সে কোনো জবাব দিতে পারল না–ভয়ে নীলবর্ণ হয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ কি যে রাগ হল চণ্ডালের মত তাকে পাখার বাঁট দিয়ে আতালি পাতালি মারতে লাগলাম–প্রথম ভয়ে মার খেয়েও সে কিছু বললে না, তার পরে আমার মারের বহর দেখে সে ভয়ে কেঁদে উঠে বললে–ও কাকাবাবু আপনার পায়ে পড়ি, আমায় মারবেন না, আর কখনও এমন করবো না–
তার হাতের মুঠো আলগা হয়ে আঁচলের প্রান্ত থেকে দুটো মুড়ি পড়ে গেল মেজেতে। সে মুড়ি কিনতে গিয়েছিল এক পয়সার, খিদে পেয়েছে বলে। ভয়ে তাও যেন তার মনে হচ্ছে কি অপরাধই সে করে ফেলেছে!
আমার জ্ঞান হঠাৎ ফিরে এল। মুড়ি ক’টা মেজেতে পড়ে যাওয়ার ঐ দৃশ্যে বোধ হয়। নিজেকে সামলে নিয়ে ঘর থেকে বার হয়ে গেলাম। সমস্ত দিন ভাবলাম–ছি, এ কি করে বসলাম! আট বছরের কচি মেয়েটা সারাদিন ধরে খাটছে, এক পয়সার মুড়ি কিনতে গিয়েছে আর তাকে এমন ক’রে নির্মমভাবে প্রহার করলাম কোন প্রাণে?
জীবনে কত লোকের কত বিচার করেছি তাদের দোষগুণের জন্যে–দেখলাম কাউকে বিচার করা চলে না–কোন অবস্থার মধ্যে পড়ে কে কি করে সে কথা কি কেউ বুঝে দেখে?
বৌদিদির অসুখ ক্রমে অত্যন্ত বেড়ে উঠল। দিন-দিন বিছানার সঙ্গে মিশে যেতে লাগল দেখে ভয়ে আমার প্রাণ উড়ে যাচ্ছে। এদিকে এক মহা দুশ্চিন্তা এসে জুটল, যদি বৌদিদি না-ই বাঁচে-এই ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে আমি কি করব? বিশেষ করে কোলের মেয়েটাকে নিয়ে কি করি? ছোট খুকী মোটে এই দশ মাসের–কি সুন্দর গড়ন, মুখ, কি চমৎকার মিষ্টি হাসি! এই দেড় মাস তার অযত্নের একশেষ হচ্ছে–উঠোনের নারকোলতলায় চটের থলে পেতে তাকে রোদ্দুরে শুইয়ে রাখা হয়–বড় খুকী সব সময় তাকে দেখতে পারে না–কাঁদলে দেখবার লোক নেই, মাতৃস্তন্য বন্ধ এই দেড় মাস– হর্লিকস খাইয়ে অতি কষ্টে চলছে। রাত্রে আমার পাশে তাকে শুইয়ে রাখি, মাঝরাত্রে উঠে এমন কান্না শুরু করে মাঝে মাঝে–ঘুমের ঘোরে উঠে তাকে চাপড়ে চাপড়ে ঘুম পাড়াই–বড় খুকীকে আর ওঠাই নে। রাত্রে তো প্রায়ই ঘুম হয় না, রোগীকে দেখা-শুনো করতেই রাত কাটে–মাঝে মাঝে একটু ঘুমিয়ে পড়ি। পাড়ায় এত বৌ-ঝি আছে–দেখে বিস্মিত হয়ে গেলাম কেউ কোনদিন বলে না খুকীকে নিয়ে গিয়ে একবার মাইয়ের দুধ দিই। আমি একা কত দিকে যাব–তা ছাড়া আমার হাতের পয়সাও ফুরিয়েছে। এই দেড় মাসের মধ্যে সংসারের রূপ একেবারে বদলে গিয়েছে আমার চোখে–আমি ক্রমেই আবিষ্কার করলাম মানুষ মানুষকে বিনাস্বার্থে কখনও সাহায্য করে না–আমি দরিদ্র, আমার কাছে কারুর কোনো স্বার্থের প্রত্যাশা নেই, কাজেই আমার বিপদে কেউ উঁকি মেরেও দেখতে এল না। না আসুক, কিন্তু কোলের খুকীটাকে নিয়ে যে বড় মুশকিলে পড়ে গেলাম! ও দিন-দিন আমার চোখের সামনে রোগা হয়ে যাচ্ছে। ওর অমন কাঁচাসোনার রঙের ননীর পুতুলের মত ক্ষুদে দেহটিকে যেন কালি মেড়ে দিচ্ছে দিন দিন–কি করবো ভেবে পাই নে, আমি একেবারেই নিরুপায়! স্তন্যদুগ্ধ আমি ওকে দিতে তো পারি নে!
কিন্তু এর মধ্যে আবার মুশকিল এই হল যে স্তন্যদুগ্ধ তো দূরের কথা, গরুর দুধও গ্রামে পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠল। গোয়ালারা ছানা তৈরি করে কলকাতায় চালান দেয়, দুধ কেউ বিক্রী করে না। একজন গোয়ালার বাড়িতে দুধের বন্দোবস্ত করলাম–সে বেলা বারোটা-একটার এদিকে দুধ দিত না। খুকী ক্ষিদেতে ছটফট করত, কিন্তু চুপ করে থাকত–একটুও কাঁদত না। আমার বুড়ো আঙুলটা তার মুখের কাছে সে সময়ে ধরলেই সে কচি অসহায় হাত দুটি দিয়ে আমার আঙুলটা তার মুখের মধ্যে পুরে দিয়ে ব্যগ্র, ক্ষুধার্ত ভাবে চুষত–তা থেকেই বুঝতাম মাতৃস্তন্য-বঞ্চিত এই হতভাগ্য শিশুর স্তন্যক্ষুধার পরিমাণ।
ওকে কেউ দেখতে পারে না–দু-একটি পাড়ার মেয়ে যারা বেড়াতে আসত, তারা ওকে দেখে নানারকম মন্তব্য করত। ওর অপরাধ এই যে ও জন্মাতেই ওর বাবা মারা গেল, ওর মা শক্ত অসুখে পড়ল। খুকীর একটা অভ্যাস যখন-তখন হাস্য–কেউ দেখুক আর না-ই দেখুক, সে আপন মনে ঘরের আড়ার দিয়ে চেয়ে ফিক করে একগাল হাসবে। তার সে ক্ষুধাশীৰ্ণ মুখের পবিত্র, সুন্দর হাসি কতবার দেখেছি–কিন্তু সবাই বলত, আহা কি হাসেন, আর হাসতে হবে না, কে তোমার হাসি দেখছে? উঠোনের নারকোলতলায় চট পেতে রৌদ্রে তাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। কত দিন দেখেছি নীল আকাশের দিকে চোখ দুটি তুলে সে আপনমনে অবোধ হাসি হাসছে। সে অকারণ, অপার্থিব হাসি কি অপূর্ব অর্থহীন খুশিতে ভরা! ছোট্ট দেহটি দিন-দিন হাড়সার হয়ে যাচ্ছে। অমন সোনার রং কালো হয়ে গেল, তবুও ওর মুখে সেই হাসি দেখছি মাঝে মাঝে–কেন হাসে, কি দেখে হাসে।
এক এক দিন রাত্রে ঘুম ভেঙে দেখি ও খুব চেঁচিয়ে কাঁদছে। মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে আবার ঘুমিয়ে পড়ত। বড় খুকীকে বলতাম–একটু দুধ দে তো গরম করে, হয়ত খিদেয় কাঁদছে। সব দিন আবার রাত্রে দুধ থাকত না। সেদিন আঙুল চুষিয়ে অনেক কষ্টে ঘুম পাড়াতে হত। একদিন সকালে ওর কান্না দেখে আর থাকতে পারলাম না–রোগীর সেবা ফেলে দু-ক্রোশ তফাতের একটা গ্রাম থেকে নগদ পয়সা দিয়ে আধসের দুধ যোগাড় করে নিয়ে এসে ওকে খাওয়ালুম। গোয়ালাকে কত খোশামোদ করেও বেলা বারোটার আগে কিছুতেই দুধ দেওয়ানো গেল না।
