এখন ঠিক মাঝরাত্রি।’
আনন্দ বলল, ‘তাই হবে, চাঁদটা আকাশের ঠিক মাঝখানে এসেছে।’
ওইখানে, আকাশের চাঁদের কাছে পৌঁছে, আনন্দ একেবারে নির্বাক হয়ে গেল। হেরম্বের দেহের আশ্রয়ে নিজের দেহকে আরো নিবিড়ভাবে সমৰ্পণ করে সে আকাশের নিষ্প্রভ তারা আবিষ্কারের চেষ্টা করতে লাগল।
হেরম্ব এখন তাও জানে। তাই তার গালের উত্তেজনা, তার চিবুকের মনোরম কুঞ্চন, তার স্বপ্নাতুর চোখে কালো ছায়ার গাঢ় অতল রহস্য মিথ্যা নয়। তার ওষ্ঠে তাই শুধু স্পৰ্শই নয়, জ্যোৎস্নাও আছে। ওর মুখের প্রত্যেকটি অণুর সঙ্গে পরিচিত হবার ইচ্ছ। আর তাই অর্থহীন এমন একটি মুখকে তিল তিল করে মনের মধ্যে সঞ্চয় করার অপরাধ নেই, সময়ের অপচয়
