চুপ কর বীণা। যা এ ঘর থেকে। অরুণা ধমক দেয়। বীণা অবশ্য যায় না। সে বুঝতে পারে, মার সঙ্গে বাবার খাঁটি বিবাদ বাধে নি, বাবাকে দিয়ে মা কিছু করিয়ে নিতে চান। লাগাম চাবুক সব তাই মা সম্পূর্ণ নিজের আয়ত্তে রাখতে চান, অন্য কারো এতটুকু হস্তক্ষেপ তার পছন্দ নয়। বীণা তাই একটু তফাতে চুপচাপ বসে পড়ে।
এবার কথার ঝাঁঝ বাদ দিয়ে গম্ভীরভাবে অরুণা বলে স্বামীকে, ওটা কর্মীর দায়িত্ব। তুমি তবে দুঃখ কর কেন? বিশ্বাসী দায়িত্ববান কর্মীর সম্মান তো পাম্। নেতা হবার শখ কেন তবে?
কি জানি।
যাক গে। এবার পলিটিক্স ছেড়ে দাও। কাজ নেই আর তোমার পলিটিক্স করে। ওসব তোমার কাজ নয়। মুখ-হাত ধুয় এস।
কি বলতে চাও তুমি? স্ত্রীকে নরম দেখে অমৃত এবার ক্রুদ্ধ, তোমরা ভাব আমি বোকা, হাবা গোবেচারি ভালোমানুষ, ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানি না। এ বাড়ি করেছে কে? ঠাকুর, চাকর, দারোয়ান নিয়ে শাড়ি গয়না পরে এত যে আরামে আছ তোমরা–
বীণা? অরুণা বলে দৃঢ়স্বরে, তোর এত রাত হল কেন বাড়ি ফিরতে? কোথা গিয়েছিলি?
বীণা জবাব দেয় না। সে জানে এটা আসলে তার বাবার কথার জবাব, বাবাকে ধমক দিয়ে চুপ করানো। নইলে বাড়ি ফিরতে এমন কিছু রাত তার হয় নি যে কারণ জানবার জন্য মা মাথা ঘামাবে। অমৃত একটা চুরুট বার করে ধরায়। অরুণা কি হাল ছাড়ল? বাইরের জগৎ থেকে জীবনকে এবার সে ঘরের সীমায় এনে রাখবে ঠিক করেছে? অথবা আরো কিছু বলার আছে তার?
ঠিক বুঝে উঠতে পারে না বলে অমৃত আবার পুরোনো কথাটাই জিজ্ঞেস করে, আমার কি করার ছিল?
তোমার? তোমার বোঝা উচিত ছিল দশ বছর যে সুযোগ খুঁজছ এ্যাদ্দিনে তা এসেছে। বড়রা কেউ হাজির নেই গুলিগোলার ভয়ে, তুমি যা যা বলবে তুমি যা করবে কেউ তা ভেস্তে দিতে পারবে না। বাণী যখন ওরা মানল না, তোমার উচিত ছিল ঘোষণা করা যে তুমি ওদেরই পক্ষে। জোর গলায় বলা উচিত ছিল, দশ বছর পনের বছর দেশের সেবা করছ, জেল খাটছ, কিন্তু আদর্শের চেয়ে বড় কিছু নেই তোমার। তাই, তুমি দায়িত্ব নিচ্ছ মিটমাটের ব্যবস্থা করার, এজন্য যদি প্রাণ বিসর্জন দিতে হয় তোমাকে–
কিসের মিটমাট? অমৃত বলে আশ্চর্য হয়ে।
তা দিয়ে তোমার কি দরকার? তুমি দায়িত্ব নিতে মিটমাটের মিটমাট হোক বা না হোক তোমার কি এসে যায়? ওদের সঙ্গে কথা বলতে, অফিসারদের সঙ্গে কথা বলতে, এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করতে, ব্যস, তোমার কাজ হয়ে গেল। দুদিন পরে দেশের লোকের মনের গতি বুঝে অবস্থা বিবেচনা করে তুমি জোর গলায় বলতে, তুমিই বিপদ ঠেকিয়েছ, তুমিই আন্দোলনটা সফল করেছ, তুমিই চেষ্টা করেছ দাবি আদায়ের।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে চুপ করে থাকে অমৃত। আগেও অনেকবার তার মনে হয়েছে, আজো মনে হয়, অরুণাকে সামনাসামনি পলিটিসে নামিয়ে সে যদি পিছনে থাকত, এতদিনে হয়তো প্রবল প্রতিপত্তি আয়ত্ত করা যেত রাজনীতির ক্ষেত্রে। নিজে দেশনেতা না হতে পারলেও অদ্ভুত দেশনেত্রীর স্বামী হওয়া যেত।
এখনো সময় আছে।
অরুণার মৃদু, সংক্ষিপ্ত, সুদৃঢ় ঘোষণায় হৃৎকম্প হয় অমৃতের!
এখুনি তুমি যাও আবার, অরুণা বলে উৎসাহের সঙ্গে, পাণ্ডারা শুয়ে শুয়ে ঘুমোক। গিয়ে পুলিশকে বলবে তুমি মিটমাট করতে এসেছ, সবাইকে বাড়ি ফিরে যাবার আবেদন জানাবে। তাহলে বলবার সুযোগ পাবে। কিন্তু খবরদার বলতে উঠে যেন ওদের শান্তভাবে বাড়ি ফিরে যেতে বোলো না। ওদের বীরত্বের প্রশংসা করে, ওরাই যে দেশের ভবিষ্যৎ, এসব কথা বলে আরম্ভ করবে। তারপর খুব ফলাও করে বলবে ওদের দাবি যাতে মেনে নেওয়া হয় সেজন্য তুমি কত। ছুটোছুটি করেছ। বলবে, ভাই সব, তোমাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গুলির সামনে বুক পেতে দেবার। গৌরব আমার জুটল না, কারণ বিদেশী সরকারের গুলি যাতে আমার দেশের ভাইদের বুকে না। লাগতে পারে, সেই চেষ্টা করাই বড় মনে হয়েছিল আমার। তোমাদেরই বাঁচাতে চেয়েছিলাম। আমি। গুলি যখন চলেছে, তোমাদের যখন বাঁচাতে পারি নি, তখন আজ থেকে, এই মুহূর্ত থেকে আমার জীবনপণ ব্ৰত হল দেশকে স্বাধীন করা। তোমরা অনেক বক্তৃতা শুনেছ, আমি ভালো বক্তৃতা দিতে পারি না, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি ভাই সব, বক্তৃতার দিন আর নেই, এখন আমরা সবাই মিলে–
অরুণা অসহায়ের মতো হঠাৎ থেমে যায়। চল্লিশ কোটি কালো নরনারী তার বক্তৃতা শুনছিল। হঠাৎ সামান্য একটা কারণে, নিজের মুখ থেকে বার করা সবাই মিলে কথাটার প্রতিক্রিয়াগত। সাংঘাতিক আঘাতে সে মরণাপনের মতো কাবু হয়ে যায়। স্বামীর জীবনকে সার্থক করা গেল না। বসে বসে তাকে যদি বক্তৃতা শেখাতে হয় স্বামীকে, এতক্ষণ শেখাবার পর এখন যদি আবার বলে দিতে হয় নিজের কথা সংশোধন করে যে, না, সবাই মিলে এ কথাটা বোলো না, তবে সে কি করতে পারে, সামান্য সে মেয়েমানুষ!
এতক্ষণ পরে বীণা কথা বলে, কি হল মা? তোমার সেই হার্টের ব্যথাটা হয় নি তো?
ডাক্তার বছর দেড়েক আগে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে গিয়েছিলেন অরুণার হার্টের ব্যথাটা আবার। যদি জাগে জীবনের সহজ নিয়ম রীতিনীতি পালন না করার জন্য, তবে জগতের কোনো ডাক্তার এ দায়িত্ব নিতে পারবেন না যে, হার্টফেল করে মিসেস অরুণা মজুমদারের আকস্মিক মৃত্যু ঘটবে না।
আমি ঠিক আছি, অরুণা বলে, যাবে তুমি? যাবে? পারবে এ সুযোগ নিতে? দশ বছর কাঙালের মতো যা চেয়েছ, আজ তা আদায় করে নিতে পারবে? যাবে কিনা বল।
