শোন একবার শীতলের কথা! কিসে মহাপাপী শ্যামা? কোন দিন চোখ খুলিয়া পুরুষের দিকে চাহিয়াছে? অসৎ চিন্তা করিয়াছে? দেবদ্বিজে ভক্তি রাখে নাই? শ্যামা আহত, উত্তেজিত ও বিস্মিত হইয়া থাকে। শীতল তাহাকে বকে? যার সংসার সে মাথায় করিয়া রাখিয়াছে? যার ছেলেমেয়ের সেবা করিয়া তাহার হাতে কড়া পড়িয়া গেল, মেরুদণ্ড বাকিয়া গেল ভারবহা বাঁকের মতো? ধন্য সংসার! ধন্য মানুষের কৃতজ্ঞতা!
মামা কিন্তু ফিরিয়া আসিল, সাতদিন পরে।
সাতদিন পরে মামা ফিরিয়া আসিল, আরো দিনদশেক পরে শ্যামা দোতলায় ঘর তোলা আরম্ভ করিল, বলিল, জান মামা, উনি বলেন, আমি নাকি কেপ্লনের একশেষ, নিজে তো ডাইনে-বায়ে টাকা ছড়ায়, আমি মরে বেঁচে কটা টাকা রেখেছি বলে না ঘরখানা উঠেছে? সংসারে ওনার মন নেই, উড়ু উড়ু কচ্ছেন। আমিও যদি তেমনি হই সব ভেসে যাবে না, ছারখার হয়ে যাবে না? টাকা রাখব আমি, ইট-সুরকি কিনব আমি, মিস্ত্রি ডাকব আমি, তারপর ঘর হলে শোবেন কে? উনি তো? আমি তাই জন্তু জানোয়ার, যন্তর? কথা কই সাধে? কইতে ঘেন্না হয়।
মামা বলিল, সেকি মা, কথা বলিসনে কি?।
শ্যামা বলিল, বলি, দরকার মতো বলি। পঁয়ত্রিশ বছর বয়স হল আজেবাজে কথা আর মুখে আসে না, দোষ বল দোষ, গুণ বল গুণ, যা পারি নি তা পারিই নে।
ঘর তুলিবার হিড়িকে শ্যামা, আমাদের ছেলে-পাগলা শ্যামা, ছেলেমেয়েদের যেন ভুলিয়া গিয়াছে। কত আর পারে মানুষ? সংসারে উদয়াস্ত খাটিয়া আগেই তাহার অবসর থাকিত না, এখন মিস্ত্রির কাজ দেখিতে হয়, এটা-ওটা আনাইয়া দিতে হয়, ঘর তোলার হাঙ্গামা কি কম! শ্যামা পারেও বটে! এক হাতে ছোট ছেলেটাকে বুকের কাছে ধরিয়া রাখে, সে ঝুলিতে ঝুলিতে প্রাণপণে স্তন চোষে, শ্যামা সেই অবস্থাতে চরকির মতো ঘুরিয়া বেড়ায়, ভাতের হাঁড়ি নামায়, তরকারি চড়ায়, ছাদে গিয়া মিস্ত্রির দেয়াল গাঁথা দেখিয়া আসে, ভাঙা কড়াইয়ে করিয়া চুন নেওয়ার সময় উঠানে এক খাবলা ফেলিয়া দেওয়ার জন্য কুলিকে বকে, শীতলকে আপিসের ও বিধানকে স্কুলের ভাত দেয়, মাসকাবারি কয়লা আসিলে আড়তদারের বিলে নাম সই করে, খরচের হিসাব দেখে, ছোট খোকার কথা কাচে (রানী এ কাজটা করে না, তার বয়স অল্প এবং সে একটু শৌখিন), আবার মামার সঙ্গে, প্রতিবেশী নতুবাবুর স্ত্রীর সঙ্গে গল্পও করে। চোখের দিকে তাকাও, বাৎসল্য নাই, স্নেহ-মমতা নাই, শ্ৰান্তি নাই কিছুই নাই! শ্যামা সত্যই যন্ত্র নাকি?
মামা বলে, খেটে খেটে মরবি নাকি শ্যামা? যা যা তুই যা, মিস্ত্রির কাজ আমি দেখবখন।।
শ্যামা বলে, না মামা, তুমি বুড়ো মানুষ, তোমার কেন এসব ঝঞাট পোষাবে? যা সব বজ্জাত মিস্ত্ৰি, বজ্ঞাতি করে মালমসলা নষ্ট করবে, তুমি ওদের সঙ্গে পারবে কেন? তাছাড়া নিজের চোখে না দেখে আমার স্বস্তি নেই কাজ কতদূর এগুল, ঘর তোলার সাধ কি আমার আজকের! তুমি ঘরে গিয়ে বোসসা মামা, পিঠে কোথায় ব্যথা বলছিলে না? রানী বরং একটু তেল মালিশ করে দিক।
শীতল কোনোদিকে নজর দেয় না, কেবল সে যে পুরুষমানুষ এবং বাড়ির কর্তা, এটুকু দেখাইবার জন্য বলা নাই কওয়া নাই মাঝে মাঝে কর্তৃত্ব ফলাইতে যায়। গম্ভীর মুখে বলে, এখানে জানালা হবে বুঝি, দেয়ালের যেখানে ফাঁক রাখছ?
মিস্ত্রিরা মুখ টিপিয়া হাসে। শ্যামা বলে, জানালা হবে না তো কি দেয়ালে ফাঁক থাকবে?
তাই বলছি শীতল বলে–জানালা হবে কটা? তিনটে মোটে? না না, তিনটে জানালায় আলো বাতাস খেলবে না ভালো–ওহে মিস্ত্রি এইখানে আরেকটা জানালা ফুটিয়ে দাও–এদিকে একটাও জানালা কর নি দেখছি।
শ্যামা বলে, ওদিকে জানালা হবে না, ওদিকে নকুবাবুর বাড়ি দেখছ না? আর বছর ওরাও দোতলায় ঘর তুলবে, আমাদের ঘেঁষে ওদের দেয়াল উঠবে, জানালা দিয়ে তখন করবে কি? জান না, বোঝ না, ফোপরদালালি কোরো না বাবু তুমি।
শীতল অপমান বোধ করে, কিন্তু যেন অপমান বোেধ করে নাই এমনিভাবে বলে, তা কে জানে ওরা আবার ঘর তুলবে!–হাঁ হাঁ, ওখানে আস্ত ইট দিও না মিস্ত্রি–দেখছ না বসছে না, কতখানি ফাঁক রয়ে গেল ভেতরে? দুখানা আদ্ধেক ইট দাও, মাঝখানে একটা সিকি ইট দাও।
মিস্ত্রিরা কথা বলে না, মাঝখানের ফাঁকটাতে কয়েকটা ইটের কুচি দিয়া মসলা ঢলিয়া দেয়, শীতল আড়চোখে চাহিয়া দেখে শ্যামা স্তুর চোখে চাহিয়া আছে! শীতল এদিক-ওদিক তাকায়, হঠাৎ শ্যামার দিকে চাহিয়া একটু হাসে, পরক্ষণে গম্ভীর হইয়া নিচে নামিয়া আসে। দাঁড়াইয়া বিধানের একটু পড়া দেখে, পড়িবার জন্য ছেলেকে শ্যামা গত বৈশাখ মাসে নূতন টেবিল চেয়ার কিনিয়া দিয়াছে, পড়া দেখিতে দেখিতে শীতল টের পায় শ্যামা ঘরে আসিয়াছে। তখন সে বিধানের বইয়ের পাতায় একস্থানে আঙুল দিয়া বলে: এখানটা ভালো করে বুঝে পড়িস খোকা, পরীক্ষায় মাঝে মাঝে দেয়। তারপর বিধান জিজ্ঞাসা করে, Circumlocutory মানে কি বাবা? শীতল বলে, দেখ না দেখ মানে বই দেখ। বিধান তখন খিলখিল করিয়া হাসে। শ্যামা বলে: পড়ার সময় কেন ওকে বিরক্ত করছ বল তো?
শীতল বলে, হাসলি যে খোকা?–শীতলের মুখ মেঘের মতো অন্ধকার হইয়া আসে–বাপের সঙ্গে ইয়ার্কি হচ্ছে? হারামজাদা ছেলে কোথাকার! বলিয়া ছেলেকে সে আথালিপাথালি মারিতে আরম্ভ করে। বিধান চেঁচায়, বুকু চেঁচায়, বাড়িতে একেবারে হৈচৈ বাধিয়া যায়। শ্যামা দুই হাতে বিধানকে বুকের মধ্যে আড়াল করে, শীতল গায়ের ঝাল ঝাড়িতেই শ্যামার গায়ে দুচারটা মার বসাইয়া দেয় অথবা সেগুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হইয়া শ্যামার গায়ে লাগে বুঝিবার উপায় থাকে না। শ্যামা তো আজ গৃহিণী, মোটাসোটা রাজরানীর মতো তাহার চেহারা, শীতল কি এখন তাহাকে ইচ্ছা করিয়া মারিবে?
