আনন্দ পুরাতন প্রশ্ন করল।
‘কি ভাবছেন?’
‘অনেক কথাই ভাবছি, আনন্দ। তার মধ্যে প্রধান কথাটা এই, আমার কি হয়েছে।’
‘কি হয়েছে?’
‘কি রকম একটা অদ্ভুত কষ্ট হচ্ছে।’
আনন্দ হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘আমারও হয়। নাচবার আগে আমার ওরকম হয়।’
হেরম্ব উৎসুক হয়ে বলল, ‘তোমার কি রকম লাগে?’
‘কি রকম লাগে?’ আনন্দ একটু ভাবল, ‘তা বলতে পারব না। কি রকম যেন একটা অদ্ভুত—’
‘আমি কিন্তু বুঝতে পারছি, আনন্দ।’
‘আমিও আপনারটা বুঝতে পারছি।‘
পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে তারা হেসে ফেলল।
আনন্দ বলল, ‘আপনার খিদে পায় নি? কিছু খান।’
হেরম্ব বলল, ‘দাও। বেশি দিও না।’
একটি নিঃশব্দ সঙ্কেতের মতো আনন্দ যতবার ঘরে আনাগোনা করল, জানালার পাটগুলি ভালো করে খুলে দিতে গিয়ে যতক্ষণ সে জানালার সামনে দাঁড়াল, ঠিক সম্মুখে এসে যতবার সে চোখ তুলে সোজা তার চোখের দিকে তাকাবার চেষ্টা করল—তার প্রত্যেকটির মধ্যে হেরম্ব তাঁর আত্মার পরাজয়কে ভুলে যাবার প্রেরণা আবিষ্কার করল। তার ক্রমে ক্রমে মনে হল, হয়তো এ পরাজয়ের গ্লানি মিথ্যা। বিচারে হয়তো ভুল আছে। হয়তো জয়-পরাজয়ের প্রশ্নই ওঠে না।
হেরম্বের মন যখন এই আশ্বাসকে খুঁজে পেয়েও সন্দিগ্ধ পরীক্ষকের মতো বিচার করে না দেখে। গ্ৰহণ করতে পারছে না, আনন্দ তার চিন্তায় বাধা দিল। আনন্দের হঠাৎ মনে পড়ে গিয়েছে, সিঁড়িতে বসে হেরম্বকে একটা কথা বলবে, মনে করেও বলা হয় নি। কথাটা আর কিছুই নয়। প্রেম যে একটা অস্থায়ী জোরালো নেশ্যমাত্র হেরম্ব এ খবর পেল কোথায়! একটু আগেও এ কথা জিজ্ঞাসা করতে আনন্দের লজ্জা হচ্ছিল। কিন্তু কি আশ্চৰ্য, এখন তার একটুও লজ্জা করছে না।
‘আপনাকে সত্যি কথাটা বলি। সন্ধ্যার সময় আপনাকে যে বন্ধু বলেছিলাম, সেটা বানানো কথা। এতক্ষণে আপনাকে বন্ধু মনে হচ্ছে।’
‘এখন কত রাত্রি?’
‘কি জানি। দশটা সাড়ে-দশটা হবে। ঘড়ি দেখে আসব?’
‘থাক। আমার কাছে ঘড়ি আছে। দশটা বাজতে এখনো তের মিনিট বাকি।’
আনন্দ বিস্মিতা হয়ে বলল, ‘ঘড়ি আছে, সময় জিজ্ঞেস করলেন যে?’
হেরম্ব হেসে বলল, ‘ঘড়ি দেখতে জান কিনা পরখ করছিলাম। মালতী—বৌদির সাড়াশব্দ যে না?’
আনন্দ হাসল। বলল, ‘অত বোকা নাই, বুঝলেন? এমনি করে আমার কথাটা এড়িয়ে যাবেন, তা হবে না। রোমিও জুলিয়েট বেঁচে থাকলে তাদের প্ৰেম অল্পদিনের মধ্যে মরে যেত, আপনি কি করে জানলেন বলুন।’
হেরম্ব এটা আশা করে নি। লজ্জা না করার অভিনয় করতে আনন্দের যে প্রাণান্ত হচ্ছে, এটুকু ধরতে না পারার মতো শিশুচোখ হেরম্বের নয়। একবার মরিয়া হয়ে সে প্রশ্ন করছে, তার সম্বন্ধে এই সুস্পষ্ট ব্যক্তিগত প্রশ্নটা। তার এ সাহস অতুলনীয়। কিন্তু প্রশ্নটা চাপা দিয়েও আনন্দের শরম-তিক্ত অনুসন্ধিৎসাকে চাপা দেওয়া গেল না দেখে হেরম্ব অবাক হয়ে রইল।
‘বুদ্ধি দিয়ে জানলাম।’ হেরম্ব এই জবাব দিল।
‘শুধু বুদ্ধি দিয়ে?’
‘শুধু বুদ্ধি দিয়ে আনন্দ! বিশ্লেষণ করে।’ আনন্দের বালিশ থেকে সদ্য আবিষ্কৃত লম্বা চুলটির একপ্রান্ত আঙুল দিয়ে চেপে ধরে ফু দিয়ে উড়িয়ে সেটিকে হেরম্ব সোজা করে রাখল।
‘জল খেয়ে আসি!’ বলে আনন্দ গেল পালিয়ে।
হেরম্ব তখন আবার ভাবতে আরম্ভ করল যে কোন অজ্ঞাত সত্যকে আবিষ্কার করতে পারলে তার হৃদয়ের চিরন্তন পরাজয়, জয়-পরাজয়ের স্তর চূত হয়ে সকল পার্থিব ও অপার্থিব হিসাবনিকাশের অতীত হয়ে যেতে পারে। চোখ দিয়ে দেখে, স্পর্শ দিয়ে অনুভব করে, বুদ্ধি দিয়ে চিনে ও হৃদয় দিয়ে কামনা করে, মর্তলোকের যে আত্মীয়তা আনন্দের সঙ্গে তার স্থাপিত হওয়া সম্ভব, আত্মার অতীন্দ্ৰিয় উদাত্ত আত্মীয়তার সঙ্গে তার তুলনা কোথায় রহিত হয়ে গেছে। কোন হৃদ্য যুক্তি, সীমারেখার মতো, এই দুটি মহাসত্যকে এমনভাবে ভাগ করে দিয়েছে যে, তাদের অস্তিত্ব আর পরস্পরবিরোধী হয়ে নেই, তাদের একটি অপরটিকে কলঙ্কিত করে দেয় নি।
আনন্দের ফিরে আসতে দেরি হয়। হেরম্বের ব্যাকুল অন্বেষণ তার দেহকে অস্থির করে দেয়। বিছানা থেকে নেমে সে ঘরের মধ্যে পায়চারি। আরম্ভ করে। এদিকের দেয়াল থেকে ওদিকের দেয়াল পর্যন্ত হেঁটে যায়, থমকে দাঁড়ায় এবং প্রত্যাবর্তন করে। তিনটি খোলা জানালা প্ৰত্যেকবার তার চোখের সামনে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত পৃথিবীকে মেলে ধরে। কিন্তু হেরম্বের এখন উপেক্ষা অসীম। সম্মুখের সুদূর সাদা দেয়ালটির আধ হাতের মধ্যে এসে গতিবেগ সংযত করে, আর কিছুই দেখতে পায় না। মেঝেতে আনন্দের পরিত্যক্ত একটি ফুল তার পায়ের চাপে পিষে যায়।
হেরম্ব জানে, আলো এই অন্ধকারে জ্বলবে। তাকে চমকে না দিয়ে বিনা আড়ম্বরে তার হৃদয়ে পরম সত্যটির আবির্ভাব হবে। তার সমস্ত অধীরতা অপমৃত্যু লাভ করবে না, ঘুমিয়ে পড়বে। জীবনের চরম জ্ঞানকে সুলভ ও সহজ বলে জেনে সে তখন ক্ষুন্ন অথবা বিস্মিত পর্যন্ত হবে না। কিন্তু তার দেরি কত?
ফিরে এসে তার চাঞ্চল্য লক্ষ্য করে আনন্দ অবাক হয়ে গেল কিন্তু কথা বলল না। একপাশে বসে তার অস্থির পদচারণাকে দৃষ্টি দিয়ে অনুসরণ করতে লাগল। হেরম্ব বহুদিন হল তার চুলের যত্ন নিতে ভুলে গেছে। তবু তার চুলে এতক্ষণ যেন একটা শৃঙ্খলা ছিল, এখন তাও নেই। তাকে পাগলের মতো চিন্তাশীল দেখাচ্ছে। আনন্দের সামনে এমনিভাবে সে যেন কত যুগ ধরে ক্ষ্যাপার মতো অসংলগ্ন পদবিক্ষেপে হেঁটে হেঁটে শুধু ভেবে গিয়েছে। পৃথিবীতে বাস করার অভ্যাস যেন তার নেই। প্রবাসে আপনার অনির্বচনীয় একাকিত্বের বেদনায় এমনি প্রগাঢ় ঔৎসুক্যের সঙ্গে সে সর্বদা স্বদেশের স্বপ্ন দেখে।
