দিনে রাতে মালতী আমায় ছাড়ে কখন? সব সময় সে আমার মনে আছে। এই দুপুর, এখন সে আখড়ার দাওয়ায় পরিবেশন করছে। এই বিকেল, এখন সে কাপড় সেলাই করছে, নয় তো মুগকলাই ঝাড়ছে। এই সন্ধ্যা, এখন সে টান-টান করে তার অভ্যস্ত ধরনে চুলটি বেঁধে, ফুল্লাধরে মৃদু হেসে বিষ্ণুমন্দিরে প্রদীপ দেখাতে চলেছে। আজ মঙ্গলবার, সারাদিন সে উপবাস করে আছে, আরতির পরে দুধ ও ফল খাবে। সেই নিঃসঙ্কোচে পুকুরের ঘাটে বসে বসে আমাকে গান-শোনানো, আমার সঙ্গে শিবের মন্দিরে যাওয়া–খাতা পড়ে শোনানো–সকলের ওপরে তার হাসি, তার মুখের সে অপূর্ব হাসি! কত কথাই মনে এসে নির্জনে যাপিত প্রতি প্রহরটি আনন্দবেদনায় অলস করে দিত।
দূরের গিরি-সানুর গায়ে ক্রীড়ারত শুভ্র মেঘরাজির মধ্যে এমন কি কোন দয়ালু মেঘ নেই যে এই কূটজ-কুসুমাস্তীর্ণ নিভৃত অধিত্যকার ওপর দিয়ে যেতে যেতে পিয়ালতলার এই নির্বাসিত যক্ষের বিরহবার্তাটি শুনে জেনে নিয়ে বাংলা দেশের প্রান্তরমধ্যবর্তী অলকাপুরীতে পৌঁছে দেয় তার কানে?
কতবার মনে অনুশোচনা হয়েছে এই ভেবে যে কেন চলে আসতে গিয়েছিলুম অমন চুপি চুপি? তখন কি বুঝেছিলুম মালতী আমায় এত ভাবাবে! কি বুঝে আখড়া ছেড়ে চলে এলাম পাগলের মত! এমনধারা খামখেয়ালী স্বভাব আমার কেন যে চিরকাল, তাই ভাবি। আমার মাথার ঠিক নেই সবাই বলে, সত্যিই বলে। এখন বুঝেছি কি ভুলই করেছি মালতীকে ছেড়ে এসে। ওকে বাদ দিয়ে জীবন কল্পনা করতে পারছি নে–এও যেমন ঠিক, আবার এও তেমনি ঠিক যে আর সেখানে আমার ফেরা হবে না।
না–মালতী, আর ফিরে যাব না। কাছে পেয়ে তুমি যদি অনাদর কর সইতে পারব না। তোমার খামখেয়ালী স্বভাবকে আমার ভয় হয়। তার চেয়ে এই-ই ভাল। আমার জীবনে তুমি পুকুরের ঘাটের কত জ্যোৎস্নারাত্রি অক্ষয় করে দিয়েছ, সেই সব জ্যোৎস্নারাত্রির স্মৃতি, তোমার বাবার বিষ্ণুমন্দিরের কত সন্ধ্যায় প্রদীপ দেওয়ার স্মৃতি–তোমার সে সব আদরের স্মৃতি মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে থাক।
.
১৪.
এক বছর কেটে গেল, আবার শ্রাবণ মাস।
হঠাৎ দাদার শালার একখানা চিঠি পেলাম কলকাতা থেকে। দাদার বড় অসুখ, চিকিৎসার জন্যে তাকে আনা হয়েছে ক্যাম্বেল হাসপাতালে।
পত্র পেয়ে প্রাণ উড়ে গেল। সাধুজীর কাছে বিদায় নিয়ে কলকাতায় এলাম। হাসপাতালে দাদার সঙ্গে দেখা করলাম। সামান্য ব্রণ থেকে দাদার মুখে হয়েছে ইরিসিপ্লাস, আজ সকালে অস্ত্রও করা হয়ে গিয়েছে। দাদা আমায় দেখে শরীরে যেন নতুন বল পেল। সন্ধ্যা পর্যন্ত হাসপাতালে বসে রইলাম দাদার কাছে। দাদা বললে–এখানে বেশ খেতে দেয় নিতু। রোজ প্রতিবেলায় একখানা বড় পাঁউরুটি আর আধ সের ক’রে দুধ দিয়ে যায়। দেখিস এখন, এখুনি আনবে। খাবি রুটি একখানা?
পরদিন সকালে আবার গেলাম হাসপাতালে। আঙুর কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম বৌবাজারের মোড় থেকে, দাদাকে ব’সে ব’সে খাওয়ালাম। দুপুরের আগে চলে আসছি, দোর পর্যন্ত এসেছি, দাদা পেছু ডাকলে–জিতু, শোন!
দাদা বিছানার ওপর উঠে বসেছে–তার চোখ দুটিতে যেন গম্ভীর হতাশা ও বিষাদ মাখানো। বললে–জিতু, তোর বৌদিদি একেবারে নিপাট ভালমানুষ, সংসারের কিছু বোঝে না। ওকে দেখিস–
আমি বিস্ময়ের সঙ্গে বললাম–ও কি কথা দাদা! তুমি সেরে ওঠ, তোমায় বাড়ি নিয়ে যাব, তোমার সংসার তুমি দেখবে।
দাদা চুপ করে রইল।
বিকেলে দাদার ওয়ার্ডে ঢুকবার আগে মনে হ’ল দাদা ত বিছানাতে বসে নেই! গিয়ে দেখি দাদা আগাগোড়া কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। মাথার কাছে চার্টে দেখি জ্বর উঠেছে ১০৪ ডিগ্রীর ঘরে। পাশের বিছানার রোগী বললে–আপনি চলে যাবার পরে খুব জ্বর এসেছে। কোন কথা বলতে পারেন নি, আপনি আসবার আগে ডেকেছিলাম, সাড়া পাই নি।
সেদিন সারাদিন তেমনি ভারে কেটে গেল। পরদিনও তাই, দাদার জ্ঞান আর ফিরে এল না–জ্বরও কমল না, পরদিন রাত্রে আমি রোগীর কাছে রইলাম।
ওঃ কি বর্ষা সে রাত্রে! ঘনকৃষ্ণ শ্রাবণের মেঘপুঞ্জে আকাশ ছেড়ে গিয়েছে, নির্নিরীক্ষা অন্ধকারে কোথাও একটা তারা চোখে পড়ে না। একখানা বই পড়ছিলাম দাদার বিছানার ধারে বসে। রাত বারোটায় একবার নার্স এল। আমি তাকে বললাম–রোগীর অবস্থা খারাপ–একবার রেসিডেন্ট মেডিকেল অফিসারকে ডাকাও। ডাক্তার এল, চলেও গেল। রাত তখন দেড়টা। বাইরে কি ভীষণ মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে। আকাশ ভেঙে পড়বে বুঝি পৃথিবীর ওপরে–সৃষ্টি বুঝি ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
একজন ছাত্র এসে রোগী দেখে বললে–ইনজেকশন দিতে হবে।
আমি বললাম–বেশ দিন—
তারপর আমি বাইরে এসে দাঁড়ালুম। ঘন মেঘে মেঘে আকাশ অন্ধকার। হাসপাতালের বারান্দাতে কুলিরা ঘুমুচ্ছে। টিটেনাস ওয়ার্ড থেকে অনেকক্ষণ ধরে আর্ত পশুর মত চীৎকার শোনা যাচ্ছে–একবার সেটা থামছে, আবার জোরে জোরে হচ্ছে। সামনের ওয়ার্ডে মেম নার্সটা ঘুরে বেড়াচ্ছে বারান্দাতে।
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হেডলাইট জ্বালিয়ে একখানা মোটর এসে ওয়ার্ডের সামনে দাঁড়াল। সুপারিন্টেনডেন্ট তদারক করতে এসেছেন। দাদাকে তিনি দেখলেন। নার্সকে কি বললেন। ছাত্রটিকে ডেকে কি জিজ্ঞেস করলেন। ছাত্রটি আর একটা ইনজেকশন দিলে।
রাত আড়াইটে। বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে। হাসপাতালের বারান্দার ওদিকের আলোগুলো নিবিয়ে দিয়েছে–অনেকটা অন্ধকার।
