এক দিনের ব্যাপারে মালতীকে আরও ভাল করে চিনলুম। দ্বারবাসিনী গ্রামের বৃদ্ধ শম্ভু বাঁড়ুয্যে চার-পাঁচ দিনের জ্বরে মারা গেল। তিনি এখানকার সমাজের কাছে একঘরে ছিলেন–এটা আমি আগেই জানতাম। তাঁর একমাত্র বিধবা কন্যাকে নিয়ে কি-সব কথা নাকি উঠেছিল–তাই থেকে গ্রামে শম্ভু বাঁড়ুয্যে একঘরে হন। শম্ভু বাঁড়ুয্যে কোথাও যেতেন না, কারও সঙ্গে মিশতেন না, তাঁর হাতেও দু-পয়সা ছিল–সবাই বলত টাকার গুমর।
বেলা পাঁচটার সময় মালতী এসে বললে–শুনেছেন ব্যাপার? শম্ভু বাঁড়ুয্যেকে এখনও বের করা হয় নি–আমি এতক্ষণ ছিলাম সেখানে। সেই দুপুর থেকে একজন লোকও ওদের বাড়ির উঠোন মাড়ায় নি। মড়াকোলে মেয়েটা দুপুর থেকে বসে আছে–ওর মা তো বাতে পঙ্গু, উঠতে পারে না। আপনি আসুন, দু-জনে মড়া তো দোতলা থেকে নামাই–তার পর উদ্ধব-জ্যাঠাকে বলেছি আখড়ার লোকজন নিয়ে আমাদের সঙ্গে যাবে– ব্রাহ্মণের মড়া অপর জাতে ছুঁলে ওদের কষ্ট হবে–তাই চলুন আপনি আর আমি আগে নামাই–তার পর আমাদেরই নিয়ে যেতে হবে অজয়ের ধারে–পারবেন তো?
তিনজনে ধরাধরি করে সেই ঘোরানো ও সঙ্কীর্ণ সিঁড়ি দিয়ে মড়া নামানো–ওঃ সে এক কাণ্ড আর কি! মালতী আর শম্ভু বাঁড়ুয্যের মেয়ে নীরদা এক দিকে–আমি অন্য দিকে। নীরদা দেখলুম খুব শক্ত মেয়ে–বয়সে মালতীর চেয়ে বড়–বছর বাইশ হবে ওর বয়েস, মালতীর মত মেয়েলী গড়নের মেয়ে নয়, শক্ত, জোরালো হাত-পা, একটু পুরুষ ধরনের মালতী খুব ছুটোছুটি করতে পারে বটে, কিন্তু ওর গায়ে তেমনি শক্তি নেই। নীরদার সাহায্য না পেলে সেদিন শুধু মালতীকে দিয়ে মড়া নামানো সম্ভব হত বলে মনে হয় না। শেষ পর্যন্ত গাঁয়ের লোক এল এবং তারাই মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে গেল। আমিও সঙ্গে গেলুম, মেয়েদের যেতে হ’ল না, মালতী রইল নীরদার কাছে। নীরদা আমায় বললে–দাদা, শ্রাদ্ধের সময় কিন্তু আপনাকে সব ভার নিতে হবে। আর কারও হাতে দিয়ে আমার বিশ্বাস হবে না। রুণি তো আছেই, আপনাকে অন্য কিছু খাটাবো না, ভাঁড়ারের ভার আপনাকে হাতে নিতে হবে, নইলে এ-সব পাড়াগাঁয়ের ব্যাপার আপনি জানেন না।
বেশ ঘটা করেই শ্রাদ্ধ হ’ল। মালতী বুক দিয়ে পড়ে কি খাটুনিটাই খাটলে! মালতী, তুমি আমার চোখ খুলে দিলে। ঘুম নেই, নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, বসা নেই–কিসে কাজ সর্বাঙ্গসুন্দর হবে, কেউ নিন্দে করবে না ওদের, কোন জিনিস অপচয় না হয় ওদের, সে-ই একমাত্র লক্ষ্য। পরের কাজে এমনি করে নিজেকে ঢেলে দিতে তুমি পার তোমার বাবার রক্ত তোমার গায়ে বইছে বলে।
নীরদাকেও চিনলুম সেদিন।
রাত দশটা। রান্নাঘরের দরদার কাছে শূন্য ডালের গামলা, লুচির ধামা, ডালনার বালতির মধ্যে নীরদা দাঁড়িয়ে আছে। সারাদিন কি খাটুনিই খেটেছে সে! চরকির পাক ঘুরেছে মালতীর সঙ্গে সমানে সেই সকাল থেকে–এর মধ্যে আবার পীড়িতা মায়ের দেখাশুনা করেছে ওপরে গিয়ে। ঘামে ও শ্রমে মুখ রাঙা নীরদার রং বেশ ফর্সা, চুল আলুথালু হয়ে মুখের পাশে কপালে পড়েছে।
আমি বাইরের ক-জন লোককে খাওয়াব ব’লে কি আছে না-আছে দেখতে রান্নাঘরে ঢুকেছি। নীরদা বললে–দাদা, কিছু নেই আর ক-জন লোক? আচ্ছা দাঁড়ান, ময়দা মাখছি, দিচ্ছি ভেজে।
আমি বললুম–আর তুমি আগুনের তাতে যেও না নীরদা। তোমার চেহারা যা হয়েছে! আচ্ছা দাঁড়াও–মালতীকে বলি একটু মিছরির শরবৎ তোমায় বরং দিতে–
নীরদা বললে–দাঁড়ান, দাঁড়ান দাদা। রুণি কতবার খাওয়াতে এসেছিল–সে কি চুপ করে থাকবার মেয়ে?
তারপর হেসে বললে–আজ যে একাদশী, দাদা।
আমার চোখে জল এল। আর কিছু বললাম না। মেয়েমানুষের মত সহ্য করতে পারে কোন জাত? অনেক শিখলাম এদের কাছে এই ক-মাসে।
মাকে দেখেছি, বৌদিদিকে দেখেছি, সীতাকে দেখেছি, শৈলদিকে দেখেছি, এদেরও দেখলাম। অথচ এই নীরদাকে ভেবেছিলুম অশিক্ষিতা গ্রাম্য মেয়ে, ওর কথাবার্তায় রাঢ় দেশের টান বড় বেশী ব’লে।
মালতী আখড়ায় ফিরে এসে আমায় বললে–অনেকগুলো সন্দেশ এনেছি, খান– নীরদাদিদি জোর করে দিলে। ভাল সন্দেশ, দ্বারবাসিনীতে এ-রকম করতে পারে না, সিউড়ি থেকে আনানো।
তার পর কেমন এক ধরনের ভঙ্গি করে হাসতে হাসতে বললে–বসুন, ঠাঁই করে দিই আপনাকে। ও-বেলার লুচি আছে, দই আছে,–নীরদাদিদি একরাশ খাবার দিয়েছে বেঁধে–
ওকে এত ছেলেমানুষ মনে হয় এই-সব সময়ে!
ঘরে কেউ নেই, নিঃসঙ্কোচে আমার কাছে বসে ও আমায় খাওয়ালে–খেতে খেতে একবার ওর মুখের দিকে চাইলাম। কি অপূর্ব স্নেহ-মমতামাখা দৃষ্টি ওর চোখে! মালতীর কাছে এত ঘনিষ্ঠ যত্ন এই কিন্তু প্রথম। বললে–আমি কি আর দেখি নি যে আজ সারাদিন আপনি শুধু খেটেছেন আর পরিবেশন করেছেন, খাওয়া যা হয়েছিল ও-বেলায় আপনার, তার আমি সন্ধান রাখি নি ভেবেছেন? খান,–না–ও লুচি ক-খানা খেতেই হবে।
খাবো কি, লুচি গলায় আটকে যেতে লাগল–সে কি অপূর্ব উল্লাস, আমার সারাদেহে কিসের যেন শিহরণ। আজ সারদিনের ভূতগত খাটুনির মধ্যেও মালতী দৃষ্টি রেখেছিল আমি কি খেয়েছি না-খেয়েছি তার ওপর।
ঘন বর্ষা নামল। সারা মাঠ আঁধার ক’রে মেঘ ঝুপসি হয়ে উপুড় হয়ে আছে। এই সব দিনে মালতীকে সর্বদা কাছে পেতে ইচ্ছে করে–ইচ্ছে করে ঘরের কোণে বসে ওর সঙ্গে সারা দিনমান বাজে বকি। কিন্তু ও আসে না, এমনই সব বর্ষার দিনে আখড়ার যত সব খুচরো কাজে ও ব্যস্ত থাকে।
