আমি হয়ত এজন্মে তাঁকে বুঝবো না, হয়ত বহু জন্মেও বুঝবো না–এতেই আনন্দ পাব আমি, যদি তিনি আমার মনের বেদীতে হোমের আগুন কখনও নিবে যেতে না দেন, শাশ্বত যুগসমূহের মধ্যে, সুদীর্ঘ অনাগত কাল ব্যেপে। আমি চাই ও নীল আকাশ, ওই সবুজ চর, কলনাদিনী গঙ্গা, দূরের নীহারিকাপুঞ্জ, মানুষের মনোরাজ্য, ওই হলদে-ডানা প্রজাপতি, এই শোভা, এই আনন্দের মধ্যে দিয়ে তাঁকে পেতে।
লোচনদাসের আখড়াতেই সবাই বললে, আমি নাস্তিক, কারণ আমি বলতাম নাম-জপ করা কেন? ঈশ্বরের নাম দিতে পেরেছে কে? শেষ পর্যন্ত উদ্ধব-বাবাজী আমাকে আখড়া ছাড়িয়ে দিল এই জন্যে বোধ হয়।
একদিন বৈকালে গঙ্গায় নাইতে নেমেছি–কাটারিয়ার ওপারের বহুদূর দিকচক্রবালের প্রান্ত থেকে কালো মেঘ ক’রে ঝড় এল, গঙ্গার বুকে বড় বড় ঢেউ উঠল, আমার মুখে কপালে মাথায় বুকে ঢেউ ভেঙে পড়ছে, ওপারের চরের উপর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, জলের সুঘ্রাণ পাচ্ছি–এরকম কত ঝটিকাময় অপরা ও কত নীরন্ধ্র অন্ধকারময়ী রাত্রির কথা মনে এল–আমারই জীবনের কত সুখদুঃখময় মুহূর্তের কথা মনে এল–
মনে কেমন একটা অপূর্ব ভাবের উদয় হ’ল, তাকে আনন্দও বলতে পারি, প্রেমও বলতে পারি, ভক্তিও বলতে পারি। তার মধ্যে ও তিনটেই আছে। বটেশ্বরনাথের পাহাড়টার ঠিক ধূসর স্তূপের দিকে চেয়ে, দূর, বহুদূর দিগন্তের দিকে চেয়ে যেখানে বাংলা দেশ, যেখানে মালতী আছে, যেখানে এমন কত সুন্দর বর্ষার সন্ধ্যা মধুর আনন্দে কাটিয়েছি, কত জ্যোৎস্নারাত্রে শুকনো মকাইঝোলানো চালাঘরের দাওয়ার তলায় বসে দুজনে কত গল্প করেছি, তার মুখে জ্যোৎস্নার আলো এসে পড়েছে..কতবার অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে সে এসেছে–আবার কতবার ডাকলেও আসেনি, কতবার চোখাচোখি হলেই হেসে ফেলেছে–এ কথা মনে হয়ে আমার মনে কেমন একটা উন্মাদনা, আনন্দ, প্রেম, ভক্তি আরও কত কি ভাবের উদয় হ’ল একটা বড় ভাবের মধ্যে দিয়ে। ওই একটার মধ্যেই সবটা ছিল। তাদের আলাদা আলাদা করা যায় না–কিন্তু তারই প্রেরণায় আমার আঙুল আপনা-আপনি বেঁকে গেল, গঙ্গার জলে মা, বাবা, হীরু-জ্যাঠার নামে তর্পণ করলুম, ভগবানের নামে সমস্ত দেহ-মন নুয়ে এল, জলের ওপরই মাথা নত করে তাঁর উদ্দেশে প্রণাম করলুম। সীতার জন্যে করুণ সহানুভূতিতে চোখে জল এল। হঠাৎ ঘোর বৈষয়িকতার জন্যে জ্যাঠামশায়ের প্রতি অনুকম্পা হ’ল–আবার সেই সৃষ্টিছাড়া অপরূপ মুহূর্তেই দেখলুম মালতীকে কি ভালই বাসি, মালতীর সহায়হীন, সম্পদহীন, ছন্নছাড়া মূর্তি মনে করে একটা মধুর স্নেহে তাকে সংসারের দুঃখকষ্ট থেকে বাঁচানোর আগ্রহে, তাকে রক্ষা করবার, আশ্রয় দেবার, ভালবাসার, ভাল করবার, তার মনে আনন্দ দেবার, তার সঙ্গে কথা বলবার আকুল আগ্রহে সমস্ত মন ভরে উঠল–কি জানি সে মুহূর্ত কি করে এল, সেই মেঘান্ধকার বর্ষণমুখর সন্ধ্যাটিতে সমস্ত বিশ্বপ্রকৃতি যেন সেই মহামুহূর্তে আমার মধ্যে দিয়ে তার সমস্ত পুলকের, গৌরবের, অনুভূতির সঞ্চয়হীন বিপুল আত্মপ্রকাশ করলে। সেদিন দেখলুম ঈশ্বরের প্রতি সত্যিকার ভক্তির প্রকৃতি মালতীর প্রতি আমার ভালবাসার চেয়ে পৃথক নয়। ও একই ধরনের, একই জাতীয়। যেখানে হৃদয়ের সহানুভূতি নেই, ভালবাসা নেই, সেখানে ঈশ্বরও নেই। ভগবানের প্রতি সেদিন যে-ভক্তি আমার এল–তা এল একটা অপূর্ব আনন্দের রূপে–সত্যিকার ভক্তি একটা joy of mind..আত্মা, দেহ, মন সেখানে আনন্দে মাধুর্যে আপ্লুত হয়ে যায়।
ঠিক মালতী আমাকে ভালবেসেছে বা আমি মালতীকে ভালবেসেছি। এই ভেবে যেমন হয় তেমনি। কোন পার্থক্য নেই। একই অনুভূতি–দুটো আলাদা আলাদা নামমাত্র। এতেও মন অবশ হয়ে যায় আনন্দে–ওতেও।
উপলব্ধি ক’রে বুঝলুম যদি কেউ আমাকে আগে এ-সব কথা বলত, আমার কখনই বিশ্বাস হত না। হওয়া সম্ভবও নয়।
সাধুজী সন্ধ্যাবেলা রোজ ধর্মকথা পড়েন। আমি মনে মনে বলি–সাধুজী আপনি জীবন দেখেন নি। ভালবেসেছেন কখনও জীবনে? প্রাণ ঢেলে ভালবেসেছেন? যে কখনও নরুন হাতে নিতে সাহস করে নি, সে যাবে তলোয়ার খেলতে। শুকনো বেদান্তের কথার মধ্যে ঈশ্বর নেই–যেখানে ভাব নেই, ভালবাসা নেই, হৃদয়ের দেওয়া-নেওয়া নেই, আপনাকে হারিয়ে ফেলা, বিলিয়ে দেওয়া নেই–সেখানে ভগবান নেই, নেই, নেই। হৃদয়ের খেলা যে আস্বাদ করেছে, ও-রস কি জিনিস যে বোঝে–ভগবানকে ভালবাসার প্রথম সোপানে সে উঠেছে।
আমি মালতীর কথা এত ভাবি কেন? সে আমাকে এত অভিভূত করে রেখেছে কেন দিন, রাত, সকাল, সন্ধ্যা?…এই বিক্রমশিলা বিহারের পাহাড়মালা, বন-শ্ৰেণী পাদমূলে প্রবাহিতা পুণ্যস্রোতা নদী, সন্ধ্যার পটে রাঙা সূর্যাস্ত, বনচামেলীর উগ্র উদাস গন্ধ–এ সবের মধ্যে সে আছে, তার হাসি নিয়ে, তার মুখভঙ্গি নিয়ে, তার গলার সুর নিয়ে, তার শতসহস্র টুকরো কথা নিয়ে, তার ছেলেমানুষি ভঙ্গি নিয়ে। কেন তাকে ভুলি নি, কেন। তার জন্য আমার মন সর্বদাই উদাস, উন্মুখ, ব্যাকুল, বেদনায় ভরা, স্মৃতির মাধুর্যে আপ্লুত, নিরাশায় যন্ত্রণাময়-হঠাৎ তাকে এত ভালবাসলুম কেন? তার কথা মনে যখন আসে, তখন কেওলিন খনির উপরকার পাহাড়চূড়াটায় একটা বকাইন গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে সারাদিন তার কথা ভাবি–খাওয়া-দাওয়ার কথা মনে থাকে না, ভালও লাগে না–তার মুখের হাসির স্মৃতিতেই যেন আমার শান্তিময় নিভৃত গৃহকোণ, তার কথার সুর দূরের ব্যবধান ঘুচিয়ে, মাঠ নদী বন পাহাড় পার হয়ে ভেসে এসে আমার প্রদীপ-জ্বালানো শান্ত আঙিনার ছোট্ট খড়ের রান্নাঘরের একপাশে উপবিষ্ট নিরীহ গৃহস্থ সাজায়–জীবনে তাই যেন চেয়ে এসেছি, সব দুরাশা, সব-কিছু ভুলিয়ে দেয়, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে যায়..এদিকে রোদ চড়ে ওঠে কিংবা সূর্য ঢলে পড়ে, বটেশ্বরনাথের পাহাড় রঙে রঙে রাঙা হয়, পাখীর গান হঠাৎ যায় থেমে–সাধুজীর চেলা বর্মানারায়ণ আমাকে খুঁজতে আসে চা খাবার জন্যে…তখন অনিচ্ছা সত্বেও উঠতে হয়…গাঁজার ধোঁয়ায় অন্ধকার সাধু-বাবাজীর গুহার সামনে বসে দুধবিহীন কড়া চা খেতে খেতে হনুমানচরিত শুনতে হয়।
