একদিন সন্ধ্যার পর চাদরে গা ঢাকিয়া শ্যামা দোকান দেখিয়া আসিল। দোকান চলিবে ভরসা। হইল না। শ্যামা স্টোর্সের সামনে রাস্তার ওপরে মস্ত মনিহারি দোকান, চার-পাঁচটা বিদ্যুতের। আলো, টিমটিমে কোরাসিনের আলো জ্বালা মামার অতটুকু দোকানে কে জিনিস কিনতে আসবে? মামার যেমন কাণ্ড, দোকান দিবার আর জায়গা পাইল না।
মামার উৎসাহের অন্ত নাই; বিধান ও খুকি দোকান দোকান করিয়া পাগল, মণিরও দুবেলা দোকানে যাওয়া চাই! মামা ওদের বিস্কুট ও জেজুস দেয়, দোকানের আকর্ষণ ওদের কাছে আরো বাড়িয়া গিয়াছে। জিনিস বিক্রয় করিবার শখ বিধানের প্রচণ্ড বলে এবার যে খদ্দের আসবে তাকে আমি জিনিস দেব দাদু এ্যাঁ? মামা বলে, পারবি কি খোকা, খদ্দের বিগড়ে দিবি শেষে! কিন্তু অনুমতি মামা দেয়। বিধান ঘোট শো-কেসটির পিছনে টুলটার উপরে গম্ভীর মুখে বসে, মামা কোণের বেঞ্চিটার উপর বসিয়া চশমা দিয়া বিড়ি টানিতে টানিতে খবরের কাগজ পড়ে। ক্রেতা যে আসে হয়তো সে পাড়ার ছেলে, ঈর্ষার দৃষ্টিতে বিধানের দিকে চাহিয়া বলে, কি রে বিধু!–
বিধান বলে, কি চাই? সে পাকা দোকানি, কেনা-বেচার সময় তার সঙ্গে বন্ধুত্ব অচল, খোস গল্প করিবার তার সময় কই? চশমার ফাঁক দিয়া মামা সহকারীর কার্যকলাপ চাহিয়া দেখে, বলে, কালি? ওই ও কোনার টিনের কৌটাতে–দু বড়ি এক পয়সায়, কাগজে মুড়ে দে থোকা।
এদিক দোকান চলে ওদিক মামা আজ দশ টাকা কাল পাঁচ টাকা সংসার খরচ আনিয়া দেয় : মামার চারিদিকে রহস্যের ভাঙা আবরণটি আবার যেন গড়িয়া উঠিতে থাকে। পাড়ার লোক এতকাল আমাকে অতিথি বলিয়া খাতির করিত, এখন প্রতিবেশী গৃহস্থের প্রাপ্য সহজ সমাদর দেয়, তবে অতটুকু দোকান দেওয়ার জন্য পাড়ার অনেক চাকুরে-বাবুর কাছে মামার আসন নামিয়া গিয়াছে, খুব যারা বাবু দু-এক পয়সার জিনিস কিনিতে মামাকে তাহাদের কেহ তুমি পর্যন্ত বলিয়া বসে।
মামা বলে, কি চাই বললে পরিমল নস্যি? ওই ও দোকানে যাও!
অপমান করিয়া আমার কাছে কারো পার পাওয়ার যো নাই।
বৈশাখ মাস শেষ হইলে শ্যামা একদিন বলিল–দোকানের হিসাবপত্র করলে মামা, লাভ টাভ হল?
মামা বলিল, লাভ কিরে শ্যামা, বসতে না বসতেই কি লাভ হয়? খরচ উঠুক আগে।
শ্যামা বলিল, নতুন দোকান দিয়ে বসার খরচ দু-এক মাসে উঠবে না তা জানি মামা–তা বলি নি, বিক্রির ওপর লাভ-টাভ কি রকম হল হিসাব কর নি?–কত বেচলে, কেনা দাম ধরে কত লাভ রইল, কর নি সে হিসাব?
মামা বলিল, তুই আমাকে দোকান করা শেখাতে আসিস নে শ্যামা!
এবারে গ্রীষ্মের ছুটি হওয়ার আগে ক্লাসের ছেলেদের অনেকেই নানাস্থানে বেড়াইতে যাইবে শুনিয়া বিধানের ইচ্ছা হইয়াছিল সে-ও কোথাও যায়–কোথায় যাইবে? কোথায় তাহার কে আছে, কার কাছে সে গিয়া কিছুদিন থাকিয়া আসিতে পারে? বনগাঁ গেলে হইত–মন্দাকে শ্যামা চিঠি লিখিয়াছিল, মন্দা জবাব দিয়াছে, এখন সেখানে চারিদিকে বড় কলেরা হইতেছে–এখন না গিয়া বিধান যেন পূজার সময় যায়।
বিষ্ণুপ্রিয়ারা এবার দার্জিলিং গিয়াছে। তখনন স্কুলের ছুটি হয় নাই–শঙ্কর সঙ্গে যাইতে পারে নাই। বিষ্ণুপ্রিয়া এখানে থাকিবার সময় শঙ্কর বোধহয় সাহস পাইত না, বিষ্ণুপ্রিয়া দার্জিলিং চলিয়া গেলে একদিন বিকালে সে এ বাড়িতে আসিল।
শ্যামা বারান্দায় তরকারি কুটিতেছিল, বিধান কাছেই দেয়ালে ঠেস দিয়া বসিয়া ছেলেদের একটা ইংরাজি গল্পের বই পড়িতেছিল, মুখ তুলিয়া শঙ্করকে দেখিয়া সে আবার পড়ায় মন দিল।
শঙ্করকে বসিতে দিয়া শ্যামা বলিল, কে এসেছে দেখ থোকা।
বিধান শুধু বলিল, দেখেছি।
বিধান কি আজো সে অপমান ভোলে নাই, বন্ধু বাড়ি আসিয়াছে তার সঙ্গে সে কথা বলিবে না? লাজুক শঙ্করের মুখখানা লাল হইয়া উঠিয়াছিল, শ্যামা টান দিয়া বিধানের বই কাড়িয়া লইল, বলিল, নে, ঢের বিদ্যে হয়েছে, যা দিকি দুজনে দোতলায়, বাতাস লাগবে একটু, যা গরম এখানে!
বিধান আস্তে আস্তে ঘরের মধ্যে গিয়া বসিল। শ্যামা বলিল, তোমাদের ঝগড়া হয়েছে নাকি শঙ্কর?–ও বুঝি কথা বলে না তোমার সঙ্গে? কি পাগল ছেলে! না বাবা, যেও না তুমি, পাগলটাকে আমি ঠিক করে দিচ্ছি।
ঘরে গিয়া শ্যামা ছেলেকে বোঝায়। বলে যে শঙ্করের কি দোষ? শঙ্কর তো তাদের অপমান করে নাই, যে বাড়ি বহিয়া ভাব করিতে আসে তার সঙ্গে কি এমন ব্যবহার করিতে হয়? ছি! কিন্তু এ তো বোঝানোর ব্যাপার নয়, অন্ধ অভিমানকে যুক্তি দিয়া কে দমাইতে পারে? ছেলেকে শ্যামা বাহিরে টানিয়া আনে, সে মুখ গোজ করিয়া থাকে। শঙ্কর বলে, যাই মাসিমা।
আহা বেচারির মুখখানা ম্লান হইয়া গিয়াছে।
শ্যামা রাগিয়া বলে, ছি খোকা ছি, একি ছোটমন তোর, একি ছোটলোকের মতো ব্যবহার? যা তুই আমার সামনে থেকে সরে। বস, বাবা তুমি, একটা কথা শুধধাই–দিদি পত্র দিয়েছে? সেখানে ভালো আছে সব? তুমি যাবে না দার্জিলিং স্কুল বন্ধ হলে?
শ্যামা শঙ্করের সঙ্গে গল্প করে, হাঁটুতে মুখ পুঁজিয়া বিধান বসিয়া থাকে, কি ভয়ানক কথা ছেলেকে সে বলিয়াছে শ্যামার তা খেয়ালও থাকে না। তারপর বিধান হঠাৎ কাঁদিয়া ছুটিয়া দোতলায় চলিয়া যায়। লাজুক শঙ্কর বিব্রত হইয়া বলে, কেন বকলেন ওকে?–বলিয়া উসখুস করিতে থাকে। তারপর সে-ও উপরে যায়। খানিক পরে শ্যামা গিয়া দেখিয়া আসে, দুজনে গল্প করিতেছে।
সেই যে তাহাদের ভাব হইয়াছিল, তারপর শঙ্কর প্রায়ই আসিত। শঙ্করের ক্যারামবোর্ডটি পড়িয়া থাকিত এ বাড়িতেই, উপরে খোলা ছাদে বসিয়া সারা বিকাল তাহারা ক্যারাম খেলিত! বন্ধে তাহার সহিত বিধানের দার্জিলিং যাওয়ার কথাটা শঙ্করই তুলিয়াছিল, বিষ্ণুপ্রিয়া ইহা পছন্দ করিবে। না জানিয়াও শ্যামা আপত্তি করে নাই, তেমন আদর যত্ব বিধান না হয় নাই পাইবে, সেখানে অতিথি ছেলেটিকে পেট ভরিয়া খাইতে তো বিষ্ণুপ্রিয়া দিবেই? কিন্তু রাজি হইল না বিধান। একসঙ্গে দার্জিলিং গিয়া থাকার কত লোভনীয় চিত্রই যে শঙ্কর তার সামনে আঁকিয়া ধরিল বিধানকে। বোঝানো গেল না। যথাসময়ে শঙ্কর চলিয়া গেল সেই শীতল পাহাড়ি দেশে, এখানে বিধানের দেহ গরমে ঘামাচিতে ভরিয়া গেল।
